তারেক রহমানের সামনে দুই বড় চ্যালেঞ্জ
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫-এ স্বদেশে ফিরেছেন।
তাকে বাধ্যতামূলকভাবে বৃটেনে লন্ডনে নির্বাসিত করা হয়েছিল ১১ সেপ্টেম্বর ২০০৮-এ। অর্থাৎ ১৭ বছরের বেশি সময় পরে তারেক রহমান স্বদেশে ফিরতে পারলেন।
ওয়েলকাম ব্যাক হোম তারেক।
কিন্তু এই ১৭ বছরের বেশি সময়ে অনেক কিছু বদলে গেছে। বিশ্বে এবং বাংলাদেশে ও ব্যক্তিগত জীবনে।
১৭ বছর আগে যখন তারেক রহমানকে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল তখন তার নামের সঙ্গে এই উপমহাদেশের রীতি অনুসারে যুক্ত করা হতো বিশেষণ—তারুণ্যের অহংকার তারেক রহমান।
এখন তিনি আর তরুণ নন। ১৭ বছর পরে তিনি এখন মধ্যবয়সী। এই মাঝখানের ১৭ বছর ডাকাতি করে নিয়ে গিয়েছে মইন ইউ আহমেদের ওয়ান-ইলেভেন সরকার এবং শেখ হাসিনার আওয়ামী সরকার।
এই হারিয়ে যাওয়া সময় আর কখনোই ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
তারেকের সেই তারুণ্য এখন স্মৃতিতে রূপান্তরিত হয়েছে।
এটাই তারেকের বড় ক্ষতি করেছে ওই দুই সরকার এবং ওই দুই সরকারের পেছনের উদ্যোক্তা ও পৃষ্ঠপোষকরা।
একটা মানুষের হারিয়ে যাওয়া জীবনের দুঃখ আমি বিশেষভাবে বুঝি। কারণ আমাকেও তিনবার নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়েছে ওই বৃটেনেই লন্ডন শহরে।
প্রথমবার, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে, দ্বিতীয়বার এরশাদের শাসন আমলে এবং তৃতীয়বার হাসিনার শাসন আমলে। আমি স্বদেশে ফিরে আসতে পারি গত বছরে ২০২৪-এর অগাস্ট মাসে।
তাই আমি বুঝি দেশে ফিরে আসার কি ব্যাকুলতা, আকুলতা ও আশা থাকে নির্বাসিত জীবনে।
তারেকের সৌভাগ্যের বিষয় একটানা ১৭ বছরের বেশি সময় নির্বাসিত থাকলেও, তিনি মধ্যবয়সী হলেও, শেষ পর্যন্ত ফিরতে পেরেছেন এবং বর্তমানে যারা তরুণ তাদের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। ওয়ান-ইলেভেন ও আওয়ামী স্বৈরাচারী শাসনের প্রায় ১৮ বছর পর এখন আবার ফিরে এসেছে একটি অবাধ ও মুক্ত ইলেকশনের সময় এবং সত্যিকার অর্থে একটি নির্বাচিত সরকার গঠনের সম্ভাবনা।
বলাবাহুল্য, তারেকের কাছে বর্তমান তরুণদের প্রত্যাশা অনেক। তারুণ্যের অহংকার এখন তরুণদের প্রত্যাশা। এই প্রত্যাশাকে বাস্তবায়িত করতেই হবে তারেক রহমানকে; কিন্তু এটাও সবাইকে বুঝতে হবে তারেকের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আছে তারেকের নিজের মধ্যেই।
তার দুই কাঁধে ভর করে আছেন দুই হেভিওয়েট সুপারস্টার।
এই দুই হেভিওয়েট সুপারস্টারের একজন হচ্ছেন তার প্রয়াত পিতা জিয়াউর রহমান এবং আরেকজন হচ্ছেন সদ্যপ্রয়াত মাতা খালেদা জিয়া।
সোজাভাবে বলতে হয় জিয়া ও খালেদা ভার হয়ে আছেন তারেকের দুই কাঁধে। এদের দুই জনের যোগ্য উত্তরাধিকারী হওয়াটাই হবে তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এদের দুই জনের সমান অথবা বেশি সাফল্য তারেককে অর্জন করতেই হবে।
সেটা যদি তারেক করতে পারেন তাহলেই মানুষ বলবে হ্যাঁ, মা-বাবার ব্যাটা তারেক রহমান।
প্রথম চ্যালেঞ্জ
