অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ কী, কেন এর তালিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশ সরকার ৮ জানুয়ারি ২০২৬ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের একটি হালনাগাদ তালিকা অনুমোদন দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ তালিকায় নতুন কিছু ওষুধ সংযোজন করে মোট ২৯৫টি ওষুধ চূড়ান্ত করা হয়েছে।
উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্ত হলো, এ তালিকার সকল ওষুধ সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে বিক্রি করতে হবে। এ ঘোষণার ফলে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ কী, এ তালিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ, সরকার কেন দাম বেঁধে দিতে চাইছে এবং এর ফলে জনস্বাস্থ্য কীভাবে লাভবান হবে তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ কী?
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ হলো সেসব ওষুধ, যা জনগণের অগ্রাধিকারভিত্তিক স্বাস্থ্য চাহিদা কার্যকর ও নিরাপদভাবে পূরণ করে। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় নিরাপদ ও সাশ্রয়ী ওষুধগুলো স্থান পায় এবং অপ্রয়োজনীয় ওষুধগুলো বাদ দেওয়া হয়। এগুলো নির্বাচন করা হয় কোন ওষুধের জনস্বাস্থ্যগত গুরুত্ব, তার কার্যকারিতার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, মূল্য, ক্রয়ক্ষমতা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় বিবেচনায় রেখে।
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা তৈরির ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৯৭০-এর দশকে বিশ্বজুড়ে ওষুধ বাজার ছিল প্রায় পুরোপুরি বাণিজ্য নির্ভর। দরিদ্র দেশগুলোয় অপ্রয়োজনীয়, অনুপযোগী ও উচ্চমূল্যের ওষুধে বাজার ভরে গিয়েছিল, অথচ সাধারণ রোগের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক ওষুধ তৈরিতে ওষুধ কোম্পানিগুলোর অনাগ্রহ ছিল।
বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ১৯৭৭ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সর্বপ্রথম অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের একটি আদর্শ তালিকা (The WHO Model Lists of Essential Medicines) প্রকাশ করে যাতে বিভিন্ন রোগের ২০০টি জেনেরিকের ওষুধ স্থান পায়। ১৯৭৭ সাল থেকে সংস্থাটি প্রতি দুই বছর পরপর অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের একটি হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ করে।
বছরের পর বছর ধরে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি ও রোগের বিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বিস্তৃত ও জটিল হয়েছে। ২০২৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের ২৪তম তালিকা প্রকাশ করেছে এবং এতে বিভিন্ন রোগের ৫২৩টি ওষুধ স্থান পেয়েছে।
উপরে উল্লেখিত তালিকার পাশাপাশি সংস্থাটি ২০০৭ সাল থেকে প্রতি দুই বছর পরপর শিশুদের জন্য পৃথক আরেকটি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা (Essential Medicines List for Children) প্রকাশ করে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত শিশুদের জন্য তালিকার ১০ম ভার্সনে মোট ৩৭৪টি ওষুধ স্থান পেয়েছে।
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বর্তমানে ১৫০টিরও বেশি দেশ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মডেল তালিকা অনুসরণ করে নিজস্ব জাতীয় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা গ্রহণ করেছে। এই তালিকাগুলো সরকারি খাতে ওষুধ ক্রয় ও সরবরাহ, বীমা ও ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা, ওষুধ অনুদান এবং স্থানীয় ওষুধ উৎপাদনের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা থাকলে অ-অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তুলনায় এসব ওষুধের প্রাপ্যতা বেশি হয়, জনগণের নিকট প্রাপ্যতা বাড়ে এবং প্রেসক্রিপশন ও চিকিৎসার মান উন্নত হয় এবং ব্যয় কমে।
বাংলাদেশে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকার বিবর্তন
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে বাজারে অপ্রয়োজনীয়, ডুপ্লিকেট ও অকার্যকর ওষুধের আধিক্য ছিল কিন্তু জীবনরক্ষাকারী মৌলিক ওষুধের ঘাটতি ছিল। বহুজাতিক কোম্পানির ছিল একচেটিয়া আধিপত্য এবং মানহীন ওষুধে বাজার ছেয়ে গেছে।
এরপর ১৯৮২ সাল বাংলাদেশের ওষুধ নীতির ইতিহাসে একটি মাইলফলক রচিত হয়। সে বছর সরকার জাতীয় ওষুধ নীতি ১৯৮২ এবং একই বছরে ড্রাগ কন্ট্রোল অর্ডিন্যান্স ১৯৮২ প্রণয়ন করে। ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধ নীতিতে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের ধারণা দেওয়া হয়, অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর ওষুধ নিষিদ্ধ করা হয়, জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনে উৎসাহ দেওয়া হয়, ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় এবং এর ফলে দেশীয় শিল্পের বিকাশ উৎসাহিত হয়।
এই নীতির অংশ হিসেবে প্রথমবারের মতো একটি জাতীয় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণীত হয়। বহু অপ্রয়োজনীয় ওষুধ বাজার থেকে প্রত্যাহার করা হয় এবং মৌলিক ওষুধের উৎপাদন ও সরবরাহ রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারে আসে। অত্যাবশ্যকীয় তালিকাকে কেন্দ্র করে সরকারি ক্রয় ও সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মৌলিক ওষুধ সরবরাহ বিস্তৃত হয়। এরপর এ তালিকা একাধিকবার পর্যালোচিত ও আংশিক হালনাগাদ হয়।
১৯৮২ সালের পর ২০০৫ সালে ‘জাতীয় ওষুধ নীতি ২০০৫’ প্রণয়ন করা হয়, কিন্তু সেখানে কোনো অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা দেওয়া হয়নি। এর তিন বছর পর তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৮ সালে ২০৯টি ওষুধের তালিকা সম্বলিত একটি পূর্ণাঙ্গ ‘জাতীয় অত্যাবশ্যকীয়/নির্দেশিত ওষুধের তালিকা’ প্রকাশ করে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- ওষুধ
- মূল্য নির্ধারণ