বস্তুকে না মেনে বদলানো চাই
সভ্যতার ইতিহাস তো আসলে অসন্তোষেরই ইতিহাস। সন্তোষ দেখা দিলে সভ্যতা এগোত না। কিন্তু ওই অসন্তোষটা শুধু ব্যক্তিগত তো নয়ই, প্রধানতও ব্যক্তিগত নয়; হয়ে পড়েছে সমষ্টিগত এবং যখন সে সমষ্টিগত হয়েছে, তখনই ঘটেছে উত্তরণ, তার আগে নয়। সমষ্টির আঘাতে এবং সমষ্টির স্বার্থেই পুরোনো ব্যবস্থাটা ভেঙে পড়েছে।
আমার বয়স যত বেড়েছে, অসন্তোষও বেড়েছে সেই পরিমাণেই। নিজের অসন্তুষ্টিকে আমি মেলাতে চেষ্টা করেছি সবার অসন্তোষের সঙ্গে। চূড়ান্ত বিচারে আমার লেখালেখির পেছনের তাড়নাটা রয়েছে ওইখানেই। বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে তাল রেখে ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো চোখের সামনে ক্রমাগত পরিষ্কার হয়ে এসেছে। বাইরের চোখের শক্তি কমেছে, ভেতরের চোখের শক্তি বেড়েছে।
ব্যবস্থাটা যে পুঁজিবাদী, আমার সেটা বোঝা হয়ে গেছে প্রায় শুরুতেই। তবে ভালোভাবে বোঝার ব্যাপারে অসুবিধা ছিল। পুঁজিবাদ নিজেকে নানাভাবে অস্পষ্ট করে রাখে। আর তাকে চিনবার জন্য যে সাহায্য এবং যে অনুশীলন দরকার ছিল, সেটা মোটেই সহজলভ্য ছিল না। রাষ্ট্র তো বটেই, সমাজও দীক্ষিত ছিল পুঁজিবাদেই। সাতচল্লিশে দেশ যখন তথাকথিত রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পেল, তখন আওয়াজ উঠেছিল সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের। আমরা শুনতাম পূর্ববঙ্গের সাহিত্য কেমন করে পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য থেকে স্বতন্ত্র করা যায়, সেই চেষ্টার কথা। দৃষ্টান্ত দেওয়া হতো আমেরিকান সাহিত্যের; বলা হতো, সে সাহিত্যে ইংরেজি সাহিত্যের মূলধারা থেকে কীভাবে এবং কী কারণে আলাদা হলো, সেটা দেখতে হবে এবং দেখে নিয়ে পূর্ববঙ্গের সাহিত্যে স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করার চেষ্টা করা চাই। আমেরিকা ও ইংল্যান্ডের মাঝখানে আটলান্টিক নামের একটা সমুদ্র আছে বললে জবাবে বলা হতো, তাহলে আইরিশ সাহিত্য দেখো, আয়ারল্যান্ড তো গা-ঘেঁষেই রয়েছে ইংল্যান্ডের, কিন্তু সাহিত্য তো আলাদা। জাতীয়তাবাদের বিষয়টা তুলে ধরা হতো। যে জাতীয়তাবাদ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছিল, সংগতভাবেই তার নাম দেওয়া হয়েছিল পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ।
স্বাতন্ত্র্যটা আসবে এই জাতীয়তাবাদের কারণেই, চিন্তাটা ছিল এই রকমের। এর বিপরীত ধারায় যাঁরা সাহিত্যের চর্চা করতেন, তাঁরা ছিলেন উদারনীতিক। তাঁরা গোটা বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে সাহিত্যচর্চা করবেন মনস্থ করেছিলেন।
পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে এঁদের বিস্তর পার্থক্য। এঁরা ছিলেন আধুনিক। কিন্তু অন্তরে ঐক্য ছিল ওই দুই ধারার ভেতরে। উভয় ধারাই ছিল পুঁজিবাদে বিশ্বাসী।
পুঁজিবাদের সমালোচনা দুই ধারা থেকেই পাওয়া যেত। কিন্তু সমালোচনার সুর ও স্বর—দুটোই ছিল মৃদু। উভয় পক্ষই পুঁজিবাদকে মেনে নিয়েছিল, মেনে নিয়েই সংস্কার চাইত। বিকল্প ব্যবস্থার কথা কোনো পক্ষই বলত না, ভাবতেও চাইত না। অথবা যেটা ভাবত, সেটা পুঁজিবাদকে নিয়েই। যেমন জাতীয়তাবাদীরা কেউ কেউ বলতেন, ইসলামি সমাজতন্ত্র চাই; তাঁদের সেই সমাজতন্ত্রে ব্যক্তিগত সম্পত্তির উচ্ছেদের কল্পনা স্থান পেত না, ব্যক্তিমালিকানা ঠিক রেখেই তাঁরা সমাজতন্ত্র চাইতেন। ব্যক্তিগতভাবে উদারনীতিকেরা ব্যক্তিমালিকানার সমস্যা দ্বারা পীড়িত ছিলেন, জীবিকা ও আবাসনের সুবন্দোবস্ত করাটা সহজ ব্যাপার ছিল না। অনিশ্চয়তা ছিল অর্থনৈতিক জীবনে, কিন্তু তাই বলে তাঁরা যে সমাজতন্ত্রের পক্ষে ছিলেন তা নয়, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভেতরে থেকে তাঁরা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের জন্য আশা ব্যক্ত করতেন। ছাত্রজীবনে দেখেছি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভেতর সমাজতন্ত্রের পক্ষে বলার মতো প্রায় কেউই ছিলেন না। ছাত্র মহলে ও আন্দোলনে বরং সমাজতন্ত্রের চিন্তাটা ছিল। কিন্তু ছাত্র আন্দোলন রাষ্ট্রীয় আক্রোশের কবলে পড়ে গিয়েছিল, যতটুকু প্রবহমান ছিল, তা-ও বেগবান হওয়ার সুযোগ পেত না। সমাজতন্ত্রের পক্ষে রাজনৈতিক কর্মী যাঁরা ছিলেন, রাষ্ট্র তাঁদেরকে কমিউনিস্ট বলত এবং অত্যন্ত তৎপর থাকত যত দ্রুত পারা যায় তাঁদেরকে কারারুদ্ধ করতে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- জাতীয়তাবাদ
- পুঁজিবাদ