আমি তাই প্রথমে মনে করিয়ে দিচ্ছি জিয়াউর রহমানের সাফল্যের মূল কয়েকটি কারণ। তিনি ছিলেন সৎ, পরিশ্রমী, নিয়মানুবর্তী, স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে, নির্লোভ, সাধারণ জীবন পালনে অভ্যস্ত, আত্মপ্রচারে বিমুখ কিন্তু সারা দেশের মানুষের সঙ্গে হাত মেলাতে উন্মুখ। তিনি জিন্স ও গেঞ্জি পরে গ্রামে গ্রামে খাল কেটেছেন। আবার স্মার্টলি বিদেশেও গিয়েছেন।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ
তারেকের অপর কাঁধে ভর করে আছেন খালেদা জিয়া। তার ওজনও কেন ভারি সেটাও আমি বলে দিচ্ছি।
খালেদা ছিলেন স্বল্পভাষী। তার ভাষা ছিল মার্জিত। তার পোশাক ছিল সুরুচির পরিচায়ক। তিনি মনে-প্রাণে ছিলেন নির্লোভ। মানুষের মন ও পরিবেশের শুদ্ধতায় তিনি ছিলেন বিশ্বাসী। তাই তার পছন্দের রং ছিল শাদা। তিনি শাদা মনের মানুষ—মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে কখনো ভোট চাননি। তার এই সততার ফলে তিনি বিশ্ব রেকর্ড স্থাপন করে আছেন। কখনোই কোনো ইলেকশনে তিনি পরাজিত হননি। একজন লাজুক গৃহবধূ থেকে আপসহীন সংগ্রামী রাজনীতিবিদ তিনি হতে পেরেছিলেন—কারণ তিনি দূরদর্শী। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি অপ্রত্যাশিত হলেও পরবর্তীতে হয়েছেন অসাধারণ। শেখ মুজিবের মৃত্যুর পরপরই আওয়ামী লীগ তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল; কিন্তু জিয়াউর রহমানের অকাল মৃত্যুর পরে বিএনপি বহুধা বিভক্ত হয়নি খালেদার বিচক্ষণতার কারণে। এমনকি ওয়ান-ইলেভেনে তথাকথিত সংস্কারপন্থিদের বিরোধিতা সত্ত্বেও।
তিনি আমাকে বলেছিলেন, শুধু দুইজন বাদে, সবাইকে বলবেন বিএনপির দরজা খোলা। তারা (সংস্কারপন্থিরা) ফিরে আসতে পারেন। তারা সবাই ফিরে এসেছিলেন এবং ওই মুহূর্তে বিএনপিই যে সবচেয়ে বড় দল এবং সবচেয়ে শক্তিশালী জনপ্রতিনিধি সেটা সবাই স্বীকার করেছিলেন। বিরোধী অবস্থানে এবং সুদীর্ঘকাল বন্দি থেকেও খালেদা তার পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পেরেছিলেন। কি অসাধারণ কৃতিত্ব!
এ ছাড়া তিনি নারী শিক্ষার এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মান ধরে রেখেছিলেন ক্ষমতাসীন থাকার সময়ে। তার সবচেয়ে বড় গুণ হচ্ছে তিনি মনেপ্রাণে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। তাই তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন এবং এই কেয়ারটেকার গভর্নমেন্ট ব্যবস্থায় ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে বিশ্বনন্দিত ইলেকশন এই বাংলাদেশেই হয়েছিল।
সেই ব্যবস্থা পালটে দিয়েছিল কিছু সাংবাদিক, কিছু সেনা সদস্য, আওয়ামী লীগ এবং তাদের আজ্ঞাবহ একজন বিচারপতি। ভেবে দেখুন, যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বজায় থাকত তাহলে আরো চারটি ইলেকশন বিগত ১৮ বছরে হতে পারত। বাংলাদেশ এখন যে ভয়াবহ নৈরাজ্যের মুখোমুখি হয়েছে, দুর্বল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিরাজ করছে, যার একটি ফল হচ্ছে জন-আক্রোশ এবং যার ফলে নীতি ও আদর্শবিহীন সাংবাদিকরাই এখন আক্রান্ত হচ্ছেন—এসব কিছুই হতো না।
এই নতুন পরিস্থিতির পুরোভাগে আছেন তরুণরাই। তাদের নতুন পথ নির্দেশনা দিতে হবে তারেক রহমানকে। তিনি যদি তার পিতা-মাতার পথ অনুসরণ করে দেশে নেতৃত্ব দেন তাহলে তিনি অবশ্যই সফল হবেন। তাই সপরিবারে তার স্বদেশ ফেরাতে সবাই অনেক আশা নিয়ে আছে।