গণতান্ত্রিক লড়াই-সংগ্রামের এক কেন্দ্রীয় চরিত্র বেগম খালেদা জিয়া

বণিক বার্তা শামছুল আলম সেলিম প্রকাশিত: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:২৭

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রাঙ্গণ বারবার বদলেছে, বদলেছে নেতৃত্বও। সময়ের পরিক্রমায় অনেকেই আলোচনার কেন্দ্রে এসেছেন, কিন্তু খুব কম লোকই মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিতে পেরেছেন। দল-মত-নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা, আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করতে পেরেছেন এমন নেতার সংখ্যা খুবই সীমিত। এই গণমানুষের হৃদয়স্পর্শী ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বের তালিকা করলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার নাম নিঃসন্দেহে সবচেয়ে উজ্জ্বলভাবে উঠে আসে। গণতন্ত্রের পথে তার দীর্ঘ সংগ্রাম, অবিচল মনোভাব, আপসহীন নেতৃত্ব এবং জনগণের প্রতি অকৃত্রিম দায়বদ্ধতা তাকে একজন পার্টি লিডার থেকে ‘ন্যাশনাল লিডার’ বা জাতীয় নেতায় রূপান্তরিত করেছে। তিনি বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার এক কেন্দ্রীয় চরিত্র, যিনি সংকটের মুহূর্তে রাজনীতিকে নতুন পথ দেখিয়েছেন। অসংখ্য বিপর্যয়ের মধ্যেও নিজেকে দেশের জন্য নিবেদন করতে মুহূর্তের জন্য তিনি পিছপা হননি। এমন এক দেশপ্রেমী আপসহীন নেত্রীর বিদায়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যেন এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি হলো। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বিদায় নিলেন রাজনীতির ‘ধ্রুবতারা’ খালেদা জিয়া।


খালেদা জিয়া রাজনৈতিক অঙ্গনে এক উজ্জ্বল আদর্শ। সাধারণ একজন গৃহবধূ থেকে আসীন হয়েছেন সর্বোচ্চ ক্ষমতাসীন পদে। তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। বারবার নির্যাতন ও কারাবরণের মুখেও দেশ ও জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে সরে পড়েননি। জীবন গেলেও দেশ ও দেশের মানুষকে ছেড়ে যাবেন না এমন দৃঢ় নীতিতে অবিচল থেকেছেন আমৃত্যু। তবে তার এই যাত্রা সহজ ছিল না। অল্প বয়সেই তিনি হারিয়েছেন জীবনসঙ্গীকে, পরে হারিয়েছেন এক ছেলেকে। স্বৈরাচারী রাজনীতির নির্মম শিকার হয়ে আরেক ছেলে তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর দেশের মাটিতে পা রাখতে পারেননি। শোকের পর শোক নেমে এসেছে তার জীবনে। পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বেগম জিয়া একাই রয়ে গেছেন দেশের মাটিতে। এতে অবশ্য তার কোনো আফসোস ছিল না। তিনি বারবার বলতেন, এ দেশের জনগণই তার পরিবার। এমন ত্যাগ ক’জনইবা স্বীকার করতে পারেন! এ যেন এক মহাবিস্ময়। দেশকে আঁকড়ে ধরে, দেশ ও মানুষের জন্যই তিনি আমৃত্যু রয়ে গেলেন দেশের মাটিতেই।


রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়া ছিলেন অত্যন্ত সফল। নির্বাচনী রাজনীতিতে তিনি কখনো পরাজিত হননি। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনগুলোতে তিনি পাঁচটি পৃথক সংসদীয় আসন থেকে নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালে যে তিনটি আসনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, সেখানেও তিনি গৌরবময় বিজয় অর্জন করেন। এ ধারাবাহিক সাফল্য তাকে দেশের অন্যতম শক্তিশালী ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিণত করে। তবে রাজনীতিতে তার আগমন ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত। তিনি রাজনীতিতে আসবেন, কিংবা দেশের জনগণের আস্থার একক কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবেন এমনটি তখন কল্পনাতীত ছিল। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের শাহাদত বরণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করে। সে সময় দেশ ও দল উভয়ই নেতৃত্বের চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। এ সংকটময় মুহূর্তে দলের শীর্ষ নেতাদের অনুরোধে তিনি ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি সাধারণ সদস্য হিসেবে বিএনপিতে যোগ দেন। এখান থেকেই শুরু হয় তার সক্রিয় রাজনৈতিক যাত্রা। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নিজের সক্ষমতা ও নেতৃত্বগুণের প্রমাণ দেন। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে, ১৯৮৩ সালের মার্চে তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরের বছর, ১৯৮৪ সালের আগস্টে তিনি দলের সর্বোচ্চ দায়িত্ব, চেয়ারপারসনের পদ গ্রহণ করেন। এরপর থেকেই তিনি দলকে দৃঢ়তা ও দক্ষতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। তার সুসংহত ও দূরদর্শী নেতৃত্বে বিএনপি তিনবার জাতীয় নির্বাচনে বিজয় অর্জন করে। একই সঙ্গে তার নেতৃত্বে বিএনপির ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলও ছাত্ররাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়।


অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গঠনের যে যাত্রা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে শুরু হয়, সেই পথচলার পূর্ণতা আসে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। দীর্ঘ সেনাশাসনের পর দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ। সে সময় বেগম জিয়ার উদ্যোগে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ বাজার অর্থনীতির পথে অগ্রসর হয়। এ ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তই দেশে শিল্পায়নের নতুন দ্বার উন্মোচন করে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ আজ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। অর্থনৈতিক উদারীকরণের মাধ্যমে খালেদা জিয়া দেশের অর্থনীতির যেই মজবুত ও টেকসই ভিত্তি স্থাপন করেন, তারই ধারাবাহিকতায় চলছে বর্তমান অর্থনীতি। শুধু অর্থনীতি নয়, শিক্ষা প্রসারেও তার উদ্যোগ ছিল যুগান্তকারী। তার সময়ে গৃহীত নীতিমালা শিক্ষার দ্বার উন্মোচন করে। বিশেষ করে মেয়েদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালু করা বাংলাদেশের নারী শিক্ষার অগ্রগতিতে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। খালেদা জিয়ার বহু কর্ম ও সিদ্ধান্ত দেশকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছে, যার প্রভাব আজও বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় দৃশ্যমান।


বলা বাহুল্য, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা এ দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। কিন্তু স্বাধীনতার মাত্র কিছুদিনের ব্যবধানে সেই স্বপ্নই যেন দুঃস্বপ্নে রূপ নেয়। শেখ মুজিবুর রহমানের বাকশাল কায়েমের প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রের কফিনে কার্যত পেরেক ঠুকে দেয়া হয়। তার পর পরই শুরু হয় একটানা দেড় দশকের সামরিক শাসন। সব মিলিয়ে দেশের মানুষ গণতন্ত্রের জন্য যেন মরিয়া হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটেই খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে শুরু হয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম। ১৯৮২ সালে জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশে যখন স্বৈরশাসন কায়েম হয়, তখনই খালেদা জিয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সর্বাত্মক পতাকাবাহী হিসেবে সামনে আসেন। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি অসামান্য দৃঢ়তা ও সাহসিকতার পরিচয় দেন। এ আপসহীন ভূমিকার কারণে ১৯৮৩-৯০ সাল পর্যন্ত তাকে সাতবার আটক করা হয়। কারাজীবন, গৃহবন্দিত্ব কিংবা রাজনৈতিক দমন কোনো কিছুই তাকে দমাতে পারেনি। বরং প্রতিটি বাধা তাকে আরো শক্ত ও দৃঢ় করে আন্দোলনের সামনের কাতারে ঠেলে দিয়েছে। তার নেতৃত্বেই শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সফল হয়। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি প্রথমবারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। গণতান্ত্রিক এ প্রক্রিয়া এবং নির্বাচনী রাজনীতির ধারাবাহিকতায় তার নেতৃত্ব দেশের রাজনীতিকে কাঙ্ক্ষিত বহুমাত্রিকতা দিয়েছে। নানা চাপ, প্রতিবন্ধকতা ও আন্তর্জাতিক পরিবর্তনের মধ্যেও তিনি গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারা টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে ছিলেন অবিচল ও আপসহীন। গণতন্ত্রের এ দীর্ঘ লড়াইয়ে তার অবদানই তাকে দেশের জনমানসে প্রতিষ্ঠা করেছে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে, যে উপাধি আজও তার রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম শক্ত ভিত্তি হয়ে রয়েছে।


নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের লড়াই-সংগ্রাম ও আপসহীনতার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি বেগম জিয়া। রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি স্তরে তাকে কঠিন প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কখনো তাকে নিজ বাসভবনে অবরুদ্ধ রাখা হয়েছে, কখনো কারাবন্দি করা হয়েছে, আবার কখনো রাজনীতিতে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ সীমিত করার নানা অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য কিংবা স্বস্তিকর জীবনের প্রতিশ্রুতি নয়; তিনি বেছে নিয়েছেন দেশকে, জনতাকে এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশে গণতান্ত্রিক স্পেস ক্রমে সংকুচিত হতে থাকে এবং বিরোধী রাজনীতির ওপর চাপ বাড়তে থাকে। এ পরিস্থিতিতে গণতন্ত্রের আন্দোলনকে শক্তিশালী করতে বেগম জিয়া যখন রাজপথে নেমে আসেন, তখন তাকে দু’দফায় গৃহবন্দি করে রাখা হয়। মিথ্যা ও বানোয়াট মামলায় তাকে ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয় এবং দীর্ঘ সময় তাকে কারাগারে কাটাতে হয়। তবু আপসহীন এই নেত্রী গণতন্ত্রের প্রশ্নে কখনো নতি স্বীকার করেননি। এই দৃঢ়তা, এই সৎ প্রতিশ্রুতি এবং জনগণের প্রতি তার অটুট বিশ্বাসই তাকে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছে। কর্মগুণে, সততায়, ত্যাগে এবং লড়াইয়ে তিনি এমন একটি জায়গা দখল করেছেন, যা রাজনৈতিক পরিচয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় মর্যাদার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

এই সম্পর্কিত

আরও