উন্নয়নই একমাত্র সমাধান নয়
তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে গত শতাব্দীর শেষ দিক থেকে শুরু করে এই শতাব্দীর এখন পর্যন্ত উন্নয়নের কোনো ছোঁয়া পড়েনি। অর্থনীতিসহ সব সূচকের নিম্নগামী অবস্থা। অবকাঠামোসহ সব দিক থেকে পেছনে রয়ে গেছে তারা। তবে সবকিছু অতিক্রম করে কয়েকটি দেশ সামনের দিকে এগিয়ে গেছে। অর্থনীতিতে বিরাট পরিবর্তন এসেছে, অবকাঠামোসহ স্বাস্থ্য, জীবনযাত্রার মান অনেক পাল্টে গেছে কয়েকটি দেশে। এইসব দেশের মধ্যে উগান্ডাকে গণ্য করা যায়। তা ছাড়া, আফ্রিকার কয়েকটি ছোটখাটো দেশ যেমন আইভরি কোস্ট, নাইজার ও মালি আছে এইসব দেশের তালিকায়। কিন্তু সব দিক বিবেচনা করলে দেখা যায় এইসব দেশের যে উন্নয়ন হয়েছে, তার পেছনে কোনো এক বিশেষ ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমষ্টির একনায়কতান্ত্রিক দেশ পরিচালনার বহিঃপ্রকাশ ছিল।
এশিয়ার মধ্যে কয়েকটি দেশে এই রকম অর্থনীতির আমূল পরিবর্তন হয়েছে। জীবনযাত্রার মান, মাথাপিছু আয়সহ অর্থনীতির যতগুলো সূচক আছে, সব ওপরের দিকে উঠেছে। যেমন ভিয়েতনাম। ভিয়েতনামে অর্থনীতির সব সূচকে পরিবর্তন হয়েছে ইতিবাচকভাবে, কিন্তু সেখানে গণতন্ত্র সীমিত। গণতন্ত্রকে তারা তাদের মতো করে বেছে নিয়েছে। তারা উন্নয়ন ও জীবনযাত্রার মানের ওপরে জোর দিয়েছে। এখানে অনেক ক্ষেত্রে তারা পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্রকে সময়োপযোগী মনে করেনি। তারা তাদের মতো করে উন্নয়ন করেছে। এখানে বাকস্বাধীনতা সীমিত। তারা মনে করে, জীবনযাত্রার মানের গুণগত উন্নয়নই তাদের গণতন্ত্র। অর্থাৎ আগে জীবনযাত্রার মানের পরিবর্তন এনে, অর্থনীতির ক্ষেত্রে একটা ইতিবাচক উন্নয়ন করার পরে ধীরে ধীরে বাকস্বাধীনতা দেওয়া হবে। মূল কথা হলো, পেটে ক্ষুধা রেখে অবকাঠামো ও আর্থসামাজিক উন্নয়ন ছাড়া গণতন্ত্র আসলেও টেকে না।
বাংলাদেশের গত সাড়ে ১৫ বছরে, আওয়ামী লীগের শাসনকালে যে পরিবর্তন হয়েছে, সেটা সবার চোখে পড়ার মতোই। গণতন্ত্রমনা মানুষের কাছে প্রতীয়মান হতেই পারে—২০১৪ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মানুষের বাকস্বাধীনতা কিছুটা রহিত ছিল। পরপর তিনটি নির্বাচনের মান বিশ্লেষণ করলে এটা বোঝা যায় যে একেবারে পশ্চিমা ধাঁচের গণতান্ত্রিক ধারায় যে নির্বাচন হয়, সেই ধরনের হয়নি। ওই নির্বাচনগুলোতে বিরোধী দল যথাযথভাবে অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত ছিল—তাদের ভাষায়, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচনের ধারা প্রতিফলিত না হওয়ার কারণে।
এই সময়ের মধ্যে দেশ এগিয়ে গেছে অনেক দূর। অর্থনীতির সূচকগুলো যেভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, সেটা অনেকের চোখেই ঈর্ষণীয় ছিল বটে। বহির্বিশ্ব তাকিয়েছিল বাংলাদেশের উন্নয়নের দিকে, অবাক হয়েছিল এইসব অর্থনীতির সূচক ও জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন দেখে।
