রাষ্ট্রনৈতিক বিষয়ে নৈতিক প্রশ্ন কি জরুরি?

বিডি নিউজ ২৪ আলমগীর খান প্রকাশিত: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৪৪

রাজনীতি বা আরও অর্থবহভাবে বললে রাষ্ট্রনীতি—এই শব্দগুলোর প্রথম অংশে ‘রাজা’ বা ‘রাষ্ট্র’ এবং দ্বিতীয় অংশে ‘নীতি’ থাকায় নৈতিক প্রশ্নকে শুধু অপ্রাসঙ্গিক মনে করা যায় না, বরং তা অপরিহার্য ও জরুরি হয়ে ওঠে। এখনকার বাংলাদেশে তা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। কেননা বাংলাদেশে রাষ্ট্রনৈতিক সত্তার গভীর থেকে নৈতিক ভিত্তিটি বিপজ্জনকভাবে ক্ষয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক কিংবা রাষ্ট্রনৈতিক সংকটসমূহের কারণ হাতড়াতে গিয়ে নৈতিক প্রশ্নটিকে উহ্য রাখলে রাষ্ট্রসংস্কারের ইচ্ছে বাগাড়ম্বরে পরিণত হওয়া স্বাভাবিক। তার মানে আবার এ নয় যে, নৈতিক প্রশ্নটিই এক নম্বর বা একমাত্র সমস্যা। তবে গোটা তিন-চার প্রধান সমস্যার মধ্যে যে এটা একটা তা অস্বীকার করলে রাষ্ট্র নিয়ে অনেক ভাঙার খেলা হতে পারে, গড়া আর হবে না।


বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি একটি সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জন্ম নিলেও, বিজয়ী নেতৃত্বের বেশকিছু দুর্বলতা ও ভুলের কারণে দৃঢ় নৈতিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। ফলে রাষ্ট্র হয়ে ওঠেনি সর্বজনের আর অল্পদিনেই তা গণতান্ত্রিক চরিত্র হারায়। মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সকল মৌলিক অধিকার অবজ্ঞার শিকার হয়। দেখা যায়, রাষ্ট্রের মালিকানা মুক্তিযুদ্ধকালীন জনগণের হাত থেকে কয়েকটা লুটেরা গোষ্ঠীর কুক্ষিগত হয়ে পড়ে। আর এখনো রাষ্ট্র তাদেরই নিয়ন্ত্রণে।


পাঁচ বছর পরপর ভোটের মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচনের যে সামান্য সুযোগ তাও বিঘ্নিত হয়েছে ইতিহাসের বেশিরভাগ সময়। অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় না ঠিকই, কিন্তু ক্ষমতা কাঠামোয় জনগণের প্রতীকী হলেও অংশগ্রহণ সম্ভব হয়। জনগণের শাসন পৃথিবীর কোথাও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রগুলোতে গণস্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া হয়। আর বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে অবাধ নিরপেক্ষ ভোটের ব্যবস্থায় প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিককে নির্দিষ্ট সময় পর ক্ষমতা রদবদলে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়। এই রদবদল কায়েমী স্বার্থের দুই বা ততোধিক গোষ্ঠীর মধ্যে হলেও চর্চাটা জরুরি। কেননা গণতান্ত্রিক নির্বাচনের অনুপস্থিতি জনগণকে ক্ষমতাহীন ও দুর্বল করে।


বাংলাদেশের মানুষ একাধিকবার বৃহৎ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছে কেবল এই অধিকারটুকু অর্জনের জন্য। জনগণের এই সামান্য অধিকারটুকু সংরক্ষণ যে কোনো রাষ্ট্রের অন্যতম নৈতিক দায়িত্ব। ঢালাওভাবে নির্বাচন অস্বীকার করে রাষ্ট্রগঠনের বিপ্লবীপনা জনগণকে ক্ষমতাশালী নয়, ক্ষমতাহীন করে। বিপ্লব প্রয়োজন কেবল জনগণের জন্য, জনগণ কারও শখের বিপ্লবের খোরাক নয়।


