নির্মাণ কাজে অবহেলাজনিত মৃত্যুর দায় কার?
ঢাকার আকাশরেখা বদলাচ্ছে দ্রুতগতিতে, উঠছে বহুতল ভবন, চলছে মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে; পাশাপাশি সরকারি–বেসরকারি নানা নির্মাণকাজ।
দৃশ্যমান এই উন্নয়নের আড়ালে প্রতিদিন দিতে হচ্ছে ‘অদৃশ্যমান মূল্য’ তথা অপ্রত্যাশিত ক্ষতি যেমন নির্মাণজনিত ধুলায় বায়ুদূষণজনিত, দিন রাত অসহনীয় শব্দ দূষণজনিত, প্রতিবেশের বাসযোগ্যতায় ক্ষতিজনিত এবং সবচেয়ে ভয়াবহ—শ্রমিক ও পথচারীর প্রাণহানি। এগুলো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এগুলো এমন এক ব্যবস্থাগত দুর্বলতার ফল, যেখানে নিয়মিত তদারকি বা মনিটরিং নেই, সমন্বিত পরিদর্শন নেই, আর দায় নির্ধারণের কার্যকর উদ্যোগ নেই।
দুর্ঘটনার সংখ্যা কেবল সংখ্যা নয়, একটি সতর্ক সংকেত
নির্মাণজনিত কর্মক্ষেত্র-নিরাপত্তা নিয়ে দেশে নিয়মিত যে তথ্য আসে, তা শিউরে ওঠার মতো। বেসরকারি সংস্থা সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটির (এসআরএস) এক জরিপ অনুযায়ী ২০২৫ সালে দেশে কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত অবস্থায় দুর্ঘটনায় নির্মাণ খাতে নিহত হয়েছে ১২০ জন। এটি কেবলমাত্র সংখ্যা নয়; এটি আমাদের নিরাপত্তা শাসনব্যবস্থার (safety governance) ঘাটতির সরাসরি প্রতিফলন।
আর পথচারীর মৃত্যু? “উপর থেকে বস্তু পড়ে মৃত্যু”—এটি এখন শহরের নতুন আতঙ্ক। ২০২২ সালে রাজধানীর উত্তরায় বিআরটি প্রকল্পের নির্মাণাধীন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের গার্ডার চাপায় শিশুসহ একই পরিবারের ৪ জন নিহত হওয়ার ঘটনা নির্মাণ অব্যবস্থাপনা ও পথচারী নিরাপত্তা ব্যবস্থার গাফিলতিই প্রকাশ করে।
সাম্প্রতিককালে গুলশানে একটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে স্টিল রড পড়ে একজন পথচারীর মৃত্যুর ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং দায় নির্ধারণে তদন্ত চলছে। এই ধরনের ঘটনা প্রতিবারই একটি প্রশ্ন তুলে দেয়, নির্মাণসাইটে ন্যূনতম পাবলিক সেফটি ব্যবস্থা—ব্যারিকেড, সেফ প্যাসেজ, ওভারহেড প্রোটেকশন, সেফটি নেট—এসব কি সত্যিই বাধ্যতামূলকভাবে মানানো হচ্ছে?
ধুলা-শব্দ: নির্মাণের ‘স্বাভাবিক প্রভাব’ নয়, জনস্বাস্থ্যের বিষয়
নির্মাণকাজ মানেই খনন, কাটিং-গ্রাইন্ডিং, বালি-সিমেন্টের কণা, ট্রাক-ডাম্পারের চলাচল, সারাদিনের উচ্চ শব্দ। ঘনবসতিপূর্ণ শহরে এগুলো শুধু বিরক্তির বিষয় নয়; এগুলো শ্বাসতন্ত্রের রোগ, শিশু-বয়স্কদের ঝুঁকি, ঘুম ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি—সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের এক নথিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ২০১৯ সালে PM2.5 দূষণের কারণে ১,৫৯,০০০-এর বেশি অকাল প্রাণহানি হয়েছে এবং স্বাস্থ্য ক্ষতির আর্থিক মূল্য জিডিপি-এর প্রায় ৮.৩ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের উদ্যোগও আছে। ২০২৫ সালে সরকার শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২৫ জারি করেছে—গেজেটেও এর উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো, নির্মাণসাইট-কেন্দ্রিক শব্দ নিয়ন্ত্রণ, রাতের বেলা কাজের সীমা, উচ্চ ডেসিবেল উৎস নিয়ন্ত্রণ—এসব মাঠপর্যায়ে নিয়মিতভাবে কীভাবে মনিটর হবে, আর ভায়োলেশন হলে কীভাবে দ্রুত ব্যবস্থা হবে?
দায়িত্ব বিভাজনের ফাঁদ: ‘সবাই আংশিক দায়ী, তাই কার্যত কেউ দায়ী নয়’
নির্মাণকাজের নিয়ন্ত্রণে একাধিক সংস্থা জড়িত—এটাই স্বাভাবিক। সমস্যা হয় তখনই, যখন সমন্বয় না থাকে; কর্তৃত্ব-রুটিন-প্রক্রিয়া স্পষ্ট না থাকে।
১। পরিবেশ অধিদপ্তর (DoE): আইন আছে, কিন্তু নির্মাণসাইটের ধুলা-শব্দ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত মনিটরিং, জরিমানা, পুনরাবৃত্তিতে কাজ বন্ধ—এসবের দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক প্রয়োগ সীমিত।
২। সিটি কর্পোরেশন/পৌরসভা: কোথাও কোথাও পানি ছিটানো, অভিযান বা সতর্কতা দেখা যায়; কিন্তু তা অনেক সময় খণ্ড খণ্ড ও অনিয়মিত।
৩। অনুমোদনকারী সংস্থা (রাজউক/অন্যান্য কর্তৃপক্ষ): অনুমোদন ও নকশা-বিধিমালায় নজর আছে, কিন্তু নির্মাণকালীন পরিবেশ-প্রতিবেশ-পাবলিক সেফটি কমপ্লায়েন্সকে ‘নিয়মিত অপারেশন’ হিসেবে বাধ্যতামূলক যাচাই করার প্রক্রিয়া অনুপস্থিত।
৪। শ্রম পরিদর্শন, ফায়ার সার্ভিস, ইউটিলিটি সংস্থা: প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্বে কাজ করে; কিন্তু একীভূত ‘সাইট কমপ্লায়েন্স কমান্ড’ না থাকায় দায়-জবাবদিহির তাতে তৈরি হয় না।
- ট্যাগ:
- মতামত
- ভবন নির্মাণ
- দুর্ঘটনায় মৃত্যু