ম্যান্ডেলা বিধিমালা ও সমঅধিকারের লড়াই

জাগো নিউজ ২৪ ড. মতিউর রহমান প্রকাশিত: ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৫৩

একটি রাষ্ট্রের সভ্যতার প্রকৃত মানদণ্ড নির্ধারিত হয় সেই রাষ্ট্রের কারাগারগুলোর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে। আধুনিক বিচারব্যবস্থায় কারাগারকে কেবল অপরাধের দণ্ড প্রদানের স্থান হিসেবে দেখা হয় না, বরং একে একজন ব্যক্তিকে অপরাধের পথ থেকে ফিরিয়ে এনে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে পুনর্বাসিত করার একটি সংশোধনাগার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মানুষের চলাচলের স্বাধীনতা আইনগত কারণে হরণ করা হলেও তার মৌলিক মানবিক অধিকারগুলো হরণ করার অধিকার রাষ্ট্র বা কোনো কর্তৃপক্ষের নেই। এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ‘নেলসন ম্যান্ডেলা বিধিমালা’ গ্রহণ করে, যা আনুষ্ঠানিকভাবে বন্দিদের সাথে আচরণের জন্য জাতিসংঘের ন্যূনতম মানদণ্ড হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত।


দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী মহান নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার সম্মানে এই নামকরণ করা হয়েছে, যিনি দীর্ঘ সাতাশ বছর কারারুদ্ধ থেকে অনুধাবন করেছিলেন যে, কারাগারের দেয়াল ও পরিবেশ একজন মানুষের আত্মাকে কীভাবে বিকৃত করতে পারে। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির চরিত্র বুঝতে হলে তার উচ্চবিত্ত নাগরিকদের প্রতি আচরণ নয়, বরং তার কয়েদিদের প্রতি আচরণ পরীক্ষা করা উচিত। অথচ বাংলাদেশের প্রধান কারাগারগুলোর বর্তমান চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই আন্তর্জাতিক মানবিক মানদণ্ড ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে এক বিশাল ব্যবধান বিদ্যমান। বিশেষ করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের মতো স্পর্শকাতর স্থানে অব্যবস্থাপনা ও বৈষম্যের যে চিত্র গণমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়, তা একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজের জন্য চরম উদ্বেগের কারণ।


নেলসন ম্যান্ডেলা বিধিমালার মূল ভিত্তি হলো মানবিকতা ও মর্যাদা। এই নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ, ভাষা বা রাজনৈতিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে বন্দিদের মধ্যে কোনো প্রকার তফাত করা যাবে না। প্রতিটি বন্দি সমমানের স্বাস্থ্যসেবা, পর্যাপ্ত পুষ্টি এবং শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের অধিকার রাখেন। কিন্তু বাস্তব প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, প্রভাব ও অর্থের জোরে কারাগারের অভ্যন্তরে এক ধরনের কৃত্রিম শ্রেণিবিভাগ তৈরি করা হয়। বিত্তবান ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী বন্দিরা কারাগারের ভেতরে এমন সব সুবিধা ভোগ করেন যা সাধারণ বন্দিদের জন্য অকল্পনীয়।


কারাবিধি লঙ্ঘন করে প্রভাবশালীদের জন্য বিশেষ আবাসন ও উন্নতমানের খাবারের ব্যবস্থা করার যে প্রবণতা, তা মূলত আইনি সমতার ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করে। যখন কারাগারের ভেতরে অর্থের বিনিময়ে নিয়ম ভেঙে সুযোগ-সুবিধা কেনা যায়, তখন সেটি আর সংশোধনাগার থাকে না, বরং দুর্নীতির একটি কেন্দ্রে পরিণত হয়। জেল কোড উপেক্ষা করে বিশেষ ব্যক্তিদের জন্য আত্মীয়-স্বজনের সাথে দীর্ঘ সময় কাটানোর সুযোগ দেওয়া কিংবা বাইরের রান্না করা খাবার অননুমোদিতভাবে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার মাধ্যমে একদল বন্দী যেমন বিশেষ সুবিধা পান, সাধারণ বন্দিরা তেমনি বঞ্চিত হন তাদের প্রাপ্য ন্যূনতম অধিকার থেকে। এই দ্বিমুখী ব্যবস্থা বন্দিদের মধ্যে ক্ষোভ এবং বৈষম্যের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে, যা সংশোধনের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।


কারাগারের অব্যবস্থাপনার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার মান। ম্যান্ডেলা বিধিমালা অনুযায়ী বন্দিদের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা এবং মানসিক সহায়তা প্রদান করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। আন্তর্জাতিক এই মানদণ্ড অনুসারে বন্দিরা সাধারণ জনগণের মতো একই মানের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকারী। অথচ অভিযোগ রয়েছে যে, কারাগারের মেডিক্যাল অফিসাররা সাধারণ বন্দিদের সাথে চরম উদাসীন আচরণ করেন। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা সাধারণ রোগীদের সঠিক রোগ নির্ণয়ে মনোযোগ দেন না এবং তাদের প্রতি সংবেদনশীলতা দেখান না।


বিশেষ রাজনৈতিক প্রভাব বা আর্থিক সামর্থ্যের কারণে চিকিৎসার সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে যে বিভাজন তৈরি হয়, তা বন্দিদের জীবনের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। যেখানে সাধারণ বন্দিরা প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন, সেখানে প্রভাবশালীরা সামান্য অসুস্থতার অজুহাতে উন্নত হাসপাতালে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করার সুযোগ পান। এই ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে পুষ্ট করে। একটি আধুনিক রাষ্ট্রে চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকার রাজনৈতিক বা আর্থিক মানদণ্ডে নির্ধারিত হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।


সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

এই সম্পর্কিত

আরও