মার্কিন বাহিনী চলতি সপ্তাহের শুরুতে পুরো বিশ্বকে চমকে দিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে সস্ত্রীক তাঁর দেশ থেকে তুলে নিয়ে গেছে। প্রথমে রাজধানী কারাকাস থেকে হেলিকপ্টারে করে তাঁদের নেওয়া হয় মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আইও জিমায়। তারপর সে জাহাজে করে মাদুরো দম্পতিকে নেওয়া হয় গুয়ানতানামো বে ঘাঁটিতে। সেখান থেকে আকাশপথে তাঁদের নেওয়া হয়েছে নিউইয়র্কে, করা হয়েছে কারাবন্দী।
একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও ফার্স্ট লেডিকে এভাবে তুলে নেওয়া কতটা আইনসিদ্ধ, তা নিয়ে এখন আলোচনা-সমালোচনা চলছে বিশ্বজুড়ে। এই প্রশ্নের চেয়েও বড় প্রশ্ন, মাদুরোকে এভাবে তুলে নেওয়া পুরো বিশ্বকে কী বার্তা দিল।
প্রথম প্রশ্নটির জবাব সুস্পষ্টভাবে জাতিসংঘ সনদেই দেওয়া আছে। সনদ অনুসারে জাতিসংঘের কোনো সদস্যরাষ্ট্র অপর কোনো সদস্যরাষ্ট্রকে হুমকি অথবা বলপ্রয়োগ করতে পারবে না। তবে কোনো সদস্যরাষ্ট্র যদি আক্রান্ত হয়, তাহলে ‘আত্মরক্ষার’ সুযোগ দেওয়া আছে জাতিসংঘ সনদে। এ ক্ষেত্রে সোজাসাপ্টা বলেই দেওয়া যায়, যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ সনদ লঙ্ঘন করেছে।
এবার আসা যাক এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব আইন ভঙ্গ হয়েছে কি না, সে প্রশ্নে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান কংগ্রেসকে যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা দিয়েছে, তবে প্রেসিডেন্টকে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক করেছে। কাজেই মাদুরোকে তাঁর দেশ থেকে তুলে নেওয়ায় মার্কিন আইন ভঙ্গ হয়েছে কি না, তা সুস্পষ্ট নয়। নিজ দেশের আইনের এই ধূসর জায়গার সুযোগেই ১৯৮৯ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের প্রশাসন পানামার সামরিক নেতা ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে তুলে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে বিচারের মুখোমুখি করেছিল। মাদুরোর বিরুদ্ধে যে মাদকের অভিযোগ, নরিয়েগার বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের।
অবশ্য সাবেক প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সময় একটি আইন প্রণয়ন করেছিল মার্কিন কংগ্রেস। সে আইনে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতায় কিছুটা রাশ টানা হয়েছিল। আইনটি অনুসারে, বিদেশের মাটিতে মার্কিন বাহিনীকে দিয়ে প্রতিটি পদক্ষেপ নেওয়ার আগে কংগ্রেসের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে প্রেসিডেন্টকে এবং কোথাও সেনা মোতায়েন কিংবা সামরিক অভিযানের ন্যূনতম ৪৮ ঘণ্টা আগে কংগ্রেসকে অবহিত করতে হবে। মাদুরোকে তুলে নেওয়ার আগে ট্রাম্প অবশ্য ওই আইনের তোয়াক্কাই করেনননি।
প্রশ্ন উঠতে পারে, নরিয়েগার মতো মাদুরোর বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্রে মামলা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে কি তাঁকে এভাবে তুলে আনা যৌক্তিক? এ ক্ষেত্রে বিবিসিকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিভল্যান্ড স্টেট ইউনিভার্সিটি কলেজ অব ল-এর আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ মিলেনা স্টেরিওর বক্তব্য অবশ্যই উল্লেখ করা দরকার। তিনি বলেছেন, একটি দেশ অন্য কোনো দেশে ঢুকে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্র যদি অন্য কোনো দেশ থেকে কাউকে গ্রেপ্তার করতে চায়, তাহলে তা করার উপযুক্ত উপায় হলো, ওই দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে গ্রেপ্তার করিয়ে বন্দী প্রত্যর্পণ। তিনি বলেন, কারও বিরুদ্ধে যদি যুক্তরাষ্ট্রে মামলাও থাকে, তারপরও দুনিয়ার যেকোনো প্রান্তে গিয়ে অন্য কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্র থেকে কাউকে গ্রেপ্তার করার অধিকার মার্কিন কর্তৃপক্ষের নেই।
এটুকুতেই স্পষ্ট হয়, মাদুরোকে তাঁর দেশ থেকে আটক করে আনা কতটা আইনসিদ্ধ হয়েছে। এবার আসা যাক, এই ঘটনা বিশ্বকে কী বার্তা দিল, সে প্রশ্নে।
মাদুরোকে আটক করে তাঁর দেশ থেকে তুলে নেওয়ার পর ফ্লোরিডায় নিজের মালিকানাধীন মার-এ-লাগো ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে তিনি অনেক কিছুই বলেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বক্তব্যটি হলো—যথাযথভাবে ক্ষমতার পালাবদল না ঘটা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করবে।