দ্বৈত নাগরিকদের অংশগ্রহণ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে
নির্বাচনি ট্রেন যাত্রা শুরু করেছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাসে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন যে কোনো বিচারেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যবাহী। এটি শুধু রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদলের নির্বাচন নয়, এটি যুগান্তকারী একটি নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে জাতি কি উদার গণতান্ত্রিক পথে যাত্রা শুরু করবে, নাকি আবারও স্বৈরশাসনের নিকষ কালো অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। যেমনটি হয়েছিল ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর। চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে গণ-আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছে, তা বাস্তবায়ন এবং জুলাই শহীদদের চাওয়া অনুযায়ী সব ধরনের বৈষম্য বিলোপের মাধ্যমে বাংলাদেশকে সত্যিকার একটি জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত করার এ সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য আসন্ন নির্বাচন খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। নির্বাচনের মাধ্যমে যদি সত্যিকার জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকার গঠন করা না যায়, তাহলে দেশ আবারও দীর্ঘমেয়াদের জন্য বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে। জনগণ যদি তাদের পছন্দমতো উপযুক্ত প্রার্থীকে ভোটদানের মাধ্যমে নির্বাচিত করতে পারে, তাহলে রাষ্ট্রপরিচালনায় জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটবে এবং দেশ সঠিক পথে পরিচালিত হবে। আগামীতে আর কোনো সরকার যাতে নির্বাচনব্যবস্থাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে বিগত সরকারের মতো স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করতে না পারে, তা নিশ্চিত করার জন্য আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিগত সরকারামলে ১৬ বছর দেশের মানুষ নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। ২০০৯ সালে যাদের বয়স ছিল ১৮ বছর, তারা অন্তত ১৭ বছর নির্বাচনে ভোট দিতে পারেনি। ভোটাধিকারবঞ্চিত এ বিপুলসংখ্যক তরুণসহ দেশের জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। নির্বাচনে কারা জয়লাভ করবে, কারা পরাজিত হবেন, এটি বিবেচ্য বিষয় নয়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হচ্ছে, নির্বাচনটি অবাধ, নিরপেক্ষ এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য হচ্ছে কিনা।
ইলেকশন কমিশন (ইসি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই কাজ সম্পন্ন করেছে। গত ২০ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষদিন পর্যন্ত ২৯৮টি সংসদীয় আসনে প্রায় ২ হাজার প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। অর্থাৎ প্রতিটি আসনে প্রায় সাতজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এর মধ্যে শীর্ষ রাজনৈতিক দল বিএনপির প্রার্থীরা ২৮৫টি আসনে এবং জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের প্রার্থী আছেন ২৪৩টি আসনে। দল দুটো অবশিষ্ট আসন তাদের রাজনৈতিক মিত্রদের জন্য ছেড়ে দিয়েছে। পাবনা-১ ও পাবনা-২ আসনে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। এ দুটি আসনে নতুন নির্বাচনি তফসিল ঘোষণা করা হবে। নির্বাচন ব্যাপকমাত্রায় অংশগ্রহণমূলক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় তারা ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছে না। নির্বাচনে ৭৯টি সংসদীয় আসনে বিএনপির ৯২ জন বিদ্রোহী প্রার্থী এবং একটি সংসদীয় আসনে জামায়াতের একজন বিদ্রোহী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য ৪৭৮ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ ২ হাজার ৫৬৯ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বাছাইয়ে ৭২৩ জন প্রার্থী বাদ পড়লেও পরবর্তীকালে আপিলের মাধ্যমে ৩০৫ জন তাদের প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। তাদের মধ্যে ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকরাও রয়েছেন, যা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনার পরিপন্থি।
রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বাছাইয়ে প্রার্থীদের বাদ দেওয়া-না দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। প্রাথমিক বাছাইয়ে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগে ২৪ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হলেও আপিলের মাধ্যমে ২১ জন তাদের প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। একইভাবে ঋণখেলাপিদের অনেকেই নানা কৌশলে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্যতা নিশ্চিত করেছেন। নির্বাচন কমিশন থেকে দাবি করা হয়েছে, তারা জুলাই চেতনাকে সামনে রেখে নির্বাচনি কার্যক্রম পরিচালনা করছেন; কিন্তু দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগদান কোনোভাবেই জুলাই চেতনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে পারে না। এছাড়া সংবিধানের ৬৬ নম্বর অনুচ্ছেদ ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ১২নং অনুচ্ছেদ মোতাবেক, দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপিরা নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অযোগ্য বিবেচিত হবেন। তাহলে কীভাবে দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপিরা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্য বলে বিবেচিত হলেন? একজন নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, ‘আইন পারমিট করায় ঋণখেলাপিদের মনে কষ্ট নিয়ে ছাড় দিয়েছি।’ অন্য একজন নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, ‘মনোনয়ন বৈধ করলাম। মানুষ হিসাবে বলছি, ব্যাংকের টাকা দিয়ে দিয়েন।’
কথায় বলে, ‘চোরা নাহি শুনে ধর্মের কাহিনি’। একজন নির্বাচন কমিশনার পরামর্শ দেবেন, আর ঋণখেলাপিরা ভালো হয়ে যাবেন; ব্যাংকের ঋণকৃত অর্থ ফেরত দেবেন, এটা কি প্রত্যাশা করা যায়? আরেকজন নির্বাচন কমিশনার আইনের দোহাই দিয়েছেন। আমাদের মনে রাখতে হবে, কোনো আইনই চিরস্থায়ী নয়। আর আইন মানুষের কল্যাণ ও অধিকার নিশ্চিত করার জন্যই তৈরি হয়, মানুষ আইনের জন্য তৈরি হয় না। ইসি যদি ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা থেকে বাদ রাখতে চাইত, তাহলে সে ব্যবস্থাও ছিল। তারা নিজেরা অথবা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রশাসনিক অধ্যাদেশ জারি করাতে পারতেন। কিছুদিন আগে বাংলাদেশ ব্যাংক ২ শতাংশ নগদ ডাউন পেমেন্ট জমাদানসাপেক্ষ ঋণখেলাপিদের দুই বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলিকরণের সুবিধা দিয়েছে। বিগত সরকারামলে আ হ ম মোস্তফা কামাল অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন ঋণখেলাপিদের এ ধরনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, যা নিয়ে সেই সময় প্রচণ্ড সমালোচনা হয়েছিল। তখন গ্রেস পিরিয়ড দেওয়া হয়েছিল এক বছর, আর এখন গ্রেস পিরিয়ড দেওয়া হয়েছে দুই বছর। প্রশ্ন হলো, নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে ঋণখেলাপিদের এমন আপত্তিকর সুবিধা কেন দেওয়া হলো? ইসি হয়তো বলবে, বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলিকরণের সুযোগ দিয়েছে, এক্ষেত্রে আমাদের কী করণীয় থাকতে পারে? তাদের করার অনেক কিছুই ছিল। নির্বাচন কমিশন নিজেরা অথবা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এমন একটি অধ্যাদেশ জারি করতে অথবা করাতে পারতেন যে, কোনো ব্যক্তিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হলে তাকে অন্তত এক বছর আগে থেকে ঋণখেলাপিমুক্ত থাকতে হবে। কোনো বিশেষ সুবিধার আওতায় নয়, কিস্তি পরিশোধের মাধ্যমে এক বছর আগেই নিজেকে ঋণখেলাপি ‘তকমা’ মুক্ত করতে হবে।