নতুন বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের ঝুঁকি
বিশ্বব্যবস্থা এখন এক অদ্ভুত মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে লিবারেল ওয়ার্ল্ড অর্ডার (উদার বিশ্বব্যবস্থা) বানানো হয়েছিল, সেই কাঠামো চোখের সামনে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়েছে। অথচ এই কাঠামোর জন্মই হয়েছিল যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স আর সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতারা একটা জিনিস বুঝেছিলেন, আরেকটা বিশ্বযুদ্ধ হলে শুধু ইউরোপ নয়, পুরো সভ্যতাই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তাই এই দেশগুলোর উদ্যোগে এবং জাতিসংঘ, আইএমএফ (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল), ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (বিশ্বব্যাংক) এই পুরো ব্যবস্থা গড়ে তোলে।
জাতিসংঘের মূল ম্যান্ডেট ছিল একটা খুব সোজা কথা—তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যেন না হয়। সেই দিক থেকে বলতে গেলে এই ব্যবস্থা আংশিক সফল। ভিয়েতনাম, কোরিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফগানিস্তান, ইরাকসহ অনেক জায়গাতেই যুদ্ধ হয়েছে, কিন্তু আর কোনো বিশ্বযুদ্ধ হয়নি।
কোল্ড ওয়ার (শীতল যুদ্ধ) শেষ হওয়ার পর তো অনেকে ভেবেছিল, ইতিহাসে যুদ্ধের সমাপ্তি হতে চলেছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেল, ওয়াশিংটন আর তার মিত্ররা নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করল। ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা দ্য এন্ড অব হিস্টোরি লিখে বুঝিয়ে দিলেন, লিবারেল গণতন্ত্র আর বাজার অর্থনীতি এখন মানুষের চূড়ান্ত গন্তব্য।
আমরা জানি, সেই স্বপ্ন বেশি দিন টেকেনি। ২০০১ সালে টুইন টাওয়ারে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ ঘোষণা করল। আফগানিস্তান দখল করল, পরে ইরাকেও হামলা করল। দুই ক্ষেত্রেই যুদ্ধ দীর্ঘ হলো, কিন্তু ‘সম্পূর্ণ বিজয়’ এল না।
বিপরীতে আমেরিকার নৈতিক অবস্থান দুর্বল হলো, অর্থনীতি আর রাজনীতির ভেতরের সংকট বাড়ল। এই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে রাশিয়া, চীন, ইরানসহ আরও কয়েকটা রাষ্ট্র নতুন ধরনের ক্ষমতার ব্লক বা মিত্র তৈরি করতে শুরু করল।
২.
এখনকার ছবিটা মোটামুটি পরিষ্কার। কেন্দ্রে আছে তিন পরাশক্তি—আমেরিকা, রাশিয়া আর চীন। তিন দেশের তিন নেতার মুখও আমাদের চেনা—ট্রাম্প, পুতিন আর সি চিন পিং। তিনজনের চরিত্র আলাদা, কিন্তু একটা জায়গায় মিল আছে। সবাই নিজেদের স্বপ্নের মানচিত্র অনুযায়ী পৃথিবীকে সাজাতে চান।
পুতিনের স্বপ্ন ‘বড় রাশিয়া’। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনকে তিনি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি মনে করেন। জর্জিয়ায় হস্তক্ষেপ, ক্রিমিয়া দখল, তারপর ইউক্রেন আক্রমণ—সবই আসলে সীমান্ত বাড়ানোর রাজনীতি। জমি দখলের পুরোনো খেলা নতুন ভাষায় ফিরে এসেছে।
চীনের স্বপ্ন ‘ন্যাশনাল রেজুভেনেশন’, মানে চীনা জাতির পুনরুত্থান। দক্ষিণ চীন সাগরে কৃত্রিম দ্বীপ বানানো, সামরিক ঘাঁটি তৈরি, তাইওয়ান ঘিরে নিয়মিত মহড়া—সবই এই বড় প্রজেক্টের অংশ। এর সঙ্গে আছে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ। এই প্রকল্পের মাধ্যমে চীন একদিকে বন্দর আর অবকাঠামো বানাচ্ছে, অন্যদিকে অনেক দেশে কৌশলগত প্রভাব বাড়াচ্ছে।
এদিকে আমেরিকা নিজেও বদলেছে। আগে সে নিজেকে ‘ফ্রি ওয়ার্ল্ড’ বা মুক্তবিশ্বের নেতা ভাবত। ইউরোপ আর মিত্রদের নিয়ে ন্যাটো, ব্রেটন উডস সিস্টেম, বহু চুক্তি—সব দিয়ে একটা নিয়মতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা বজায় রাখার চেষ্টা করত; একই সঙ্গে সেখান থেকে সুবিধাও নিত। ট্রাম্প-যুগ থেকে সেই নীতি অনেকটাই বদলে গেল।
প্যারিস ক্লাইমেট অ্যাগ্রিমেন্ট, ইরান নিউক্লিয়ার ডিল, নানা আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে সরে আসা, মিত্রদের বারবার অপমান করা—এসব ঘটল খুব অল্প সময়ের মধ্যে। একদিকে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি, অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞা আর ডলারের আধিপত্যকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সাপ্লাই চেইন, তেল, গ্যাস, ডলার ট্রান্সজেকশন—সবকিছুই চাপ সৃষ্টি করার টুলে পরিণত হলো।
এ অবস্থাকে অনেকে ‘রুলস-বেজড অর্ডার’ বা আইনের শাসনের ভাঙন বলছে। আগেও নিয়ম ছিল, কিন্তু সব সময় মানা হয়নি। এখন সমস্যা হলো, যারা আগে অন্তত নিয়মের কথা বলত, তারাও যখন খোলাখুলি ‘যার শক্তি তার নিয়ম’ নীতি নিতে শুরু করেছে, এ রকম অবস্থায় ছোট আর মাঝারি দেশগুলোর অবস্থা বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
ভেনেজুয়েলার ঘটনা একটা উদাহরণ। আমেরিকা একতরফাভাবে সেখানে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করল। নিরাপত্তা আর গণতন্ত্রের নামে যে ধরনের চাপ প্রয়োগ হলো, সেটা দেখিয়ে দিল, বড় শক্তিগুলো চাইলে আন্তর্জাতিক নর্মস বা নিয়মনীতি পাশ কাটিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে রাশিয়া আর চীনও নিজেদের স্বার্থে অনেক ক্ষেত্রে একই রকম আচরণ করছে; অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদ বা আধিপত্যবাদের প্যাটার্ন (ধরন) বদলেছে, কিন্তু স্বভাব বদলায়নি।