মৃত শিশুর সঙ্গে জীবিত পিতার সাক্ষাৎ
শিরোনামটি একটি পূর্ণাঙ্গ লাইনের সংক্ষিপ্ত রূপ। এই লাইনটির স্রষ্টা কবি ইমতিয়াজ মাহমুদ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে শেয়ার করা পুরো লাইনটি হলো—‘মৃত শিশু দেখা করতে গেছে, তার জীবিত পিতার সাথে’। এই লাইনটি কোন বেদনাদায়ক প্রেক্ষাপটে লেখা, তা খুব সম্ভবত দেশে-বিদেশে প্রায় সব বাংলাদেশিরই জানা হয়ে গেছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ কতটা নিষ্ঠুর ও ভয়ানক হতে পারে, সেটি প্রকাশে কবির এই এক লাইনের মহাকাব্যিক প্রকাশ ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। একটু স্মরণ করিয়ে দেই, এই কবিই চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে ১৭ জুলাই জাপানি হাইকু কাঠামোর একটি কবিতা লিখেছিলেন। সেটি ছিল—‘লেখা আছে হাতের রেখায়, জাহাজ ডুববে অহমিকায়’। শেষ পর্যন্ত কিন্তু শেখ হাসিনার জাহাজ ডুবেছিল।
শেখ হাসিনার অহমিকার জাহাজ ডুবতে বেশি দিন লাগেনি। ডোবার আগে তার পরিবার-পরিজন, নাতি-পুতি, জ্ঞাতি-গোষ্ঠী প্রায় সবাই ভিআইপি প্রোটোকলে পালিয়েছেন। মন্ত্রী-সভাসদ, স্তাবক-চাটুকার ও লুটেরাদেরও অনেকেই দেশ ছেড়েছেন আগে-পরে। আর দেশের ৬৪টি জেলায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিষে নীল হচ্ছে ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ দলটির বিভিন্ন সংগঠনের তৃণমূলের কর্মীরা। রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় প্রাণ বিসর্জনের এই তালিকায় সবশেষ সংযোজন বাগেরহাট সদর উপজেলার ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দামের পরিবার। গত শুক্রবার সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে জুয়েলের বাড়ি থেকে স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালী ও তার ৯ মাস বয়সী শিশু সেজাদ হাসান নাজিফের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। খুব সম্ভবত অবসাদ ও ভবিষ্যৎজনিত দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়েছিলেন কানিজ সুবর্ণা, তাই শিশুটিকে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করেছেন। পুলিশ অবশ্য এখনই মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলছে না। শিশু সন্তান ও স্ত্রীর জানাজায় অংশগ্রহণের জন্য প্যারোলে মুক্তি পেতে পারতেন সাদ্দাম। সামান্য কয়েক ঘণ্টার এই মুক্তিও পাননি। অবশেষে স্বজনরা অ্যাম্বুলেন্সে মরদেহ নিয়ে যশোর কারাগারে যান। এই কারাগারেই আছেন সাদ্দাম।
২০২৪ সালের জুলাই থেকে বাংলাদেশে এক অভূতপূর্ব নৈরাজ্য চলছে। আশা ছিল কর্তৃত্ববাদী শেখ হাসিনার পতনের পর হানাহানির অবসান হবে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে, গুণগত পরিবর্তন হবে রাজনীতি ও মানবাধিকার পরিস্থিতির। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে নয়া বন্দোবস্তের আশাবাদও জেগেছিল অনেকের মনে। কিন্তু সবকিছু ফিকে হয়ে গেছে অতি দ্রুত, অবিশ্বাস্য সব ঘটনায়।
শেখ হাসিনার প্রায় ১৬ বছরের শাসনামলের গুম-খুন ও নানা গা হিম করা নির্যাতনের ইতিহাসকে পেছনে ফেলে নতুন এক ইনসাফ ও মানবাধিকার সুরক্ষার দেশ পাওয়ার স্বপ্ন ছিল কোটি কোটি মানুষের। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, হানাহানি, হেফাজতে প্রশ্নবিদ্ধ মৃত্যু ও মানুষের আহাজারির শেষ হলো কোথায়? প্রায় নিয়ম করে দেশের বিভিন্ন কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতাদের মৃত্যু হচ্ছে। বিএনপি নেতারা মরছেন অন্তর্দলীয় কোন্দলে। র্যাব কর্মকর্তা মরছেন সন্ত্রাসীদের হামলায়। এ কোন বাংলাদেশ!
একটা কথা জোরালোভাবে বলা প্রয়োজন, মানবাধিকারের প্রশ্নে সিলেকটিভ হওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিটি মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু এই দায়িত্ব যারা পালন করছেন, তারা আছেন এক অলীক দুনিয়ায়। ২০২৪ সালের ৮ অগাস্ট মুহাম্মদ ইউনূস যখন সরকারের দায়িত্ব নিলেন, তখন অনেকের মতো আমিও আশাবাদী হয়েছিলাম। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া একদল মেধাবী ও পরীক্ষিত পেশাজীবীর এই সরকারের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা ছিল প্রবল। বিশেষ করে মানবাধিকারের প্রশ্নে এই সরকারের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হায়! দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও মানবাধিকার রক্ষায় এই সরকার যা করেছে, তা রীতিমতো হতাশার।
হ্যাঁ, হাসিনা আমলের গুম-খুনের বিচারে সরকারের অনেক উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু এই সরকারের আমলে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় তারা মোটামুটি টিনের চশমায় দেখেন। যে কারণে কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে দেওয়া হয়, জ্যান্ত মানুষকে যিশুর মতো ঝুলিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়—সরকার মোটামুটি নির্বিকার থাকে। এক হত্যা মামলায় শত শত নিরপরাধ মানুষকে হয়রানির সময়ও সরকার নিশ্চুপ থাকে। মাজার, খানকাহ, বাউলের আখড়া, সুফি সাধকের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রতিকার না করে পয়দা করে দায়সারা ফেইসবুক পোস্ট। এত যোগ্য মানুষের এমন অক্ষম, অথর্ব সরকার বাংলাদেশে আর কখনও কেউ দেখেছে কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ হয়!