দীর্ঘসময়ের নীরবতা ভেঙে, রাজপথ আবার স্লোগানে মুখর। যেখানে প্রতিটি ব্যালট পেপার হতে যাচ্ছে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন ভোরের স্বপ্নবিজয় বর্ণ। গত বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হয়েছে। চলবে আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য এই মহাযজ্ঞে ৩০০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ১,৯৭৩ জন প্রার্থী। এবার দেশের মোট ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন ভোটারের হাতে ন্যস্ত হয়েছে, আগামীর নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার ভার। যার মধ্যে রয়েছেন ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ জন পুরুষ এবং ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন নারী ভোটার। বিশেষ করে প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ তরুণ ভোটার, যাদের একটি বড় অংশ জীবনের প্রথমবার কোনো অর্থবহ নির্বাচনে ভোট দিতে যাচ্ছেন, তারাই হতে পারেন এবারের ফলাফলের মূল কারিগর। এ ছাড়া আধুনিক নির্বাচনী ব্যবস্থার অংশ হিসেবে প্রায় ৩ লাখ প্র্রবাসী এবার পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। উৎসবমুখর আবহে দেশের রাজপথ স্লোগানে মুখর হলেও, সাধারণ মানুষের মনের গহিনে দানা বেঁধে আছে এক জোরালো প্রত্যাশা এবং টেকসই ও সুশৃঙ্খল গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ। ভোটাররা কেবল একজন প্রার্থীকে জয়ী করতে চান না, বরং চান এমন একটি নির্বাচনী পরিবেশ, যা দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটাবে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাজার সিন্ডিকেট এবং দুর্নীতির যাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষ মনে করছে, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে আসা জনবান্ধব সরকারই, বিভিন্ন সংকট থেকে মুক্তি দিতে পারে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর যে বিপুল আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে, তাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে এই নির্বাচনে জনগণের প্রকৃত মতামত প্রতিফলিত হওয়া অপরিহার্য। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক জল্পনা-কল্পনা, পর্দার আড়ালের ষড়যন্ত্র আর অসাংবিধানিক শক্তির হস্তক্ষেপ নিয়ে যে ধোঁয়াশা থাকে, তা চিরতরে বন্ধ হবে।
সুষ্ঠু নির্বাচনের এই অপরিহার্যতা কেবল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য নয়, বরং দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায়ী সমাজ ও উদ্যোক্তারা বর্তমানে এক ধরনের ‘অপেক্ষমাণ’ নীতি গ্রহণ করেছেন, যা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের প্রধান প্রধান চেম্বার ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মতে, একটি নির্বাচিত ও জবাবদিহিমূলক সরকার না থাকা পর্যন্ত বড় ধরনের বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সফল এবং একটি স্থিতিশীল সরকার গঠিত হলে, কল-কারখানার চাকা যেমন সচল হবে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে অমীমাংসিত বাণিজ্য চুক্তিগুলো নতুন গতি পাবে। বিশেষ করে, তৈরি পোশাক খাতের বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ওপর ভিত্তি করে দীর্ঘমেয়াদি অর্ডার দেওয়ার অপেক্ষায় আছেন। নির্বাচনী এই স্বচ্ছতা ব্যবসায়ীদের মনে নতুন সাহস জোগাবে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখবে। একইভাবে ব্যাংকিং খাত এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এই নির্বাচনের দিকে তীক্ষè নজর রাখছে। কারণ একটি শক্তিশালী ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সরকারই পারে, ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলা ও খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি কঠোর হাতে দমন করতে। গত কয়েক বছরের অস্থিরতায় ব্যাংকিং খাতে যে তারল্য সংকট এবং আস্থার অভাব তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে একটি নির্বাচিত সরকারের অধীনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য ভোটের মাধ্যমে জনসমর্থনপুষ্ট সরকার গঠিত হলে, তারা সাহসের সঙ্গে আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলোর দেওয়া কাঠামোগত সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবে। এতে সাধারণ আমানতকারীদের মনে যেমন আস্থা ফিরবে, তেমনি শেয়ারবাজারের দীর্ঘস্থায়ী মন্দা কাটিয়ে ওঠার পথ প্রশস্ত হবে। অর্থাৎ নির্বাচনী মাঠের উৎসব কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং এটি একটি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের উৎসবে রূপান্তরিত হওয়ার অপেক্ষায়।
