ভবিষ্যৎ বন্ধক, বর্তমান অনিশ্চিত: বাংলাদেশের অর্থনীতি কোন পথে

বণিক বার্তা আশানুর রহমান প্রকাশিত: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:০৭

ঋণ, বৈষম্য ও আস্থাহীনতার ত্রিভুজে বাংলাদেশ: ২০২৬ কি অর্থনীতির মোড় ঘোরাতে পারবে



একটি দেশের অর্থনীতি অনেকটা নদীর মতো। দূর থেকে দেখলে স্রোতটা মসৃণ মনে হয়, জল চিকচিক করে। কিন্তু কাছাকাছি গেলে বোঝা যায়, কোথাও ভাঙন, আর কোথাও পলি জমে পথ আটকে গেছে। কোথাও আবার নিচে ঘূর্ণি তৈরি হয়ে আছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ ঠিক সেই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যার উপরিভাগে স্থিতির আভাস, অথচ ভেতরে জমে আছে অস্বস্তি।


সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় দৈনিকগুলোয় প্রকাশিত অর্থনৈতিক প্রতিবেদন ও কলামগুলো একসঙ্গে পড়লে এ অস্বস্তির মানচিত্রটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২৫ জানুয়ারি ২০২৬-এ বণিক বার্তার সরকারি ঋণবিষয়ক বিশ্লেষণ জানাচ্ছে ঋণের ভারের কথা। একই দিন প্রথম আলোতে আলতাফ পারভেজ লিখছেন বৈষম্যের গভীর ক্ষতের কথা। আর এ দুইয়ের মাঝখানে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে ব্যাংক খাত। যেন নদীর সেই সেতু, যার ওপর দিয়ে পুরো অর্থনীতির যাতায়াত, অথচ যার পিলারেই ফাটল ধরেছে।


একজন ব্যাংকার হিসেবে দিনের পর দিন সংখ্যার ভেতর বসবাস করলেও আমি জানি অর্থনীতি শুধু সংখ্যা নয়। এটি মানুষের অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা আর ক্ষীণ আশার গল্প। ২০২৬ সালের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা তাই খুব সাধারণ, আবার খুব কঠিন। এ স্রোত কি নতুন দিকে মোড় নেবে, নাকি একই জায়গায় ঘুরপাক খেতে থাকবে?


ঋণের স্রোত: উন্নয়নের জল না ভবিষ্যতের প্লাবন


ঋণ একসময় বাংলাদেশের জন্য ছিল গতির জ্বালানি। অবকাঠামো তৈরি হয়েছে, বিদ্যুৎ এসেছে, যোগাযোগ সহজ হয়েছে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন ঋণ আর পরিকল্পনার অংশ থাকে না, বরং হয়ে ওঠে স্বাভাবিক অভ্যাস। যেন প্রতি বাজেটেই ঘাটতি মানে নতুন করে ধার।


২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার ৩ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছে। ফলে মোট সরকারি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার ওপরে। এ সংখ্যাটা কেবল বড়ই নয়, এটি বড্ড ভারী। কারণ এর সঙ্গে ঝুলে আছে ভবিষ্যতের দায়।


একজন ব্যাংকার হিসেবে আমি জানি, ঋণের সবচেয়ে নির্দয় দিকটি হলো সুদ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার সুদ পরিশোধেই ব্যয় করেছে ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ রাষ্ট্রের ব্যয়ের প্রতি ৫ টাকার ১ টাকাই যাচ্ছে অতীতের দায় মেটাতে। এ টাকা স্কুলে যায় না, হাসপাতালে যায় না, সামাজিক সুরক্ষায় যায় না। এটি অতীতের সিদ্ধান্তের জন্য বর্তমানকে দেয়া খেসারত।


আরো উদ্বেগের বিষয় হলো এটা যে এই ঋণের বড় অংশ এমন সব প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হয়েছে বা হচ্ছে, যেগুলো থেকে রিটার্ন আসবে কিনা সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কিছু প্রকল্প যেন বিশাল দালানের মতো। দূর থেকে দৃশ্যমান, কিন্তু ভেতরে আয় নেই, শুধু রক্ষণাবেক্ষণের খরচ। ঋণ তখন উন্নয়নের হাতিয়ার না হয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক ধরনের নীরব বোঝায় পরিণত হয়।


রাজস্বের শুকনো খাত: নদীর জল কমে গেলে যা হয়


ঋণের এ স্রোত কেন থামছে না? এর উত্তর লুকিয়ে আছে রাজস্ব ব্যবস্থার ভেতরে। বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত বহু বছর ধরেই ৭ শতাংশের নিচে। এটি যেন একটি নদীর উৎসেই পানি কম থাকার মতো অবস্থা।


রাষ্ট্রের নিজের আয় কম। অথচ ব্যয়ের প্রয়োজন বাড়ছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে। এ ফাঁক পূরণের সবচেয়ে সহজ পথ হয়ে ওঠে ঋণ। কিন্তু সহজ পথ সব সময় টেকসই হয় না।


আমাদের রাজস্ব কাঠামো এমন যে সবচেয়ে সহজে কর আদায় হয় সাধারণ মানুষের কাছ থেকে। ভ্যাট আর পরোক্ষ করের মাধ্যমে বাজারে গেলেই কর দিতে হয়। যে মানুষটি হিসাব করে চাল কিনছে, যে পরিবার মাস শেষে টানাটানি করছে; তাদের অজান্তেই করের বোঝা কাঁধে চাপে।


অন্যদিকে উচ্চ আয়ের বড় অংশ কর জালের বাইরে থেকে যায়। কর ফাঁকি, কর ছাড়, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সুবিধা; এসব মিলিয়ে রাজস্ব ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে বৈষম্যের নীরব সহযাত্রী। গবেষণাগুলো দেখায়, কর ফাঁকি ও দুর্নীতি বন্ধ করা গেলে বর্তমান কাঠামোর মধ্যেই রাজস্ব আয় দ্বিগুণ করা সম্ভব। কিন্তু সেটির জন্য দরকার সেই সাহস, যা দিয়ে প্রভাবশালীদের চোখে চোখ রেখে কথা বলা যায়।


বৈষম্য: অর্থনীতির নিচে জমে থাকা আগ্নেয়গিরি


আলতাফ পারভেজ তার লেখায় যে বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরেছেন, তা কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি সমাজের মানসিক মানচিত্র। শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষের হাতে জাতীয় সম্পদের প্রায় ৬০ শতাংশ। নিচের অর্ধেক মানুষের ভাগে কয়েক শতাংশও নেই।


এ বৈষম্য প্রতিদিন চোখে পড়ে। ব্যাংকে বসে দেখি, কেউ কোটি টাকা রেখে সুদের হার নিয়ে দরকষাকষি করেন, আবার কেউ কয়েক হাজার টাকা তুলতে এসে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন, আজ কি পুরো টাকাটা পাওয়া যাবে? এ দুই দৃশ্য একই অর্থনীতির ভেতরে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।


২০২৫ সালে মধ্যবিত্তের সঞ্চয় দ্রুত গলে গেছে। অনেক পরিবার সন্তানের পড়াশোনার খরচ কমিয়েছে, চিকিৎসা পিছিয়েছে। এগুলো ক্ষুদ্র সিদ্ধান্ত মনে হলেও এর ভেতরেই লুকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের বড় ক্ষতি। কারণ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য থেকে সরে যাওয়া মানে একটি প্রজন্মের সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে ফেলা।


বৈষম্য শুধু সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে না; এটি অর্থনীতির গতিও শ্লথ করে। যাদের হাতে আয় নেই, তারা ভোগ করতে পারে না। ভোগ না থাকলে উৎপাদন বাড়ে না। উৎপাদন না বাড়লে বিনিয়োগ আসে না। এই চক্র একসময় পুরো অর্থনীতিকে ভারী করে তোলে, ঠিক যেন নদীতে পলি জমে স্রোত ধীর হয়ে যাওয়ার মতো।


২০২৬: মোড় নাকি ঘূর্ণি


সব মিলিয়ে ২০২৬ সাল বাংলাদেশের জন্য একটি সন্ধিক্ষণ। এটি হতে পারে নদীর মোড় ঘোরানোর বছর, আবার হতে পারে একই জায়গায় ঘূর্ণির মধ্যে আটকে পড়ার সময়।


এই মোড় ঘোরাতে হলে প্রথমেই বুঝতে হবে যে ঋণ, রাজস্ব ও বৈষম্য আলাদা সমস্যা নয়। এগুলো একটি ত্রিভুজের তিন বাহু। একটিকে না ছুঁয়ে অন্যটি ঠিক করা যাবে না।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও