অ্যালগরিদমের ‘ফাঁদ’
আমাদের বর্তমান আধুনিক যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো তাদের অ্যাপ্লিকেশনের পেছনে বিভিন্ন ধরনের অ্যালগরিদম ব্যবহার করে থাকে। এ অ্যালগরিদমগুলো অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে যে কোনো ব্যবহারকারীর আচরণ, পছন্দ, আগ্রহ এবং নানাবিধ অনুভূতি বা চিন্তার বিশ্লেষণ করে। যা হোক, এসব ইন্টেলিজেন্ট অ্যালগরিদমকে ইদানীং আমাদের সমাজের সব অবক্ষয়, সহিংসতা আর বিভাজনের মূল হোতা হিসাবে দাঁড় করানো হচ্ছে। ১৩ জানুয়ারি বাংলাদেশের একটি পত্রিকায় (যুগান্তর) প্রকাশিত ‘অপরাধ-মানসিকতা তৈরির ভয়ংকর ফাঁদ ‘অ্যালগরিদম’ প্রবন্ধে বলা হচ্ছে, এ ‘অদৃশ্য প্রযুক্তি’ আমাদের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে, ফলে আমাদের সমাজে অনলাইনে অপরাধপ্রবণতা বেড়ে চলছে। প্রবন্ধটি একটি কোয়ালিটেটিভ গবেষণার ফলাফল হিসাবে প্রতীয়মান হলেও এ অভিযোগের আঙুল তোলার আগে আমাদের একবার এর ভেতরের অন্তর্নিহিত ব্যাপারগুলো নিয়ে ভাবা উচিত। অ্যালগরিদম কি সত্যিই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে, নাকি আমরা যেসব কনটেন্ট গোগ্রাসে গ্রহণ করছি, সেগুলোকেই আমাদের সামনে বারবার পরিবেশন করছে?
মূলত, সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যালগরিদমগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি। এটি একটি শক্তিশালী কনটেন্ট ‘বিবর্ধক’ (Amplifier) মাত্র। আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, ফেসবুক, ইউটিউব বা টিকটকের ‘নিউজ ফিড’ বা ‘ফর ইউ’ পেজ সবার জন্য এক নয়। আমার মোবাইলের স্ক্রিনে যা ভেসে উঠছে, তা আপনার স্ক্রিন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এ পার্থক্যটা তৈরি হয় আমাদেরই আচরণের ওপর ভিত্তি করে। অ্যালগরিদম এবং এআই আমাদের প্রতিটি ক্লিক, স্ক্রল, ওয়াচ-টাইম এবং শেয়ার করার প্রবণতা প্রতিনিয়ত বিশ্লেষণ করে থাকে।
যুক্তিটি খুবই সরল, আমি যদি সহিংসতা, মারামারি বা বিদ্বেষপূর্ণ কনটেন্টে বেশি সময় ব্যয় করি, তবে অ্যালগরিদম ধরে নেবে, এটাই আমার আগ্রহের জায়গা। তখন সে আমাকে আরও বেশি সহিংস কনটেন্ট দেখাবে। কারণ, তার মূল উদ্দেশ্য আমাকে অ্যাপটিতে বেশিক্ষণ ধরে রাখা। পক্ষান্তরে, আমি যদি সমাজসেবা, ধর্মীয় আলোচনা কিংবা শিক্ষামূলক কনটেন্টে সময় দেই, তাহলে অ্যালগরিদম আমাকে সেই জগতের সঙ্গেই যুক্ত রাখবে। অ্যালগরিদমকে একটি ‘মনস্তাত্ত্বিক আয়না’ বলা যেতে পারে। আয়নার সামনে দাঁড়ালে যেমন নিজের প্রতিবিম্ব দেখা যায়, সোশ্যাল মিডিয়াও আমাদের সামষ্টিক ও ব্যক্তিগত চরিত্রের প্রতিবিম্ব দেখায়। যদি এমন হতো, একজন ব্যবহারকারী নিয়মিত জনহিতকর কাজ, পজিটিভ কনটেন্ট বা ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বিষয়াদি খুঁজছেন, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া জোর করে তাকে রক্তপাত বা উসকানিমূলক ভিডিও দেখাচ্ছে, একমাত্র তখনই আমরা অ্যালগরিদমকে ‘অপরাধী’ বা ‘ফাঁদ’ বলতে পারতাম। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অ্যালগরিদম আমাদের জোর করে কিছু পরিবেশন করে না; বরং আমরা যা দেখতে চাই, সেটার জোগান বাড়ায় মাত্র।
একজন মানুষ যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রল, গুজব বা বিদ্বেষপূর্ণ ভিডিওতে ‘হা-হা’ রিয়েক্ট দেন কিংবা কমেন্টে তর্কে লিপ্ত হন, তখন তিনি অজান্তেই অ্যালগরিদমকে সিগন্যাল দেন, ‘আমি এটাই চাই’। ফলস্বরূপ, অ্যালগরিদমের প্রযুক্তিগুলো তার সামনে তথাকথিত ‘ইকো-চেম্বার’ তৈরি করে।
বলা হয়ে থাকে, যদি আমরা অনলাইনে সহিংসতার খবর দেখে উত্তেজিত হই, মব জাস্টিসে অংশ নেই বা গুজবে কান দেই, তবে সেই ব্যর্থতা আমাদের বিচারবোধের, শিক্ষার এবং মূল্যবোধের। এখানে আমি জোরালোভাবে বলতে চাই, অ্যালগরিদমগুলো হচ্ছে কেবল একটি বা সমষ্টিগত প্রযুক্তির মাধ্যম। বন্দুক যেমন নিজে মানুষকে মেরে ফেলতে পারে না, ট্রিগার চাপতে হয় মানুষকেই; তেমনি অ্যালগরিদম নিজে সহিংসতা ছড়ায় না, আমরাই একে ভাইরাল করি সহিংসতা ছড়ানোর উত্তেজনা তৈরি করার জন্য।
প্রযুক্তির এ যুগে অ্যালগরিদমকে কেবল ভয়ের চোখে না দেখে এর অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা এবং ইতিবাচক দিকগুলো অনুধাবন করা সময়ের দাবি। কেন অ্যালগরিদম আমাদের জন্য আশীর্বাদ, তা বুঝতে হলে বর্তমান বিশ্বের তথ্যের প্রবাহ বা ‘বিগ ডেটা’র দিকে তাকাতে হবে। পৃথিবী এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে বিগ ডেটার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা মানুষের একার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
এখন ডাটা ব্যাংকগুলো এমন ‘ইন্টেলিজেন্ট টেকনোলজি’র ওপর ভিত্তি করে তৈরি হচ্ছে, যেখানে আলাদা করে প্রথাগত ডাটা স্টোরেজের প্রয়োজন হয় না। বরং অনলাইনের বিভিন্ন ইউআরএল, হ্যাশট্যাগ বা সোর্স থেকে ডাটা পড়ে ডাইনামিক ওয়েতে বা গতিশীলভাবে আপনার প্রয়োজনীয় তথ্যটি আপনার সামনে হাজির করা হয়। ইন্টারনেটের সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে প্রতিনিয়ত মিলিয়ন-বিলিয়ন ব্যবহারকারী অগণিত ডেটা তৈরি করছেন, যা সামলানোর জন্য এআই অ্যালগরিদম অপরিহার্য।
অনেকে অভিযোগ করেন, অ্যালগরিদম মানুষের অনলাইন অ্যাকটিভিটি মনিটর করে এবং তাদের পছন্দ বা ‘প্রেফারেন্স’ আগে থেকেই জেনে যায়। কিন্তু গভীরভাবে ভাবলে দেখা যায়, এটি কোনো দোষ নয়, বরং এটি একটি সঠিক সেবাদানের পূর্বশর্ত। ফেসবুক বা ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো মিলিয়ন-বিলিয়ন কনটেন্ট থেকে শর্টিং বা বাছাই করে ব্যবহারকারীর সামনে সেই কনটেন্টটিই নিয়ে আসে, যা তার প্রয়োজন বা পছন্দের সঙ্গে সব সময়ই সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে থাকে। এটি মানুষের সময় বাঁচায় এবং সার্চিংয়ের অভিজ্ঞতাকে আনন্দদায়ক করে তোলে। অ্যালগরিদমগুলো মূলত আপনার নিজস্ব অনুভূতি, আচরণ এবং চিন্তা-চেতনার সঙ্গে ম্যাচিং করে প্রতিনিয়ত কনটেন্ট প্রপোজ করে, একে নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই, বরং এটি একটি সোশ্যাল মিডিয়ায় সুপারিশ ব্যবস্থার অংশ।