উৎসবের এই রঙিন আবহের সমান্তরালে বয়ে চলেছে এক গভীর ও প্রচ্ছন্ন শঙ্কার স্রোত। দীর্ঘ অগণতান্ত্রিক শাসনের ক্ষত এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে অতীত অভিজ্ঞতা ভোটারদের মনে এক ধরনের ‘নির্বাচন ভীতি’ জাগিয়ে রেখেছে। ফলে মাঠপর্যায়ে বড় দলগুলোর মধ্যে, আদর্শিক সংঘাত এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তির আবির্ভাব নির্বাচনী পরিবেশকে কতটা স্থিতিশীল রাখবে, তা নিয়ে কিছুটা সংশয় রয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, নির্বাচনী সহিংসতা রোধে এবার প্রায় ৮ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে, যার মধ্যে বিজিবি, র্যাব এবং পুলিশের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তথ্য বলছে, এবার প্রতিটি কেন্দ্রে ভিডিও নজরদারি এবং তাৎক্ষণিক ফলাফল প্রকাশের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা জালিয়াতির সুযোগ কমিয়ে আনবে। এই প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা সাধারণ, মানুষের মনে সাহস জোগাচ্ছে এবং উৎসবের আমেজকে আরও গাঢ় করবে। অর্থনৈতিক প্রত্যাশার পাশাপাশি, গ্রামীণ অর্থনীতিতে নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে এক ধরনের সাময়িক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। পোস্টার ছাপানো, মাইকিং, যানবাহন ভাড়া এবং প্রচার কর্মীদের পারিশ্রমিক বাবদ কয়েক হাজার কোটি টাকার লেনদেন তৃণমূল পর্যায়ে অর্থপ্রবাহ বাড়িয়েছে। তবে এই উৎসবের ডামাডোলে সাধারণ মানুষের ভয় হলো, নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হবে কি না! ব্যবসায়ীদের একটি অংশ যেমন স্থিতিশীলতা চাচ্ছেন, তেমনি অন্য একটি ক্ষুদ্র অংশ অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে বাজার অস্থিতিশীল করার চেষ্টায় থাকে। একটি সুষ্ঠু ও ভীতিহীন নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক সমাধান নয়, বরং এটি বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার প্রথম শক্তিশালী পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছে সাধারণ মানুষ। অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে এবার প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় পরীক্ষা। ভোটার তালিকায় এবার ১,৬৩৭ জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন, যা সামাজিক স্বীকৃতির পথে একটি মাইলফলক। পাশাপাশি দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল ও উপকূলীয় হাওর এলাকার জন্য বিশেষ হেলিকপ্টার এবং নৌ-চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে কোনো ভোটারই ভোট দেওয়া থেকে বঞ্চিত না হন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর এই সক্রিয়তা নির্বাচনকে যেমন বৈচিত্র্যময় করছে, তেমনি উৎসবের রঙ ছড়িয়ে দিচ্ছে সমাজের একেবারে নিচতলায়। তবুও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী এবং দুর্গম অঞ্চলের মানুষগুলোর মনে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন অস্বস্তি রয়ে গেছে, যা দূর করা প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব। তরুণ প্রজন্মের জন্য এই নির্বাচন কেবল একটি রাজনৈতিক দলের পরিবর্তন নয়, বরং এটি তাদের ‘চব্বিশের চেতনা’ বা রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সুযোগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বেচ্ছাসেবক ও পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করছেন, যা রাজনীতির প্রতি নতুন প্রজন্মের ক্রমবর্ধমান আগ্রহকে ফুটিয়ে তুলছে। তরুণদের এই সক্রিয়তা ভোটারদের মনে এক নতুন সাহসের সঞ্চার করেছে, যা উৎসবের আবহকে আরও বেগবান করছে। তবে তরুণদের আবেগকে পুঁজি করে যাতে কোনো অপশক্তি অস্থিতিশীলতা তৈরি না করতে পারে, সেদিকে কড়া নজর রাখা হচ্ছে। নতুন ভোটারদের মতে, এবারের ভোট দেওয়া মানে কেবল প্রার্থী নির্বাচন নয়, বরং একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার চুক্তিতে স্বাক্ষর করা।