স্মার্ট ছদ্মবেশ ও দালাল সিন্ডিকেটের জাল
বাংলাদেশে নগরজীবন যত ব্যস্ত হচ্ছে গৃহকর্মীর ওপর নির্ভরশীলতাও তত বাড়ছে। ব্যস্ত শহুরে জীবনে কাজ, সন্তান, বয়স্ক সদস্যদের দেখাশোনার জন্য পরিবারের সহায়তায় গৃহকর্মী প্রায় অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু গত কয়েক বছরে যে-সব হত্যাকাণ্ড, চুরি, নিখোঁজ কিংবা অপহরণের ঘটনা গৃহকর্মীদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সামনে এসেছে, তা সমাজে নতুন এক অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে ঘটনা কোনো আকস্মিক অপরাধ না হয়ে এর পেছনে কাজ করছে সুপরিকল্পিত একটি দালালচক্র অর্থাৎ সিন্ডিকেট, যারা দরিদ্র গ্রামের মেয়েদের শহরে এনে কাজের নামে অপরাধচক্রে ঢুকিয়ে দেয় অথবা তাদেরকে ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ অপরাধ পরিচালনা করে থাকে।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক চুরি, লুট, নিখোঁজ, এমনকি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গৃহকর্মী ও গৃহকর্মী সরবরাহকারী চক্রের নাম উঠে আসছে। এসব ঘটনার পেছনে কাজ করছে শক্তিশালী ও সংগঠিত অপরাধীচক্র, যার অনেক সময় চোর, ডাকাত কিংবা ঘাতক সিন্ডিকেট হিসেবেও পরিচিত। এদের টার্গেট কোনো বাসায় কাজ নিয়ে দ্রুত বিশ্বাস অর্জন করা আর সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে সম্পদ, মূল্যবান সামগ্রী এবং কখনো কখনো মানুষের জীবন পর্যন্ত কেড়ে নেওয়া। এসব অপরাধী, ঘাতক সিন্ডিকেটদের নানা বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়।
প্রথমত, গৃহকর্মী সংগ্রহের অগোছালো ব্যবস্থা ও এই সংকটকে আরও জটিল করা। অধিকাংশ পরিবার মৌখিক পরিচয়ের ভিত্তিতে গৃহকর্মী রাখে। কেউ আত্মীয়ের মাধ্যমে, কেউ দালালের মাধ্যমে। এই দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীরাই মূলত সিন্ডিকেটের প্রধান অংশ। তারা গ্রাম থেকে অল্প বয়সী মেয়েকে এনে শহরের বিভিন্ন বাসায় কাজে ঢুকিয়ে দেয় এবং তাদের ওপর আটকানো থাকে অঘোষিত কমিশন। ফলে গৃহকর্মীটি প্রকৃত নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে। তার আনুগত্য থাকে দালালচক্রের কাছে, যার নির্দেশে সে চুরি, তথ্যফাঁস, এমনকি খুন পর্যন্ত করতে বাধ্য হয়।
দ্বিতীয়ত, এসব সিন্ডিকেটের রয়েছে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। যেখানে দালাল, মানবপাচারকারী, ভুয়া গৃহকর্মী সরবরাহকারী সংস্থা এমনকি কিছু অপরাধীচক্রও যুক্ত। বিভিন্ন এলাকায় ‘চক্র’ সক্রিয়ভাবে গৃহকর্মী বদল, পালানো, বা অন্য বাসায় সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে নিজেদের পেছনের অপরাধকে গোপন করে। কোনো বাসা থেকে চুরি হলে বা সন্দেহজনক মৃত্যু হলে দেখা যায় ঘটনার আগের দিনই গৃহকর্মীকে পালিয়ে যেতে বলা হয়েছিল অথবা দালাল এসে তাকে অন্য বাসায় নিয়ে গেছে। এসবই সংঘবদ্ধ অপরাধেরই কৌশল।
তৃতীয়ত, আইনগত দুর্বলতা ও তদারকির অভাব এসব সিন্ডিকেটকে আরও বেপরোয়া করেছে। গৃহকর্মী আইনে কিছু অগ্রগতি হলেও বাস্তবায়ন হতাশাজনক। এখনও পর্যন্ত গৃহকর্মীদের কোনোকিছুই আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধনভুক্ত হয় না। তাদের নেই কোনো কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ। ফলে এক বাসায় অপরাধ করে অন্য বাসায় অনায়াসে গা ঢাকা দিয়ে ফেলা সম্ভব হয়। অপরাধ প্রমাণের ক্ষেত্রেও আইনি দুর্বলতা ও তদন্তের সীমাবদ্ধতা বিচারকে জটিল করে তুলছে।
চতুর্থত, গৃহকর্মী সম্প্রদায়ের নিজস্ব দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা ও সামাজিক অসহায়ত্বকেও কাজে লাগায় সিন্ডিকেট। অনেক সময় মেয়েদের মোবাইল ফোন দিয়ে দালালের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ রাখা হয়, বাসার তথ্য, মালামালের অবস্থান, পরিবারের সময়সূচি সব কিছু নিয়মিত আদান-প্রদান হয়। তাদের পালিয়ে যাওয়ার কাহিনি বহু সময়ই সাজানো। মূল উদ্দেশ্য নতুন জায়গায় গিয়ে নতুন নতুন অপরাধের সুযোগ তৈরি করা।
- ট্যাগ:
- মতামত
- গৃহকর্মী
- অপরাধমূলক কর্মকান্ড