নিপাহ ভাইরাস যেন ছড়িয়ে পড়তে না পারে
জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসন্ন। প্রচারণায় মুখরিত নগরী। পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে গেছে দেশ। গণতন্ত্রের এ উৎসব যেন সফল হয়, ঝুঁকিমুক্ত একটি নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব হয়, সে কামনা সবার। দেশের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে জনসমাগম হবে, এটাই স্বাভাবিক। এ সময় যে কোনো জীবাণু সংক্রমণের আশঙ্কাও তাই বেড়ে যায়। মাস্ক পরিধানের মাধ্যমে ছোঁয়াচে রোগ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা তাই সচেতন জনগণ থেকে কাম্য।
মাস্ক ব্যবহার বা জীবাণু সংক্রমণের অন্যান্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা বিশেষভাবে জরুরি হয়ে পড়ে, যদি কোনো ছোঁয়াচে জীবাণু সংক্রমিত হতে শুরু করে। বাংলাদেশে এ মুহূর্তে শীতকালীন ভাইরাস থেকে স্বাস্থ্যঝুঁকি সবচেয়ে বেশি; এ বিষয়ে আমরা হয়তো অবগত। তবে ৭ জানুয়ারির তথ্য অনুসারে বাংলাদেশের ৩৫ জেলায় বাদুড়বাহিত নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছে। এর ভেতর সংক্রমণ বেশি ধরা পড়েছে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, নওগাঁ ও লালমনিরহাট জেলায়। বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনার বারাসাতের একটি হাসপাতালেও তিনজন স্বাস্থ্যকর্মী নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে।
নিপাহ ভাইরাস বিষয়ে কিছু জরুরি প্রশ্নের উত্তর জানা থাকা দরকার। ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ায় শনাক্ত এ ভাইরাস একটি পশুবাহিত বা জুনোটিক ভাইরাস। কলা-বাদুড় এ ভাইরাস বহন করে থাকে। এ অব্দি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে বেশ কয়েকটি নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। মালয়েশিয়ার পর ২০০১ সালে সিঙ্গাপুরে, ২০০১, ২০০৭ এবং তৎপরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকবার ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ও দক্ষিণাঞ্চলে, আর ২০১৪ সালে ফিলিপাইনে। বাংলাদেশে ২০০১ সাল থেকে প্রায় প্রতিবছরই নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটছে, তবে সংখ্যায় কম এবং তা মূলত গ্রামাঞ্চলে। এর ভেতর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সংক্রমণ ঘটেছিল ২০০৪ সালে ফরিদপুর ও রাজবাড়ীতে; তখন ৬৭ জন এ ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং তাদের মধ্যে ৫০ জন মারা যায়। নিপাহ ভাইরাস আমাদের দেশে এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ছড়াতে থাকলে আমাদের সতর্ক থাকা দরকার।
নিপাহ ভাইরাস একটি প্রাণনাশী জীবাণু, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। দেখা গেছে, এ ভাইরাসে আক্রান্ত জনসংখ্যার ৪০ থেকে ৮০ শতাংশের মৃত্যু ঘটতে পারে। এ ভাইরাস শনাক্ত করা কঠিন। কেননা উপসর্গগুলো সাধারণ সর্দি-জ্বরের মতো। জ্বরের পাশাপাশি, কাশি, শ্বাসকষ্ট, গলা, গা ও মাথাব্যথাও হতে পারে। জীবাণুর সংস্পর্শে আসার ৪ থেকে ১৪ দিন, আবার কখনো এর চেয়ে দেরিতে উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এ জীবাণু মস্তিষ্কেও সংক্রমিত হয় এবং তখন এনসেফেলাইটিসের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে; যেমন-ঝিমুনি আসা, বিভ্রান্তির জন্ম নেওয়া, কিংবা খিঁচুনি। এসব উপসর্গ দেখা দিলে ২৪ ঘণ্টার ভেতর রোগী কোমায় চলে যায় এবং মৃত্যুঝুঁকি অত্যন্ত বেড়ে যায়।
প্রশ্ন হচ্ছে, এ জীবাণু ছড়ায় কী করে? এ জুনোটিক ভাইরাস বহন করে বাদুড়। আর খেজুর গাছের রস বাদুড়ের খুব প্রিয়। তাই নিপাহ ভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ঘটে খেজুর গাছের কাঁচা রস এবং বিভিন্ন ফল থেকে। আবার, গৃহপালিত পশুও বাদুড়ের সংস্পর্শে এলে এ জীবাণু ছড়াতে পারে। কোনো ব্যক্তি এ ভাইরাসে সংক্রমিত হলে তার সংস্পর্শে এলে, বিশেষত তার হাঁচি বা কাশি থেকে কিংবা তার ব্যবহৃত জিনিসপত্র থেকে এ রোগ ছড়াতে পারে। উপসর্গ দেখা দেওয়ার প্রায় তিন সপ্তাহ পর্যন্ত রোগী সংক্রমণ করতে সক্ষম থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিপাহ ভাইরাসকে একটি ‘প্রায়োরিটি প্যাথোজেন’ বলে বিচার করছে।
তবে এ জীবাণুর কিছু বৈশিষ্ট্য এর সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করতে পারে। যেমন, কোভিডের জীবাণুর মতো এটি ততটা তীব্রভাবে বাতাসে ছড়ায় না। নিপাহ ভাইরাস কেবল বাতাসের ভারী ও ক্ষুদ্র কণায় ভেসে বেড়াতে সক্ষম, যা দুই থেকে তিন ফুটের বেশি দূর পর্যন্ত বায়ুবাহিত থাকে না। অর্থাৎ, আক্রান্ত রোগী থেকে তিন ফুট বা এর বেশি দূরত্বে অবস্থান করলে এ জীবাণু থেকে আক্রান্ত হওয়ার ভয় কম। তবে কোভিডের চেয়ে নিপাহ ভাইরাসে মৃত্যুর হার অনেক বেশি।
এ জীবাণুর কোনো টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসার চলন নেই। এখন আমাদের করণীয় কী? এ মুহূর্তে দেশের জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জীবাণু সংক্রমণ নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে। রোগটির সংক্রমণবিষয়ক উপাত্ত দৈনিক সংগ্রহ করা প্রয়োজন। গত ৭ জানুয়ারি রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) ‘নিপাহ ভাইরাসের বিস্তার ও ঝুঁকি বিষয়ে মতবিনিময়’ সভার তথ্য অনুযায়ী ভাইরাসটির বিষয়ে কঠোর নজরদারি জারি রয়েছে। তাই নির্বাচনের সময় যেন জনগণ মাস্ক ব্যবহার করতে পারে, তা জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিশ্চিত করা দরকার। নিপাহ ভাইরাস দ্রুত শনাক্তকরণের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। যদি কোনো রোগী নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়, তবে তার সম্পূর্ণ কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করা একান্ত আবশ্যক।
- ট্যাগ:
- মতামত
- নিপা ভাইরাস
- সংক্রমণ