চীনকে মোকাবিলায় বাংলাদেশকেন্দ্রিক মার্কিন পরিকল্পনার বিপদ

www.ajkerpatrika.com আবু তাহের খান প্রকাশিত: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৫৭

ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন গত ২১ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, চীনের সঙ্গে সামরিক যোগাযোগের ঝুঁকি সম্পর্কে তিনি বাংলাদেশকে বোঝাবেন। তদুপরি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বাংলাদেশ যাতে বাড়তি অস্ত্র ক্রয় করে এবং দুই দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা যাতে আরও বৃদ্ধি পায়, সে নিয়েও তিনি কাজ করবেন বলে জানান। তাঁর এ বক্তব্য বস্তুত রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনয়ন পাওয়ার অব্যবহিত পরে গত ২৩ অক্টোবর মার্কিন সিনেটের শুনানিতে দেওয়া বক্তব্য ও অঙ্গীকারেরই পুনরাবৃত্তি। গত ২৩ অক্টোবরের শুনানিতে ক্রিস্টেনসেন বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে বাংলাদেশে তাঁর অন্যতম দায়িত্ব হবে চীনের মোকাবিলায় বাংলাদেশকে কাজে লাগানো। অন্যদিকে সিনেটের ওই সভাতেই রিপাবলিকান দলীয় সিনেটর পিট রিকেটস দেশটির ‘থিংক টুয়াইস অ্যাক্টে’র উদ্ধৃতি দিয়ে ক্রিস্টেনসেনকে এই মর্মে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পেলে ওই অ্যাক্টের বিধান প্রয়োগের মাধ্যমে তিনি চীনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি বাড়ানো ও অন্যান্য সামরিক সহযোগিতা কার্যক্রম জোরদার করার উদ্যোগ নিতে পারবেন। ক্রিস্টেনসেনও রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব গ্রহণের পর রিকেটসের দেওয়া ওই সব পরামর্শ নিষ্ঠার সঙ্গে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেন।


মূলত চীনকে বিবেচনায় রেখে সম্প্রতি প্রণীত মার্কিন ‘থিংক টুয়াইস অ্যাক্ট’ সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের প্রভাব মোকাবিলায় কৌশলগত মিত্র অনুসন্ধানপূর্বক মিত্রদেশের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সেখানে অস্ত্র বিক্রি বাড়ানোর বিষয়ে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে, যে ক্ষেত্রে তাদের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশ। বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের জন্য যতটা আনন্দের, বাংলাদেশের জনগণের জন্য ততটাই উদ্বেগের। আর ২১ জানুয়ারির সংবাদ সম্মেলনে ক্রিস্টেনসেনের দেওয়া বক্তব্যের পর সে উদ্বেগ কতটা বিষাদে পরিণত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তদুপরি বিষয়টি অধিকতর উৎকণ্ঠাপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এ কারণে যে এসব এমন একটি সময়ে ঘটছে, যখন বাংলাদেশে কোনো নির্বাচিত সরকার দায়িত্বে নেই এবং সামনে যে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে, সেটিইবা কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা-ও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এমনই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র তথা ঢাকায় নিযুক্ত নতুন রাষ্ট্রদূত যদি বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের বোঝাতে সক্ষম হন যে চীনসহ অন্য সবাইকে ভুলে গিয়ে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি মনোযোগী হওয়া এবং তাদের কাছ থেকে অস্ত্র, গোলাবারুদ, যুদ্ধবিমান ইত্যাদি কিনে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করাটাই সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত, তাহলে তাতে মোটেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যে দেশের ২৮ শতাংশের বেশি মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে, যেখানে দারিদ্র্যসীমার ওপরে বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষের জীবনমান এখন পর্যন্ত দারিদ্র্য পর্যায় থেকে খুব বেশি ওপরে নয় এবং যে দেশে দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্য পরিসরে কমার পর অকার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থার কারণে আবার তা বাড়তে শুরু করেছে, সে দেশের জন্য সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়াস অনেকটাই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নয় কি? অথচ যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মিত্র সাজতে গিয়ে তাদের প্ররোচনায় বাংলাদেশ এখন অনেকটা সেদিকেই এগোচ্ছে, যা অদূর ভবিষ্যতে এ দেশকে ইউক্রেন বা পাকিস্তানের পর্যায়ে নামিয়ে আনতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, দেশের অধিকাংশ মানুষকে কষ্ট ও ভোগান্তিতে রেখে সামরিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধির মতো সম্পদ-সামর্থ্য কি এই মুহূর্তে বাংলাদেশের রয়েছে?

বাংলাদেশ সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লিখিত বর্ণনামতে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পূর্ণতই জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অন্যান্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধার ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার অংশ হিসেবে বাংলাদেশের নিজের যেমন এগুলো মেনে চলার কথা, তেমনি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় আগ্রহী অপরাপর দেশও সে অনুযায়ী এ দেশের সঙ্গে আচরণ করবে—সেটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের থিংক টুয়াইস অ্যাক্টের বিধিবিধান, মার্কিন সিনেটরের পরামর্শ কিংবা নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সাম্প্রতিক বক্তব্য কি বাংলাদেশ সংবিধানের ওই অঙ্গীকারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ? বাংলাদেশ কোন দেশের সঙ্গে কেমন সম্পর্ক রক্ষা করবে অথবা করবে না, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দারিদ্র্যবিমোচন নাকি অস্ত্র কেনাকে অগ্রাধিকার দেবে, কিংবা অন্যান্য বিষয়ে এ দেশ কী নীতি গ্রহণ করবে—সেসব একান্তই তার নিজস্ব ব্যাপার।


কিন্তু তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র যে এসব বিষয়ে বাংলাদেশকে পরামর্শ দিতে বা বোঝাতে চাইছে, সেটি স্পষ্টতই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী। আশা করব, একটি বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের অবন্ধুত্বসুলভ ও অকূটনৈতিক আচরণ থেকে বিরত থাকবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বর্তমান অনির্বাচিত সরকার এবং ভবিষ্যতে যারা নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসবে, তারা সবাই অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা বা রক্ষার ক্ষেত্রে সংবিধান প্রদত্ত এ নির্দেশনা যথাযথভাবে মেনে চলবে বলে আশা রাখি। শুধু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য নিজেকে বা নিজেদেরকে বহিঃরাষ্ট্রের প্রতিনিধি না ভেবে এ দেশের জনগণের স্বার্থের প্রতিভূ ভাবুন। তাহলেই একদিকে দেশ যেমন রক্ষা পাবে, অন্যদিকে তেমনি আত্মরক্ষার জন্য ক্ষমতায় থাকা কাউকে বিশেষ দায়মুক্তির উপায়ও অনুসন্ধান করতে হবে না।


প্রচলিত কূটনৈতিক নিয়ম ও প্রথা মেনে কোনো দেশের রাষ্ট্রদূতের পদে একজনের মেয়াদ শেষে আরেকজন আসবেন—এটাই স্বাভাবিক; এবং সাধারণ স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এটিকে আলাদা চোখে দেখার বা এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু বাংলাদেশের মার্কিন রাষ্ট্রদূতের পদে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন এমনই এক সময়ে ও পরিস্থিতিতে এবং এমন সব বক্তব্য ও অভিপ্রায় নিয়ে যোগদান করলেন যে তাতে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যাচ্ছে না। তদুপরি অতিপ্রকাশ্যে উচ্চারিত তাঁর নানা বক্তব্য বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্যও অত্যন্ত অমর্যাদাকর। কারণ, বাংলাদেশ তার নিজস্ব অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও আঞ্চলিক স্বার্থে কখন কার সঙ্গে কী সম্পর্ক গড়ে তুলবে, সেটি একান্তই তার নিজস্ব এখতিয়ারাধীন বিষয় (চীনের পক্ষে ওকালতি করা হচ্ছে না এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে অমর্যাদাকর কোনো উপাদান থাকলে সেটিও পরিত্যাজ্য)। সে ক্ষেত্রে অন্য কোনো দেশ যদি বিশেষ উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে ‘বোঝানোর’ দায়িত্ব গ্রহণ করতে চায়, তাহলে সেটি মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়, সম্মানজনক তো নয়ই।


এ সূত্রে রাষ্ট্রদূত মহোদয়কে বিনয়ের সঙ্গে জিজ্ঞেস করি, এ ধরনের পরামর্শ কি যুক্তরাষ্ট্রের একজন রাষ্ট্রদূত জার্মানি, রাশিয়া কিংবা ভারতকে দিতে পারবেন? যদি না পারেন, তাহলে বাংলাদেশকে তা দেওয়ার কথা ভাবছেন কোন কারণে? এ দেশে এই মুহূর্তে একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় নেই বলে কিংবা আগামী সরকার একটি বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় যাবে ধরে নিয়ে তাদের সম্ভাব্য দুর্বলতার কথা ভেবে? মাননীয় রাষ্ট্রদূত, যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ যেমন গৃহযুদ্ধের বিরুদ্ধে দীর্ঘকালীন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হয়েছে, বাংলাদেশের জনগণও তেমনি নয়া ঔপনিবেশিক শাসন, বঞ্চনা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ২৪ বছরের সংগ্রাম ও ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এ দেশকে স্বাধীন করেছে। অতএব চলুন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মমতার ভিত্তিতে গড়ে তুলি। এবং সে ক্ষেত্রে কাউকে মোকাবিলা করার নীতির ভিত্তিতে নয়, বরং সবাইকে ধারণ করে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার নীতিই হোক আমাদের সবার কূটনীতি ও অন্যান্য রাষ্ট্রিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি।


উল্লেখ্য, ঢাকার চীনা দূতাবাস ইতিমধ্যে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে এটিকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন, সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং গোপন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে উল্লেখ করেছে। চীনা দূতাবাসের ওই বক্তব্যের ভালোমন্দ মূল্যায়নের দায়িত্ব আমাদের নয়, মার্কিন দূতাবাস তথা যুক্তরাষ্ট্রের। বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে এখানে শুধু এইটুকু বলব, উল্লিখিত দুই দেশের মধ্যকার দ্বন্দ্বে বাংলাদেশ যেন কারও পক্ষে ক্রীড়নক হিসেবে ব্যবহৃত না হয়।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও