’৭২ ও ’২৪-এর কী অদৃশ্য সেতুবন্ধন
গত ২ জানুয়ারি ছিল কমরেড সিরাজ শিকদারের মৃত্যু দিবস। মৃত্যু দিবস না বলে বরং বলা যায়, এটি ছিল সিরাজ শিকদারের হত্যা দিবস। ১৯৭৫ সালের এ দিবসে তাকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়। সেদিন অবশ্য বারটি শুক্রবার ছিল না। ছিল বৃহস্পতিবার। সিরাজ শিকদারের কথা মনে হওয়াতে আমার স্মৃতির সায়রে ভেসে উঠল ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহের কিছু স্মৃতি। আমি যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিন ওইসব স্মৃতি আমার মনের মণিকোঠায় চির জাগরূক থাকবে।
একদিকে মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের জয়ধ্বনি তুলে আওয়ামী লীগ মুখে ফেনা তুলেছে। অন্যদিকে যদি কোনো বীর মুক্তিযোদ্ধা, এমনকি সেক্টর কমান্ডারও যদি আওয়ামী লীগ এবং ভারতের অন্যায় ও অন্যায্য কাজের বিরোধিতা করেছে, তখন তাদের দালাল বা কোলাবরেট বলতেও এক মুহূর্ত সময় লাগেনি। স্বাধীনতার যুদ্ধে ১১ সেক্টরের মধ্যে ৯ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক ছিলেন মেজর জলিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর তিনি আওয়ামী লীগ ও ভারতবিরোধী হওয়ায় ১৫ বছর পর তিনি হয়ে যান পাকিস্তানের দালাল। ১৫ বছর পরে বলব কেন, স্বাধীন হওয়ার এক মাস পর মেজর জলিল ভারতীয় বাহিনীর হাতে বন্দি হন। তার অপরাধ, পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর ভারতীয় বাহিনী লুটপাটে মেতে ওঠে। তারা পাকিস্তানের পরিত্যক্ত যুদ্ধাস্ত্রই শুধু লুট করেনি, এমনকি বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টের মূল্যবান সামগ্রী, এমনকি বাথরুমের কমোড পর্যন্ত লুট করে নেয়। এসবের প্রতিবাদ করায় মেজর জলিলকে গ্রেফতার করা হয়। অন্যদিকে স্বাধীনতার সেই উষালগ্নেই সিরাজ শিকদার ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছিলেন।
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর দেশের বুক থেকে ভারতের আধিপত্যবাদী জগদ্দল পাথর অপসারণের জন্য যারা জীবন-মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করেছিলেন, তাদের মধ্যে প্রোজ্জ্বল তিনটি নাম হচ্ছে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী, মেজর জলিল এবং কমরেড সিরাজ শিকদার। সিরাজ শিকদার যে গতিতে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাচ্ছেন, তা দেখে মনে হয়-জাতির স্বার্থেই তার অবদান স্মরণ করার বিশেষ দরকার আছে।
২.
১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর রাতে, অর্থাৎ স্বাধীনতার মাত্র ৬ দিনের মাথায় আমি লঞ্চে করে বাগেরহাটের উদ্দেশে রওয়ানা হই। লঞ্চে পরিচিত হলাম এক কৃষ্ণকায় তরুণের সঙ্গে। নাম খোকন। সে বাগেরহাটের ছেলে। ২৩ ডিসেম্বর লঞ্চ থেকে হুলারহাট নামি। সেখান থেকে রিকশাযোগে পিরোজপুর শহর পার হয়ে বাগেরহাটের বাসে চাপলাম। সঙ্গে ওই খোকন। বাস চলছে। সম্ভবত বাগেরহাট পৌঁছতে আর আড়াই মাইল বাকি। সামনে ৫০-৬০ জন লোকের জটলা। ওরা বাসের গতিরোধ করলেন। বললেন, ‘বাগেরহাট যাবেন না। ভীষণ গোলযোগ হচ্ছে’। আমরা বাসের কয়েকজন যাত্রীকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কিসের গণ্ডগোল?’ দেখলাম ওদের চোখে-মুখে ভীতি ও সন্ত্রাসের ছাপ। প্রকৃত ঘটনা চেপে যাচ্ছেন।
শুধু বলছেন, সিরিয়াস গণ্ডগোল। অগত্যা আমি আর খোকন পদব্রজেই রওয়ানা হলাম। বাগেরহাট শহরে ঢোকার পর দেখলাম, রাস্তাঘাট প্রায় জনশূন্য। যে কয়েকজন চলাচল করছে, তাদের চোখে-মুখে সীমাহীন আতঙ্ক। ভোঁ ভোঁ করে সামরিক বাহিনীর জিপ ও ট্রাক ছোটাছুটি করছে। ট্রাক ও জিপভর্তি ভারতীয় সৈন্য। হাতে উদ্যত সঙ্গিন। আরও কিছুদূর এগিয়ে গেলাম। দেখলাম তিনটি লাশ। লাশের পরনে ভারতীয় সৈন্যের জলপাই রঙের পোশাক। আরও কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পর দেখলাম, বিএলএফ বা বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সের ক্যাম্প। এ বিএলএফ পরবর্তীকালে মুজিব বাহিনী নামে পরিচিত হয়।
মুজিব বাহিনীর যুবকরা ভারতীয় এসএলআরের নল পরিষ্কারে ব্যস্ত। বিজয় দিবসের মাত্র ৬ দিন পর বিজয়ী ভারতীয় বাহিনীর ৩ জন সৈন্য নিহত? চিন্তা করতেই গা কাটা দিয়ে উঠল। এর ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা ভেবে শিরদাঁড়া দিয়ে একটা স্রোত বয়ে গেল। প্রকম্পিত বক্ষে অদূরে অবস্থিত একটি সরকারি কোয়ার্টারে উঠলাম। এখানে থাকেন আমার বড় ভাই ও ভাবি। সরকারি কর্মকর্তা। শুধালাম ব্যাপার কী? ওষ্ঠে তর্জনী ঠেকালেন ভাই। অর্থাৎ ‘চুপ’। বললেন, খেয়ে দেয়ে পড়ে পড়ে ঘুমাও। রাতে এমনিতেই সব টের পাবে।
তারপর। রজনীর অন্ধকার দিনের আলোকে গ্রাস করল। যামিনীর প্রহর গড়িয়ে চলল। সম্ভবত তখন যামিনীর দ্বিতীয় প্রহর, অকস্মাৎ রাত্রির নীরবতা বিদীর্ণ করে শোনা গেল স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের অবিশ্রান্ত আওয়াজ। আর তার সঙ্গে উত্থিত হলো তিনটি সমস্বর স্লোগান : ‘পিন্ডি ছেড়েছি, দিল্লি যাবো না’। ‘কমরেড সিরাজ শিকদার জিন্দাবাদ,’ ‘পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি জিন্দাবাদ’। চকিতে আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল দিনে দেখা ৩টি ভারতীয় সৈন্যের মৃতদেহ। ভাই আর ভাবির সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হলো। আর এ দৃষ্টি বিনিময়ের মধ্য দিয়ে ওরা শব্দহীন ব্যাখ্যা দিলেন দিনে কী ঘটেছিল। পরদিন গেলাম বাগেরহাট প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজে। এখানেও রাতের ঘটনারই পুনরাবৃত্তি। তবে ভিন্ন পথে। অসংখ্য চিকায় কলেজের দেওয়াল ভরে গেছে। চিকার ভাষা, ‘পিন্ডি ছেড়েছি, দিল্লি যাবো না,’ ‘কমরেড সিরাজ শিকদার জিন্দাবাদ।’