এই দেড় দশকে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, স্থিতিশীল অর্থনীতি, মাথাপিছু আয় ও জীবনযাত্রার মানসহ প্রবৃদ্ধি অর্জন ছিল অভূতপূর্ব। অর্থনীতির চাকা যেভাবে সচল ও ঊর্ধ্বমুখী ছিল, এভাবে চলতে থাকলে আগামী এক দশকের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতো বলে অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন। কিন্তু এই দ্রুত উন্নয়ন করতে গিয়ে যে ভুলটি হয়েছে সেটি হলো, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্থের অপচয় হয়েছে। সঙ্গে দুর্নীতিও হয়েছে। এই দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল প্রশাসনযন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদেরা।
এই অনিয়ম-দুর্নীতি মানুষের চোখে পড়েছে। মানুষ প্রতিবাদ করেছে, সরকার কর্ণপাত করেনি। মানুষ আশা করেছিল ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরে তাদের চরিত্রের পরিবর্তন ঘটবে, তারা দুর্নীতিকে ‘না’ বলবে। এই দুর্নীতি ২০১৪ সাল পর্যন্ত সীমিত থাকলেও পরবর্তী সময়ে সেটা স্থগিত না হয়ে ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে। মানুষ আরও বিক্ষুব্ধ হয়েছে। যার ফলে ৫ আগস্টের মতো দিনটি এসেছে। এখানে রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতা আছে। তাঁরা মানুষের মনের ভাষা পড়তে পারেননি। প্রতিটি ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলায় যখন কয়েকজন মানুষ হঠাৎ করে ফুলেফেঁপে ওঠে, তখন আশপাশের হাজারো মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়। হাজারো মানুষের এই ক্ষোভ গুটিকয়েক মানুষের পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব হয় না। এখনো আমরা প্রত্যাশা করি, রাজনীতিবিদেরা হবেন সৎ, বিবেকবান ও মানুষের জন্য নিবেদিতপ্রাণ। তাঁরা সাধারণ মানুষের সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনার সঙ্গী হবেন—এই প্রত্যাশাই আমাদের জনগণ করে। রাজনীতিবিদদের অন্যায় আচরণ, তাঁদের কথাবার্তার মারপ্যাঁচ ও অসাধুতা সাধারণ মানুষ একেবারেই মেনে নেয় না। কেননা, সাধারণ মানুষ ২৪ ঘণ্টাই তাঁদের কাছে পায়, একে অপরকে চেনে পারিবারিকভাবে, গোষ্ঠীগতভাবে, ব্যক্তিগতভাবেও। তাই রাজনীতিবিদেরা ভুল করলে সাধারণ জনগণ তাঁদের ক্ষমা করে না। যারপরনাই প্রতিশোধ নেয়।
একটা কথা এখানে বলতেই হয়—আমাদের দেশের প্রশাসনযন্ত্রের অর্থাৎ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বেশির ভাগই কোনো কোনো ক্ষেত্রে অসৎ। তাঁদের আমলাতান্ত্রিক মারপ্যাঁচ মানুষ বোঝে না, কিন্তু তাঁরা দুর্নীতি করেন একেবারেই ধারাবাহিকভাবে এবং সব কর্মকর্তা-কর্মচারী একজোট হয়ে নিজেদের মধ্যে দুর্নীতির উপার্জন ভাগাভাগি করেন। সবার উচিত এই প্রশাসনযন্ত্রের দিকে একটু নজর দেওয়া।
- ট্যাগ:
- মতামত
- দেশের উন্নয়ন