পারলৌকিক মুক্তিসংশ্লিষ্ট নৈতিকতার ভিত্তি গঠিত হয় ধর্মে স্বীকৃত সৃষ্টিকর্তার নির্দেশ অনুযায়ী। কিন্তু রাষ্ট্র একটি ইহলৌকিক সত্তা। তার নৈতিকতার ভিত্তি গণস্বার্থ। আধুনিক রাষ্ট্র গঠিত হয় সকল মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের শর্তে। রাষ্ট্রের জন্য চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সবচেয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ও শ্রমজীবী মানুষের মৌলিক অধিকারসমূহ সংরক্ষণ। সমঅধিকারের প্রশ্নটি আরও পরের বিষয়। কিন্তু যে রাষ্ট্র অন্তত এই ন্যূনতম মৌলিক অধিকার সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়, তা রাষ্ট্র হিসেবে অভিহিত হওয়ার যোগ্যতা ও নৈতিকতা দুইই হারায়।


রাষ্ট্রে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রনৈতিক দলগুলো লড়াই করে এক বা একাধিক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষায়, অধিকার প্রতিষ্ঠায় ও উন্নয়নের ফল ভোগের জন্য। সেক্ষেত্রে যে শ্রেণি বা গোষ্ঠীর মানুষের স্বার্থ নিয়মিতভাবে লঙ্ঘিত ও যারা নিরন্তর অধিকারবঞ্চিত তাদের কথা সবার আগে বিবেচ্য। এই বিবেচনাবর্জিত রাজনীতি রাজসর্বস্ব হলেও নীতিবর্জিত। বাংলাদেশে রাজনীতির ক্ষেত্রে এটি একটি উল্লেখযোগ্য সংকট।


এদেশে রাজনীতি লুটেরা গোষ্ঠীর কুক্ষিগত বিধায় রাষ্ট্র বারবার বড় রকমের সংকটের মুখোমুখি হয়। আর কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের চেষ্টাও বেশিদূর এগোয় না। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান বিপ্লবের যে গর্জন নিয়ে শুরু হয়েছিল তা অল্পদিনেই সংস্কারের ফাঁকা বুলিতে পর্যবসিত হতে থাকে। যে নৈতিক আবেগ, আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন নিয়ে এ অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল, যা ছড়িয়ে পড়েছিল স্লোগানে স্লোগানে ও দেয়ালে দেয়ালে তা ডুবে যেতে থাকল তরুণদের নানামুখী অন্তর্দ্বন্দ্বে। সংস্কারের উদ্যোগসমূহ প্রথম মুখ ফিরিয়ে নিল জীবনবাজি রেখে অংশগ্রহণকারী লাখ লাখ তরুণের কণ্ঠে ও দেয়ালে প্রতিধ্বনিত আবেগ, আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন থেকে। যেসব তরুণ ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ করল তারা স্বাস্থ্যে ও পোশাকে যতখানি কেতাদুরস্ত হতে থাকল, নৈতিকভাবে হতে থাকল ততখানি রুগ্ন। জীবনে ও কর্মে কোনো নৈতিক দৃঢ়তার উদাহরণ তারা তৈরি করতে পারল না।


দেশের মুক্তিযুদ্ধ, শিল্পসংস্কৃতি, পরিচয়ের বৈচিত্র্য, নারী অধিকার ইত্যাদি গর্বের বিষয়সমূহ হঠাৎ করেই কারও কারও আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়ে গেল। যে দৃষ্টিভঙ্গিতে এসব ঘটনা চলল তা নৈতিক চেতনাপ্রসূত নয়—সংকীর্ণ, কূপমণ্ডূক ও সাম্প্রদায়িক মনোভঙ্গি থেকে উৎপন্ন। দেশজুড়ে বিদ্বেষ, ঘৃণা, আত্মম্ভরিতা ও বাগাড়ম্বরের ফলন হলো অনেক। সহানুভূতি, সহমর্মিতা, পাশে থাকার অঙ্গীকার, দুর্বলের অধিকার রক্ষা ইত্যাদি মানবিকতাচর্চার দৃষ্টান্ত তৈরি হলো না। পত্রপত্রিকায় সুসংবাদের চেয়ে কুসংবাদই ছড়াল বেশি। কোনো কোনো পণ্ডিত বলবেন, এসব তো নৈতিকতার প্রশ্ন নয়, রাষ্ট্রপরিচালনার প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত। বটে! রাষ্ট্রপরিচালনার সঙ্গে জড়িত কারও মাঝে আমরা এসব নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো মনোবেদনা লক্ষ্য করেছি? সাফল্যের প্রচারক আত্মপ্রশংসার ঢাক ছাড়া আর কিছু শোনা যায়?

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও