সৌরবিপ্লবের বিচ্যুতি একটি পরিকল্পিত বাধা
বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতার সমীকরণে সৌরশক্তির সম্ভাবনাকে অত্যন্ত সুকৌশলে রুদ্ধ করা হয়েছে। যদি ষাটের দশকে পৃথিবী সৌরশক্তিতে রূপান্তরিত হতো, তবে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ থেকে প্রেসিডেন্টকে নির্লজ্জভাবে এভাবে তুলে নিয়ে আসা হতো না, মধ্যপ্রাচ্যের তেল নিয়ে গত কয়েক দশকের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, ইরাক আক্রমণ, লিবিয়ার পতন বা আজকের ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের মতো ভূ-রাজনৈতিক সংকটগুলোর মুখোমুখি আমাদের হতে হতো না। অথচ জ্বালানিনিরাপত্তাকে (এনার্জি সিকিউরিটি) যুদ্ধের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করার ফলে আজ আমাদের সভ্যতা রক্ত আর ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। এই ৬০ বছরের বিলম্ব কেবল জলবায়ু পরিবর্তনই ত্বরান্বিত করেনি, বরং মানবসভ্যতাকে এক অন্তহীন অস্থিতিশীল ভূ-রাজনৈতিক সংকটের আবর্তে নিক্ষেপ করেছে।
সৌরশক্তির প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হলো এর প্রাকৃতিক বিকেন্দ্রীকরণ। সূর্য পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে সমানভাবে আলো দেয় বলে শক্তি উৎপাদনের সুযোগ কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা বা খনি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না। হারম্যান শিয়ারের মতো চিন্তাবিদদের মতে, এই প্রযুক্তির ব্যবহারে বিশাল পুঁজি বা মেগা প্রজেক্টের চেয়ে বেশি প্রয়োজন অগুনতি ক্ষুদ্র বিনিয়োগ এবং তৃণমূল পর্যায়ের স্থাপনা। যখন একজন সাধারণ মানুষ নিজের বাড়ির ছাদে বা খামারে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, তখন সে আর বড় কোনো পাওয়ার গ্রিড বা তেল কোম্পানির মুখাপেক্ষী থাকে না। এই প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু রাজধানী বা মেগাসিটি থেকে সরে গিয়ে পল্লি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, যা বড় ট্রানজিশনাল বিজনেস গ্রুপগুলোর একচেটিয়া আধিপত্যকে অচল করে দেয়। এ প্রসঙ্গে ই এফ শুমাখার ১৯৭৩ সালে রচিত তাঁর বিখ্যাত ‘স্মল ইজ বিউটিফুল: আ স্টাডি অব ইকনোমিকস অ্যাজ ইফ পিপল ম্যাটারড’ গ্রন্থে লিখেছেন—‘বড় মানেই ভালো নয়’। তিনি ‘ক্ষুদ্র ও মাঝারি ফার্ম’ এবং ‘বিকেন্দ্রীকরণ’-এর ধারণার মাধ্যমে এমন এক অর্থনীতির কথা বলেছিলেন যা মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে। মূলত এই ‘শক্তির গণতন্ত্র’ বা পুঁজির গণতান্ত্রিকীকরণ রুখতেই প্রভাবশালী শক্তিগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথে পরিকল্পিতভাবে বাধার প্রাচীর তৈরি করে রেখেছে।
সভ্যতার অগ্রযাত্রা মূলত মানুষের শ্রমকে শক্তিতে রূপান্তরের ইতিহাসেরই নামান্তর। বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে পরিবেশবিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ হারম্যান শিয়ার তাঁর যুগান্তকারী ‘সোলার ইকোনমি’ গ্রন্থে একটি নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সৌরশক্তিতে পদার্পণ কেবল একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়, বরং এটি একটি গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তির পথ। আজ থেকে প্রায় ৬০ বছর আগেই পৃথিবীর সামনে সুযোগ ছিল এক বিকেন্দ্রিক ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ার। অথচ পুঁজির কেন্দ্রিকতা ও ক্ষমতার লালসায় সেই সম্ভাবনাকে পরিকল্পিতভাবে নস্যাৎ করে দেওয়া হয়েছে। আজ একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে দাঁড়িয়ে আমরা যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের জয়গান গাইছি, তখন রূঢ় সত্যটি হলো—আমরা কি ভুল পথে অনেকটা পথ চলে এসেছি? জলবায়ু সংকট আর যুদ্ধের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আজ এই প্রশ্নটিই সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে যে স্রেফ গুটিকতক গোষ্ঠীর ক্ষমতার স্বার্থে মানবসভ্যতা কেন সৌরবিপ্লবের মতো একটি অবধারিত সুযোগের ৬০টি বছর অপচয় করল।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৬০-এর দশকেই সৌরশক্তির বিপ্লব ঘটা সম্ভব ছিল। ১৯৫৪ সালে বেল ল্যাবে প্রথম ব্যবহারযোগ্য সিলিকন সোলার সেল আবিষ্কৃত হয়। ষাটের দশকে মহাকাশ গবেষণায় যখন ভ্যানগার্ড-১ কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানো হয়, তাতে সফলভাবে সৌরশক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। অর্থাৎ, প্রযুক্তিটি আমাদের নাগালে ছিল। কিন্তু সেই সময় থেকেই ‘এনার্জি কার্টেল’ বা তেল উৎপাদনকারী গোষ্ঠীগুলো প্রবল লবিং শুরু করে। তারা বুঝতে পেরেছিল, সৌরশক্তি জনপ্রিয় হলে তাদের খনি আর পাইপলাইনের কোনো মূল্য থাকবে না। ফলে সোলার প্রযুক্তির ওপর উচ্চহারে কর আরোপ করা হয় এবং গবেষণা ও উন্নয়নের (আর অ্যান্ড ডি) সিংহভাগ অর্থ বরাদ্দ করা হয় পারমাণবিক শক্তি বা তেলের খনি খোঁজার পেছনে। আর্থার সি ক্লার্কের মতো দূরদর্শী মানুষেরা তখন থেকেই চিৎকার করে বলছিলেন যে সূর্যই আমাদের ভবিষ্যৎ। কিন্তু বাণিজ্যের নায়কেরা সাধারণ মানুষের কানে সেই বার্তা পৌঁছাতে দেয়নি।
৩০ বছর আগে, অর্থাৎ নব্বইয়ের দশকের শুরুতে যখন বিশ্ব উষ্ণায়ন নিয়ে প্রথম বড় মাপের সতর্কবার্তা এল, তখনো যদি আমরা শুরু করতাম, তবে আজ ভূ-রাজনীতি ভিন্ন হতো। এই ৩০ থেকে ৬০ বছরের বিলম্ব কেবল একটি ভুল নয়, এটি মানবসভ্যতার বিরুদ্ধে এক পরিকল্পিত অর্থনৈতিক অপরাধ।
শতাব্দীর শুরুতে বিশ্বের প্রথম সারির পত্রিকাগুলো যখন দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব বা সবুজ জ্বালানি বিপ্লবের সম্ভাবনার কথা বলছিল, তখন অত্যন্ত সুকৌশলে সবার মনোযোগ ঘুরিয়ে দেওয়া হলো চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দিকে। অথচ স্টিফেন হকিং স্বয়ং এই অনিয়ন্ত্রিত এআই নিয়ে চূড়ান্ত আশঙ্কার কথা শুনিয়েছিলেন; তিনি মনে করতেন এটি মানুষের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, এআই এবং এর বিশাল ডিজিটাল অবকাঠামো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ডেটা সেন্টারগুলো গুটিকতক টেক-জায়ান্টের নিয়ন্ত্রণে থাকায় তা পুঁজির আরও চরম কেন্দ্রীকরণ ঘটায়। যেখানে সৌরশক্তির সহজলভ্যতা মানুষকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি দিয়ে স্বাবলম্বী করতে পারত, সেখানে বর্তমান প্রযুক্তিক প্রবণতা মানুষকে আরও বেশি বৃহৎ করপোরেশনের মুখাপেক্ষী করে তুলেছে। বাণিজ্যিক প্রবণতার ধারকেরা সৌরশক্তির সামাজিক গুরুত্বকে আড়ালে ঠেলে দিয়ে এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যা মানুষকে পরনির্ভরশীল করে তোলার পাশাপাশি তার স্বকীয়তাকেও বিচ্যুত করেছে। আজ তারা সমাজের নায়ক সেজে বসে আছে, যারা মূলত পৃথিবীর ভবিষ্যৎকে বন্ধক দিয়ে নিজেদের মুনাফা লুটছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বিপ্লব
- সৌরশক্তি
- বিশ্ব রাজনীতি