শিক্ষক হেনস্তা কি শিবিরের পাঁচ-'সু'তে জয়লাভের খেসারত?
এবার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সব ‘সু’-তে নির্বাচনও নাকি খুবই ‘সুন্দরভাবে’ সম্পন্ন হয়েছে। ডাকসু, জাকসু, চাকসু, রাকসু আর জকসু—সবখানেই জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের একচেটিয়া জয় পেয়েছে। ভোটের ফলাফল দেখে বিদগ্ধ পণ্ডিতেরা নানাবিধ বিশ্লেষণ হাজির করেছেন; তাদের মতে—পুরানো রাজনৈতিক পচনে অতিষ্ঠ হয়ে ছাত্ররা নাকি এবার অতি ‘সুবোধ’ ও ‘ভদ্র’ ছেলেদেরকেই নেতা নির্বাচিত করেছেন। কিন্তু এই ‘সুবোধ’ ছাত্রনেতারা যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ‘পরিচালনা’র গুরুভার নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছেন এবং যে হারে শিক্ষকদের হেনস্তা করতে শুরু করেছেন, তাতে স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগবে—এই সুবোধেরা কেন এত উগ্র হয়ে উঠেছেন?
২.
শিক্ষক হেনস্তার এই মহোৎসব চলছেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হেনস্তা হওয়াটা যেন এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কোনটা যে সর্বশেষ, তার হিসাব রাখা কঠিন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদ রোমানকে হেনস্তার পর রীতিমতো 'বীরত্বের' সঙ্গে টেনে-হিঁচড়ে প্রক্টর অফিসে নিয়ে গেলেন চাকসু নেতারা। অপরাধ? তিনি আওয়ামী ও বামপন্থী শিক্ষকদের সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। সেই অপরাধের 'শাস্তি' হিসেবে ছাত্রনেতারা তাকে টানা ৯ ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রেখে নিজেদের ক্ষমতার চরম মহড়া প্রদর্শন করলেন।
এর আগের খবরে প্রকাশ পেয়েছে, সালাহউদ্দিন আম্মার—যিনি এখন রাকসুর সাধারণ সম্পাদক, তিনি আওয়ামী লীগ আমলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছয়জন ডিনের পদত্যাগপত্র নিজ হাতে লিখে তাদেরকে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের নির্দলীয় প্রতিষ্ঠান 'শিক্ষক নেটওয়ার্ক' অবিলম্বে শিক্ষকদের প্রতি একটা বিশেষ ছাত্র প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের আগ্রাসী ভূমিকার নিন্দা জানিয়েছে। শিক্ষকেরা বিবৃতিতে বলেন, এইসব উগ্রপন্থী ছাত্রনেতারা হুমকি দিয়েছে যে, লীগপন্থী শিক্ষকরা ক্যাম্পেসে ঢুকলে কলার ধরে টেনে এনে প্রশাসন ভবনের সামনে বেঁধে রাখা হবে। শিক্ষক নেটওয়ার্ক সালাহউদ্দিন আম্মারসহ ছাত্রপ্রতিনিধিদের এখতিয়ারবহির্ভূত তৎপরতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।
এর আগে সংবাদ বের হয়েছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দীনকে হেনস্তা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সমাজসেবা সম্পাদক যুবাইর বিন নেছারী (এ বি জুবায়ের)। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবনে ওই শিক্ষককে হেনস্তা করেন তিনি।
এমনি অনেক ঘটনা উঠে আসছে আজকাল পত্রিকার পাতায়। কিছুদিন আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক পদোন্নতির সাক্ষাৎকার দিতে এসে উপাচার্যের সামনেই ছাত্রদের হেনস্তার শিকার হয়েছেন। কলেজ, স্কুলের শিক্ষকদেরকেও নানা অজুহাতে আজকাল নাজেহাল করা হচ্ছে। শিক্ষকদের হেনস্তা ও অপদস্থ করা একটা গর্হিত কাজ—কিন্তু কেন এমন হচ্ছে?
৩.
আমাদের দেশে এখন শিক্ষা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সব রাজনীতিতে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনীতি সবসময় ছিল; আগেও ছাত্ররা রাজনীতি করতেন এবং শিক্ষকেরাও। তবে ছাত্র-শিক্ষক যার যার রাজনীতির পরিসর ছিল ভিন্ন। অনেকের মধ্যেই মত ও আদর্শের পার্থক্য থাকলেও একটা সমীহ ছিল। শিক্ষকেরা কোথায় কী বিবৃতি দিয়েছেন, কার পক্ষে বিবৃতি দিয়েছেন, কী বলেছেন, কী লিখেছেন—এই নিয়ে ছাত্রদের অনেকের হয়তো অসন্তোষ ছিল; কিন্তু ছাত্ররা কখনো শিক্ষকদের সঙ্গে সংঘাত জরাতেন না।
আমি যখন ঢাকা কলেজে পড়তাম, আমাদের বাংলার শিক্ষক ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী। স্যার ছিলেন শান্তিনিকেতনের ছাত্র, লোকসাহিত্যে দারুণ একজন পণ্ডিত। তিনি ছিলেন দারুণ রবীন্দ্রভক্ত, কথায় কথায় ক্লাসে কবিগুরুকে উদ্ধৃত করতেন। তখন মোনেম খান ছিলেন (পূর্ব) বাংলার গভর্নর; রবীন্দ্র সাহিত্য ও সংগীতের প্রতি ছিল তার দারুণ বিদ্বেষ। তিনি একদল শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী জোগাড় করেছিলেন, যারা প্রতি সপ্তাহে রবীন্দ্র সাহিত্য ও সংগীতবিরোধী বিবৃতি দিতেন। আমাদের শিক্ষক আশরাফ সিদ্দিকীও ছিলেন সেই দলে। ক্লাসরুমের রবীন্দ্রপ্রেমী শিক্ষকের বাইরের এমন নির্লজ্জ রাজনীতি দেখে আমরা ঢাকা কলেজের ছাত্ররা যারপরনাই অসন্তুষ্ট ছিলাম। কিন্তু এই অসন্তোষ কখনো রূঢ়তা ও সংঘাত ছড়ায়নি; হেনস্তা তো নয়-ই। ছাত্র হিসেবে আমরা তার পাণ্ডিত্যের গুণগ্রাহী ছিলাম। এখন ভাবি, আমরা কি তখন পারতাম স্যারকে জাপটে ধরে ক্লাস থেকে বের করে দিয়ে আমাদের অসন্তোষকে আরো কঠোরভাবে প্রকাশ করতে?
৪.
এখন জুলাই আন্দোলনের পর অনেক শিক্ষককে আওয়ামীপন্থী বলে হেনস্তা করা হচ্ছে। এর সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭১-৭২ সালের পরিস্থিতির তুলনা করা চলে। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক শিক্ষক ছিলেন যারা জামায়াতপন্থী এবং জামায়াত ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সমর্থক।
১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা মুক্তিযুদ্ধ শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসল। সেই সময়টা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব উত্তেজনাকর সময়। একদিকে নতুন স্বাধীনতার স্বাদ, অন্যদিকে ভাষাহীন দুঃখ ও বেদনা। ছাত্ররা এসে দেখলেন মুক্তিযুদ্ধে তাদের অনেক সহপাঠী ও বন্ধু প্রাণ হারিয়েছেন। শুধু তাই নয়, দেশের অনেক কৃতি সন্তান ও বেশ কয়জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক প্রাণ হারিয়েছেন শত্রুবাহিনীর দালাল আল-বদর, আল-শামস ও রাজাকার বাহিনীর হাতে। তাদের মধ্যে আরো অনেকের মধ্যে ছিলেন—আমাদের প্রিয় শিক্ষক মুনীর চৌধুরী (বাংলা), আবুল খায়ের (ইতিহাস), গিয়াসউদ্দিন আহমেদ (ইতিহাস), রশিদুল হাসান (ইংরেজি), মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী (বাংলা), ফয়জুল মহী (শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট)। আরো ছিলেন সাহিত্যিক ও সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সার, চিকিৎসক আলীম চৌধুরী।