ফাটা বাঁশের চিপায় ইরান

www.ajkerpatrika.com ইরান চিররঞ্জন সরকার প্রকাশিত: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:২৩

এমনিতে আমরা তুলনামূলকভাবে গরিব ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর পক্ষে দাঁড়াতে অভ্যস্ত। মুসলিম সভ্যতার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ইরানের প্রতিও আমাদের অবস্থান বরাবরই সহানুভূতিশীল। ইরানের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা যতই স্বৈরাচারী ও নিপীড়নমূলক হোক না কেন, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তার দীর্ঘদিনের অবস্থান এবং সম্প্রসারণবাদী ইসরায়েলের অবিরাম হামলা ও ষড়যন্ত্রের বিপরীতে আপসহীন ভূমিকার কারণে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে এই রাষ্ট্রটির প্রতি সমর্থনের কখনোই খুব একটা ঘাটতি হয়নি।


ইরানে এর আগেও বহুবার আন্দোলন হয়েছে। এ মুহূর্তে মনে পড়ছে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে মাহসা আমিনি নামে এক তরুণীর মৃত্যুর পর সংঘটিত আন্দোলনের কথা। সরকারি মানদণ্ড অনুযায়ী, হিজাব না পরার অভিযোগে ইরান সরকারের ধর্মীয় নৈতিকতা পুলিশ গাইডেন্স পেট্রল মাহসা আমিনিকে গ্রেপ্তার করেছিল। তাঁকে প্রচণ্ড মারধর করা হয় এবং পুলিশি হেফাজতেই তাঁর মৃত্যু হয়। এই মৃত্যুর ঘটনায় ইরানজুড়ে প্রতিবাদের ঢেউ ওঠে। এই প্রতিবাদ একসময় নারী স্বাধীনতার দাবি ছাড়িয়ে সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার বিরোধিতায় রূপ নেয়। রাজপথে নারীদের প্রকাশ্যে হিজাব খুলে প্রতিবাদ করা ইরানে ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নকে কেন্দ্রীয় আলোচনায় এনে দেয়। যদিও রাষ্ট্র কঠোর দমনপীড়ন চালায়, এই আন্দোলন ইরানি সমাজে ভয়ের দেয়াল ভাঙার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।


এবারের আন্দোলনটিকে তারই ধারাবাহিকতা বলা যায়। তবে এবার যেন ইরানের সাধারণ মানুষের পা ফাটা বাঁশের চিপায় আটকে গেছে। তারা পড়েছে দ্বিমুখী এক গভীর সংকটে। একদিকে প্রায় ৪৪ বছর ধরে ঘাড়ের ওপর চেপে বসে থাকা খোমেনির উত্তরাধিকারী শাসনের সীমাহীন দুর্নীতি, নৈতিকতা পুলিশের দৌরাত্ম্য, নারীদের ওপর সামাজিক ও পোশাকগত বিধিনিষেধ, ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি এবং লাগামছাড়া জিনিসপত্রের দামে জনজীবনের নাভিশ্বাস। অন্যদিকে এই শাসনব্যবস্থা উৎখাত হলে দীর্ঘ মেয়াদে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের খোপে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা—যা বহু ইরানির কাছেই সমান আতঙ্কের।


তবু এই সব দ্বিধা সত্ত্বেও ইরানের মানুষ শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়েছে। আক্ষরিক অর্থেই আজ ইরান জ্বলছে। বিক্ষোভের আগুন রাজধানী তেহরান ছাড়িয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক কয়েক দিনের আন্দোলনে শতাধিক মানুষের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে, যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।


ইতিহাস বলছে, ইরানে শাসন বদল কখনোই সহজ হয়নি। ১৯২৫ সালে কাজার রাজবংশকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন রেজা শাহ পাহলভি। তাঁকে সরাতে ইরানিদের লেগেছিল প্রায় ৫৫ বছর। সেই পাহলভির পতনের পর যে খোমেনি শাসন কায়েম হলো, তার সূচনালগ্নে ইরানিদের দেখানো হয়েছিল এক ভিন্ন স্বপ্ন—ইসলামি মূল্যবোধে গড়া এমন এক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের, যেখানে মানুষ মাথা উঁচু করে বাঁচবে। বাস্তবতা সেই স্বপ্নকে নির্মমভাবে মিথ্যা প্রমাণ করেছে। ফলে চার দশকের বেশি সময় পর আজ সেই খোমেনির উত্তরাধিকারী ব্যবস্থার পতন সময়ের অপেক্ষা বলেই মনে হচ্ছে।


তবে ইরানের ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো—প্রতিটি অভ্যুত্থানের জন্য মানুষকে প্রায় অর্ধশতাব্দী বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে, আর প্রতিবারই পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে তারা পথে নেমেছে। কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কখনোই পুরোপুরি ধরা দেয়নি। সামনের দিনে ইরানিদের ভাগ্যে যা-ই থাকুক না কেন, খামেনি শাসনের পতনের মধ্য দিয়ে গোটা মধ্যপ্রাচ্য যে আরও গভীরভাবে আমেরিকা-ইসরায়েল জোটের প্রভাববলয়ে ঢুকে পড়বে, তা প্রায় নিশ্চিত। এর ফলে রাশিয়া-চীন-উত্তর কোরিয়াকে ঘিরে যে প্রতিরোধী বলয় রয়েছে, সেটিও কার্যত আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। ইরানের মুক্তিকামী মানুষ চলমান লড়াইয়ে জয়ী হলেও প্রকৃত মুক্তি আদৌ মিলবে কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। নতুন এক সাম্রাজ্যবাদের হাতের পুতুল হওয়ার আশঙ্কা তাদের সামনে হাতছানি দিয়েই দাঁড়িয়ে আছে।


আজ ইরান এমন এক রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ভাঙন, দীর্ঘদিনের শাসন-সংকট এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধ-পরবর্তী ভূরাজনৈতিক চাপ একে অন্যকে আরও তীব্র করে তুলেছে। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে দোকানদারদের ধর্মঘট ও বিক্ষোভ দিয়ে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তা খুব দ্রুতই বাজার বা ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ ছাড়িয়ে একটি সার্বিক রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে রূপ নেয়। দ্রুত অবমূল্যায়িত রিয়াল, লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে দীর্ঘদিনের আস্থার ফাটল—সব মিলিয়েই এই বিস্ফোরণ।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও