শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে কোন সংকট
এমন একটি সময় ছিল যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়াকে দেখা হতো সামাজিকভাবে একটি মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসেবে। এই শতাব্দীর শুরুর দিকেও আমাদের অনেক বন্ধু ও পরিচিতজনদের দেখেছি সরকারি উচ্চপদস্থ বিভিন্ন চাকরি ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করতে। ছাত্রছাত্রীদের শেখানোর নেশা এবং সামাজিক মর্যাদাই ছিল তাঁদের এই সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে।
নিজেকে সত্যিকার অর্থে একজন শিক্ষকে রূপান্তরিত করার বিষয়টি বেশ কঠিন হলেও এখনো অনেকে শিক্ষকতার পেশাকে একটি মহান ব্রত হিসেবে দেখেন। হয়তো আমরা অনেকেই নিজেদের সেই আদর্শ শিক্ষকে রূপান্তর করতে পারিনি, যার দায় আমরা এড়াতে পারি না। ঠিক তেমনি শিক্ষকদের সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে না পারার পেছনে শিক্ষার্থীদেরও দায় রয়েছে।
এ কারণে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা পরস্পর থেকে দূরে চলে যাচ্ছেন এবং তাঁদের মধ্যেকার আস্থা ও বিশ্বাসের ঘাটতি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সম্পর্কের অবনতির চূড়ান্ত ফলাফল দেখি শিক্ষার্থীদের হাতে শিক্ষকদের নানা নিগ্রহের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে, যা আমাদের সমাজ ও শিক্ষাঙ্গনের জন্য একটি উদ্বেগের বিষয়।
পত্রিকার পাতার নানা সংবাদের ভিড়ে আমাদের প্রায়ই দেখতে হয় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কী করে শিক্ষকদের গায়ে শিক্ষার্থীদের হাত উঠে যাচ্ছে, শিক্ষকদের সম্মানহানি হচ্ছে। তেমনি শিক্ষকদের শিক্ষকসুলভ আচরণের অভাবের কারণে অনেক শিক্ষার্থীর ভোগান্তির অভিজ্ঞতাও আমরা দেখতে পাই।
কয়েক দশক ধরে এ ধরনের ঘটনা যেন ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকার কথা, যে সৌহার্দ্য থাকার কথা, তার বিপরীতে একটি বিভাজন ও দূরত্বের সম্পর্ক আমরা স্পষ্টতই দেখতে পাই, যা কোনোভাবেই একটি শিক্ষাব্যবস্থায় কাম্য নয়। কী এমন ভুল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় রয়ে গেল, যে জন্য সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন।
কী করে আমাদের সমাজের সেই ঐতিহাসিক গুরু-শিষ্যের আস্থা, বিশ্বাস ও সম্মানের সম্পর্ক আজ ঝুঁকির মুখে, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সময় অনেক আগে হলেও আমরা এখনো তার কোনো কিনারা করতে পারিনি। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও এ সমস্যার সমাধানে তেমন কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে বলে আমরা দেখতে পাইনি।
বিষয়টিকে কেবল শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের মধ্যকার টানাপোড়েন কিংবা রাজনৈতিক দর্শনের বিভেদ হিসেবে দেখা যাবে না, বরং বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় যে দীর্ঘ রাজনৈতিকীকরণের প্রক্রিয়া চলমান, সেটাই দায়ী বলে বলা যায়।
দুই.
শিক্ষাব্যবস্থায় রাজনৈতিকীকরণের একটি বড় প্রভাব দেখি শিক্ষক নিয়োগের সময়। রাজনৈতিক প্রভাব ও পরিচিতি যেন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হওয়ার একটি অন্যতম মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে একজন শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেতে বেশ বেগ পেতে হয়। অনেক শিক্ষার্থী যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যেমন শিক্ষক হতে পারেন না, আবার কেউ কেউ কম যোগ্যতা নিয়ে বা যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও কেবল রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে শিক্ষক হয়ে উঠছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের মধ্যে রাজনৈতিক যুক্ততাকে একধরনের যোগ্যতা হিসেবে দেখার প্রবণতা বিগত সময়ের মতো এখনো দৃশ্যমান, যা সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি শিক্ষক নিয়োগ বিতর্কের মধ্য দিয়ে আবারও প্রকাশিত হলো। এই পুরো রাজনৈতিকীকরণের প্রক্রিয়ায় একটি স্বার্থান্বেষী শিক্ষকগোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটেছে, যাদের ক্ষমতার উৎস ক্ষমতাবান রাজনৈতিক দল।
শিক্ষাঙ্গনে এই রাজনৈতিকীকরণের বীজ যেন আজকে এক বৃহৎ বিষবৃক্ষে পরিণত হয়েছে, যার নানা নেতিবাচক প্রভাব আমরা শিক্ষাঙ্গনে দেখতে পাই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বড় বড় রাজনৈতিক দলের লেজুরবৃত্তিক ছাত্র সংগঠনগুলো যেমন সক্রিয়, ঠিক তেমনিভাবে শিক্ষকদেরও একাডেমিক পরিচয় ছাপিয়ে রাজনৈতিক পরিচয় অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- মুখোমুখি
- শিক্ষক-শিক্ষার্থী