চট্টগ্রাম: উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি আর অবহেলার বাস্তবতা
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত হবেন ১৬ জন আইনপ্রণেতা।
এই নির্বাচন ঘিরে সারা দেশের মানুষের মতো চট্টগ্রামবাসীদেরও মনে কিছু প্রশ্ন, কিছু প্রত্যাশা বরাবরের মতো জেগে উঠেছে। প্রতিবার নির্বাচনে প্রতিশ্রুতির ফল্গুধারায় ভেসে যায় মানুষ। প্রতিবার আমরা স্বপ্ন দেখি; কিন্তু চিরকালের বঞ্চনা, কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন কোনোকালেই আর সমাধান হচ্ছে না।
দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী, প্রধান সমুদ্রবন্দর ও শিল্পাঞ্চল—এই চট্টগ্রামের গুরুত্ব কেবল মানচিত্রে নয়, অর্থনীতির রক্তপ্রবাহে। অথচ বাস্তবতা হলো এই শহর ও বৃহত্তর অঞ্চলের মানুষ বছরের পর বছর কিছু মৌলিক সমস্যার ভার বইছে। নির্বাচনের মুহূর্তে তাই চট্টগ্রামবাসীর প্রত্যাশা আবেগ নয়, এটি বাস্তব, জরুরি ও ন্যায্য। যাঁরা মানুষের কাছে ভোট চাইছেন, যাঁরা আগামী দিনে দেশের হাল ধরবেন, তাঁদের সামনে বহুবার উচ্চারিত চট্টগ্রামের কিছু মৌলিক চাহিদার কথা আবারও তুলে ধরছি।
চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা এখন আর মৌসুমি দুর্যোগ নয়, এটি একটি স্থায়ী নগর–সংকট। সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের প্রধান সড়ক, বাসাবাড়ি ও দোকানপাট ডুবে যায়। খাল দখল, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ, পাহাড় কাটা ও অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ—সব মিলিয়ে জলাবদ্ধতা চট্টগ্রামের অর্থনীতি ও স্বাভাবিক জীবনকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। এই সমস্যার সমাধান জরুরি। কারণ, একটি বন্দরনগরী যদি বর্ষায় অচল হয়ে পড়ে, তার প্রভাব পড়ে পুরো দেশের সরবরাহব্যবস্থায়।
চট্টগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে কর্ণফুলী নদীর কথা জড়িয়ে আছে মানুষের শরীরে প্রবাহিত রক্তধারার মতো। এই নদী শুধু পানি বয়ে আনে না—এটি বন্দর, বাণিজ্য, জনজীবন ও সভ্যতার ধারক। অথচ আজ সেই কর্ণফুলীই দূষণ, দখল আর অবহেলার ভারে জর্জরিত। মানুষ জানে, কর্ণফুলী বাঁচলে চট্টগ্রাম বাঁচবে, নদী মরলে ক্ষতিটা শুধু পরিবেশে সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা ছড়িয়ে পড়বে অর্থনীতি, যোগাযোগ আর জনস্বাস্থ্যে। অথচ এই নদী দেশের অন্যতম দূষিত নদীর তালিকায়। নগরীর আবাসিক বর্জ্য, শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, জাহাজ ও নৌযানের তেল—সব মিলিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার টন বর্জ্য এসে পড়ছে নদীতে।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো এই দূষণ নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকর সমন্বিত ব্যবস্থা এখনো দৃশ্যমান নয়। খালগুলো দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি ও ময়লা নদীতে গিয়েই পড়ে। ফলে নদীর নাব্যতা কমছে, জলজ প্রাণী হারিয়ে যাচ্ছে আর বন্দর কার্যক্রম দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকির মুখে পড়ছে। কর্ণফুলী দূষণের আরেকটি বড় দিক হলো নদী দখল। বছরের পর বছর প্রভাবশালী মহল নদীর জায়গা দখল করে স্থাপনা গড়েছে। উচ্ছেদের ঘোষণা আসে; কিন্তু বাস্তবায়িত হয় খণ্ডিতভাবে। নদী দখলমুক্ত না হলে দূষণ রোধ, নাব্যতা বৃদ্ধি কিংবা সৌন্দর্যবর্ধন—কোনোটিই টেকসই হবে না। এ জায়গাতেই চট্টগ্রামবাসী নির্বাচিত আইনপ্রণেতাদের কাছ থেকে স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান চায়—কর্ণফুলী বাঁচবে, নাকি কাগজের পরিকল্পনায় সীমাবদ্ধ থাকবে?
এই নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা কালুরঘাট সেতু যেন কর্ণফুলীর আরেকটি চিরদুঃখের গল্প। ১৯৩০ সালে রেলসেতু হিসেবে তৈরি এই কাঠামো আজ দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের জীবনরেখা। কৃষিপণ্য, শিল্পপণ্য, শিক্ষার্থী, রোগী—সবাই এই সেতুর ওপর নির্ভরশীল।
তবে বাস্তবতা হলো এটি একটি পুরোনো ও সীমিত সক্ষমতার সেতু। সাম্প্রতিক সংস্কার সাময়িক স্বস্তি দিলেও এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। ভারী যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা, একমুখী চাপ—সব মিলিয়ে সেতুটি প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়েই ব্যবহৃত হচ্ছে। নতুন কালুরঘাট সেতু বিলাসী প্রকল্প নয়, এটি অবকাঠামোগত জরুরি প্রয়োজন। এই সেতু হলে চট্টগ্রাম শহরের যানজট কমবে, আনোয়ারা-বোয়ালখালী-পটিয়া অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হবে, কক্সবাজার ও দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতি পাবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—একটি আধুনিক রেল ও সড়ক সেতু কর্ণফুলী নদীর ওপর চাপ কমিয়ে পরিকল্পিত নগর বিস্তারের সুযোগ তৈরি করবে।