আপাতদৃষ্টিতে ইরানের আকাশ থেকে সংকটের কালো মেঘ কেটে গেছে; আবারও টিকে গেছে খামেনি জামানা। বাইরে থেকে ডনাল্ড ট্রাম্পের তর্জন-গর্জন আর ভেতর থেকে নাগরিক বিক্ষোভের যে উত্তাল ঢেউ আছড়ে পড়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত কেবল শোরগোলেই শেষ হতে চলেছে বলে মনে হচ্ছে। তবে এই নিস্তরঙ্গতার গভীরে বয়ে চলেছে এক অবাধ্য স্রোত, যার অগ্রভাগে রয়েছেন ইরানের তেজস্বিনী নারীরা। পারস্যের এই অকুতোভয় কন্যারা বারবার খামেনি শাসনকে দাঁড় করিয়েছেন কাঠগড়ায়; কখনো রাজপথে কণ্ঠ ছেড়ে, কখনো বা বিশ্বমঞ্চে শান্তির নোবেল জয় করে। এবারও তারা শাসকের মসনদে কম্পন ধরিয়ে দিয়েছিলেন। প্রশ্ন জাগে, ক্ষমতার এই সুকঠিন প্রাচীরের সামনে দাঁড়িয়েও ইরানের এই 'অবাধ্য কন্যারা' কেন বারবার একাট্টা হন? কোন সে দহন, যা তাদের শৃঙ্খল ভাঙার মিছিলে শামিল করে?
এই বিষয়টি বোঝার জন্য একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে। খামেনি জামানার পূর্বে ছিল পাহলভি রাজবংশের শাসন। তার আগে ইরানে ১৭৮৯ থেকে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল তুর্কি বংশোদ্ভূত কাজার রাজবংশ। আগা মোহাম্মদ খান কাজার এটি প্রতিষ্ঠা করেন। আধুনিকীকরণের চেষ্টা, অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং ব্রিটিশ ও রুশ প্রভাবের কারণে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ যুগ ছিল, যা ১৯২৫ সালে রেজা খানের অভ্যুত্থান ও পাহলভি রাজবংশের উত্থানের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।
কাজার শাসনামলে নারীরা মূলত গৃহবন্দি জীবন কাটাতে বাধ্য হতেন, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে সীমিত সুযোগ পেতেন এবং পর্দা প্রথা ছিল কঠোর। তবে পাহলভি আমলে (১৯২৫-১৯৭৯) পাশ্চাত্য-প্রভাবিত আধুনিকীকরণ ও স্বাধীনতার ফলে নারীরা শিক্ষা ও পেশাগত জীবনে ব্যাপক অগ্রগতি লাভ করেন, যা ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর আবার পরিবর্তিত হয়।
১৯৭৯ সালের বিপ্লবে বাম, ডান, নারী, পুরুষ—সকল পক্ষের সমর্থন ও অংশগ্রহণ থাকলেও পটপরিবর্তনের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সবকিছু কট্টরপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে বামপন্থী আর নারীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েন।
ইরানের নারীদের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরার জন্য এ পর্যায়ে মাশা আমিনি নামের এক তরুণীর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিক্ষোভের কথা সামনে নিয়ে আসতে চাই। মাশা আমিনি, যিনি জিনা আমিনি নামেও পরিচিত, তেহরানের একটি হাসপাতালে সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ২২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তার ‘অপরাধ’ ছিল—তিনি সরকারি মানদণ্ড অনুযায়ী হিজাব পরেননি। টহলকারী ‘মোরাল পুলিশ’ বা ধর্মীয় পুলিশ এই অপরাধে তাকে গ্রেপ্তার করার পর পুলিশি হেফাজতেই তার মৃত্যু ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী অন্যান্য নারী বন্দিদের বয়ান অনুযায়ী, পুলিশি নির্যাতনে মাশার মৃত্যু হয়েছিল। উল্লেখ্য, মাশা তার মা-বাবা এবং ভাইয়ের সঙ্গে তেহরানের বাইরের শহর সাক্কেজ থেকে বেড়াতে এসেছিলেন। পরিবারের মাঝ থেকেই পুলিশ তাকে কবজায় নিয়ে গিয়েছিল।
মাশা আমিনির মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা পরেই প্রতিবাদ শুরু হয়। এই প্রতিবাদের সূচনা হাসপাতাল থেকেই। দ্রুত তা দেশের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে মাশার নিজ শহর সাক্কেজ ও কুর্দিস্তান প্রদেশের অন্যান্য শহর—যার মধ্যে সানন্দাজ, দিভান্দারেহ, বানেহ ও বিজার উল্লেখযোগ্য। এই আন্দোলন দমাতে খামেনি কর্তৃপক্ষ সরকারপন্থীদের রাস্তায় নামিয়েছিল এবং ইন্টারনেটের লাগাম টেনে ধরেছিল। শেষতক সরকার আন্দোলন দমাতে সক্ষম হয়।
সেই ঘটনার জের এখনো রয়ে গেছে ইরানের নারীদের মনে। গত বছর সেই রেশ কাটতে না কাটতেই খামেনির উপদেষ্টা আলি শামখানির মেয়ের বিয়েতে তার পরিবারের নারী সদস্যদের পশ্চিমা খোলামেলা পোশাকের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। শাসনযন্ত্রের শীর্ষে বসে থাকা একজন উপদেষ্টার পরিবারের এমন দ্বিচারী অবস্থান ইরানের নারীদের ক্ষেপিয়ে তোলে। অবাক হন ইরানের ভেতরের ও বাইরের সচেতন মহলও। এমন ফিসফিসানির মধ্যে নার্গিস মোহাম্মদীর বিষয়টি আবার সামনে চলে আসে।
শান্তিতে নোবেলজয়ী মানবাধিকারকর্মী নার্গিস মোহাম্মদীকে গত মাসে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় তাকে মারধরের অভিযোগও রয়েছে। নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকার জন্য ২০২৩ সালে তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়। তিনি ইরানের 'ডিফেন্ডার্স অব হিউম্যান রাইটস সেন্টার'-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট। একই প্রতিষ্ঠানে তার পূর্বসূরি শিরিন এবাদীও ২০০৩ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন।