ফেব্রুয়ারি তুমি কার—ভাষার নাকি নির্বাচনের
জ্ঞানবুদ্ধি হওয়ার পর থেকে আমরা জেনে আসছি ফেব্রুয়ারি মাসটা ভাষার। একান্তই ভাষার মনে হয়—মাসজুড়ে বইমেলার কারণে। তবে ফেব্রুয়ারিকে আরও সাজিয়ে তোলে ফাল্গুন। আর বাড়তি পাওনা হলো বিশ্বমঞ্চ থেকে আমদানি করা ভালোবাসা দিবস। এসব কিছুর আড়ালে আমরা ভুলে যাই, স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসের কথা, যা ১৪ ফেব্রুয়ারি ওই ভালোবাসার দিনেই পালিত হওয়ার কথা। ১৯৮৩ সালে পুলিশের গুলিতে সেদিনও শিক্ষার্থীরা নিহত হয়েছিলেন, গ্রেপ্তার হয়েছিলেন—স্বৈরাচারী সরকারের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে। এত পুরোনো কথা আমরা সহজে ভুলে যেতেই পারি, মনে রাখাটাই বরং কঠিন! আশা করি, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনটার কথা সবাই মনে রাখবে।
যাই হোক, এ বছর ফেব্রুয়ারির ঐতিহ্যগত সব আমেজ ছাপিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি চোখে পড়ছে বেশি। বইমেলাটাও সময়মতো শুরু হচ্ছে না। ভালোয় ভালোয় ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হয়ে গেলে ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে খোলা থাকবে মেলার দুয়ার। চাঁদকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, সে তার সময়মতো বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে আকাশে দেখা দেবে এবং এই কারণে হিজরি রমজান মাসও ফেব্রুয়ারির ভাগ নিতে চাইছে।
স্মৃতি যদি প্রতারণা না করে থাকে তাহলে অনেকেরই হয়তো মনে আছে, এ বছরের ফেব্রুয়ারিই প্রথম নয়, যে মাসে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৮ ফেব্রুয়ারি। ১৯৯১ সালে পঞ্চম নির্বাচন হয় ২৭ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠটি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। তাহলে দেখা যাচ্ছে, মোট তিনবার ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবারেরটা চতুর্থ।
নির্বাচন থেকেছে এক পাশে। বইমেলা কিন্তু থামেনি। ১৯৭৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বইমেলা চলেছে। ১৯৯১ সালে চলেছে ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী। আর ছিয়ানব্বইতেও তা-ই। পত্রপত্রিকার তথ্য বলছে, নির্বাচনের কারণে কখনো বইমেলা পেছায়নি। ১৯৭৯ সালেরটা ব্যতিক্রম ছিল। কারণ তখন বইমেলা সবে শিশু, হাঁটি হাঁটি পা পা করে। ২১ দিনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল গ্রন্থমেলার জন্য। আচ্ছা তবে বইমেলার ইতিহাসটা একটু স্মরণ করা যাক।
২. প্রয়াত কথাসাহিত্যিক সরদার জয়েনউদদীন ষাটের দশকের প্রথম দিকে বাংলা একাডেমি থেকে দায়িত্ব পান জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে। সে সময়ে তিনি ইউনেসকোর শিশু-কিশোর গ্রন্থমালা উন্নয়নের একটি প্রকল্পের কাজ শেষ করে ভাবলেন শিশু গ্রন্থমেলা করার কথা। ১৯৬৫ সালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি) নিচতলায় তিনি আয়োজন করলেন সেই মেলার। ধারণা করা হয়, এটিই ছিল বাংলাদেশের প্রথম বইমেলা। ১৯৭০ সালে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সহযোগিতায় নারায়ণগঞ্জে একটি গ্রন্থমেলার আয়োজন করা হয়, যেখানে ব্যবস্থা ছিল আলোচনা সভারও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের তৎকালীন প্রধান অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুল হাই, শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ও সরদার ফজলুল করিম অংশ নিয়েছিলেন সেই আলোচনায়।
পরের বছর একাত্তরে দেশ স্বাধীন হলো। তখন বইমেলার নতুন অধ্যায় শুরু করার সুবর্ণ সুযোগ। বলতে হয়, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতিকে যুগ যুগ ধরে অম্লান করে রাখার এক প্রয়াস। বইমেলার মাধ্যমে ন্যায়বিচার করা হয় দেশের জন্য প্রাণদানকারী মুক্তিযোদ্ধা শহীদদেরও। ভাষার জন্যই যে দেশের জন্ম, সে দেশে ভাষাচর্চার জন্য বছরে একটা বইমেলার আয়োজন তো হতেই হবে। তবে শুরুটা সহজ ছিল না।
চিত্তরঞ্জন সাহা ছিলেন বাংলাদেশের প্রকাশনাশিল্পের একজন পথিকৃত। তিনিই মূলত বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বইমেলার উদ্যোক্তা। ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তিনি বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসের সামনের বটতলায় চটের ওপর ৩২টি বই সাজিয়ে বিক্রি শুরু করেন। বইগুলো তিনি এনেছিলেন কলকাতা থেকে। এই বইগুলো ছিল তাঁর প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ (বর্তমানে মুক্তধারা প্রকাশনী) থেকে প্রকাশিত। মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় আশ্রিত বাঙালি সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের লেখা ওই ৩২টি বই প্রকাশ করে স্বাধীনতার পর দেশে এসে তিনি যেভাবে সেগুলো বিক্রি শুরু করেন, সেটাই ছিল আজকের বইমেলার বীজ।
পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৭৩ সালে বাংলা একাডেমি বইমেলা উপলক্ষে ১৫ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশেষ হ্রাসকৃত মূল্যে তাদের প্রকাশিত বই বিক্রির ব্যবস্থা করে। তাদের সঙ্গে মুক্তধারা প্রকাশনী, স্টান্ডার্ড পাবলিশার্স এবং আরও কয়েকজন বাংলা একাডেমির মাঠে নিজেদের প্রকাশিত বইয়ের পসরা সাজিয়ে বসে।