নির্বাচন, জাল কনটেন্ট এবং শনাক্তকরণ প্রযুক্তি
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে কনটেন্ট তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার বিশ্বজুড়ে জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে কোনটি মানুষের লেখা আর কোনটি এআই দ্বারা তৈরি, তা শনাক্ত করা এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসাবে মনে করা হচ্ছে। বর্তমানে এটি বাংলাদেশের জন্যও প্রাসঙ্গিক। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ফেক কনটেন্ট এবং ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহারের ঝুঁকি প্রবল। গ্রামীণফোনের মতে, দেশে প্রায় ১২ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছেন, যারা নির্বাচনের সময় বিভিন্ন ধরনের ফেক কনটেন্টের সম্মুখীন হতে পারেন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তিনটি প্রধান উপায়ে ডিপফেক বা ফেক কনটেন্ট ব্যবহার করা হতে পারে। প্রথমত, চরিত্র হনন, যেখানে কোনো প্রার্থীর চলাফেরা বা কর্মকাণ্ড নিয়ে এআই ব্যবহার করে মিথ্যা ভিডিও তৈরি করা হতে পারে, যা দেখাবে তিনি কোনো নিষিদ্ধ স্থানে গিয়েছেন বা খারাপ কাজ করেছেন। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতির অভিযোগ, যেখানে সংস্কারমূলক কাজের সময় প্রার্থীর কণ্ঠে নকল অডিও তৈরি করে প্রচার করা হতে পারে যে, তিনি অর্থ আত্মসাতের পরিকল্পনা করছেন। তৃতীয়ত, কেলেঙ্কারি সৃষ্টি, যেখানে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে অশ্লীল বা অপ্রীতিকর ভিডিও তৈরি করে তাদের সামাজিক মর্যাদা ধ্বংস করার চেষ্টা করা হতে পারে।
বর্তমান যুগে কনটেন্ট তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোনটি মানুষের লেখা আর কোনটি এআই দ্বারা তৈরি, তা শনাক্ত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তির হাত ধরেই আসছে সমাধান। কনটেন্ট শনাক্তকরণের এ সমস্যার সমাধানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার টেক্সট শনাক্তকারী টুলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ সরঞ্জামগুলো কিছু দিক থেকে ৯৯ শতাংশেরও বেশি নির্ভুলতার সঙ্গে এআই দ্বারা তৈরি কনটেন্ট খুঁজে বের করতে সক্ষম; এমনকি যখন সেটি মানুষের লেখার সঙ্গে খুব সতর্কভাবে মিশিয়ে দেওয়া হয়। প্রশ্ন জাগতে পারে, এ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার টেক্সট ডিটেক্টরগুলো আসলে কীভাবে কাজ করে? এটি মেশিন লার্নিং (এমএল) অ্যালগরিদম ব্যবহার করে, যা এআই এবং মানুষের লেখা টেক্সটের মধ্যে ভাষাগত ও পরিসংখ্যানগত প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে থাকে। এ শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার মূল বিষয়গুলো হলো ফ্রিকোয়েন্সি রেশিও, পার্টস অব স্পিচ, সিলেবল বা শব্দাংশের প্রবাহ এবং হাইফেনের ব্যবহার। এ টুলগুলো ফ্রিকোয়েন্সি রেশিওর মাধ্যমে বিশাল ডেটাসেটের সঙ্গে ইনপুট করা কনটেন্টের তুলনা করে এমন সব বাক্যাংশ খুঁজে বের করে, যা সাধারণত এআই লিখিত টেক্সটে বেশি দেখা যায়। পার্টস অব স্পিচ লেখার ব্যাকরণগত গঠন এবং সিনট্যাক্স বিশ্লেষণ করে এআইর মতো বা অন্য কোনো বিশেষ প্যাটার্ন আছে কিনা তা যাচাই করে। পুরো টেক্সটে সিলেবল বা শব্দাংশের ছন্দ এবং প্রবাহ পরীক্ষা করে। পরিশেষে এআই অনেক সময় যান্ত্রিকভাবে হাইফেন ব্যবহার করে, যা এ টুলগুলো সহজেই শনাক্ত করতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার টেক্সট ডিটেক্টরগুলো ‘এআই লজিক’ নামক একটি প্রযুক্তির মাধ্যমে টেক্সট কেন এআই-জেনারেটেড হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তার কারণ ব্যাখ্যা করে। ‘এআই ফ্রেজেস’ ডকুমেন্টের সেই অংশগুলোকে চিহ্নিত করে, যা পরিসংখ্যানগতভাবে মানুষের চেয়ে এআই উৎস থেকে আসার সম্ভাবনাই বেশি। এছাড়া, ‘এআই সোর্স ম্যাচে’র মাধ্যমে এটি শনাক্ত করে যে, টেক্সটের কোনো অংশ অন্য কোথাও প্রকাশিত হয়েছে কিনা, যে কোনো কনটেন্ট বা সোশ্যাল মিডিয়া টেক্সটের সত্যতা বা ইন্টিগ্রিটি বজায় রাখতে সাহায্য করে। এ টুলগুলো অনেক ভাষা সমর্থন করে। বিভিন্ন ভাষায় এর নির্ভুলতার হার অত্যন্ত চমৎকার। উদাহরণস্বরূপ, বেশকিছু প্রচলিত টুলসের মাধ্যমে ইংরেজিতে এআই দ্বারা লেখা শনাক্তকরণের নির্ভুলতা ৯৫ শতাংশেরও বেশি।
তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, শুধু টেক্সট বা লেখার মধ্যেই এ জালিয়াতি সীমাবদ্ধ নেই। এর বাইরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও ও অডিওর জগতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার একটি বিতর্কিত রূপ হলো ‘ডিপফেক’। ডিপফেক হলো একটি এআই দিয়ে তৈরি মিডিয়া ফাইল, যেমন একটি ছবি, ভিডিও বা অডিও রেকর্ডিং, যা দেখতে আসল বলে মনে হলেও আসলে এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি, যার কোনো সত্যতা নেই। ডিপফেকের কার্যপ্রণালিতে প্রধানত দুটি বিষয় দেখা যায়। প্রথমত, ভয়েস সংশ্লেষণ বা ভয়েস সিন্থেসিস, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের কণ্ঠস্বরের ছন্দ, স্বর, গতি ও বিরতির মতো বৈশিষ্ট্যগুলো বিশ্লেষণ করে হুবহু নকল করতে শেখে এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তির কণ্ঠস্বরে যে কোনো বক্তব্য তৈরি করতে পারে। দ্বিতীয়ত, ফেস সোয়াপিং বা মুখমণ্ডল পরিবর্তন। এ প্রযুক্তিতে একটি ভিডিও বা ছবিতে মানুষের মুখের বদলে অন্য একটি মুখের সমন্বয় ঘটিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়। ডিপফেক প্রযুক্তির প্রভাবে সমাজে এক ধরনের ‘হ্যালুসিনেশন’ তৈরি হয়, যেখানে মানুষ সত্য ও মিথ্যার তফাত করতে পারে না। এরিক এন্ডারসন নামের একজন বিজ্ঞানী বলেছেন, ডিপফেকের পেছনের মনোবিজ্ঞানের ধারণাটি হচ্ছে, ‘আমরা যা দেখি, আমাদের মন বা মস্তিষ্ক তা-ই বিশ্বাস করে বা বিশ্বাস করতে চায়।’