কুরআন ছুঁয়ে শপথ নিয়ে ইতিহাস গড়লেন মামদানি
ম্যানহাটানের মিডটাউনে অবস্থিত টাইমস স্কয়ারে হাজার হাজার মানুষ যখন হিমাঙ্কের পাঁচ ডিগ্রি নিচে হাড়কাঁপানো শীতে প্রতিবারের মতো থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপনের জন্য জড়ো হয়ে নিউইয়র্ক টাইমসের পুরোনো ভবনের শীর্ষ থেকে ‘বল ড্রপ’-এর অপেক্ষা করছিল, তখন সেখান থেকে সাড়ে তিন মাইল দূরে লোয়ার ম্যানহাটানে অবস্থিত সিটি হলের নিচে নিউইয়র্কের পাতাল রেল বা সাবওয়ের পরিত্যক্ত স্টেশনে একই সময়ে অল্প কিছুসংখ্যক লোক অপেক্ষা করছিলেন নতুন এক যুগের শুভ সূচনার। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম, প্রথম এশিয়ান এবং আফ্রিকায় জন্মগ্রহণকারী প্রথম ব্যক্তি হিসাবে জোহরান মামদানির মেয়র পদে শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হবে এ যুগের। ৩১ ডিসেম্বর বুধবার রাত ১২টা বাজার ঠিক চার মিনিট আগে পাতাল রেলের ৬ নম্বর লাইনের একটি ট্রেন এসে থামল ৪১ বছর আগে ১৯৪৫ সালে পরিত্যক্ত ঘোষিত সিটি হল স্টেশনে। একটি কম্পার্টমেন্ট থেকে অবতরণ করলেন নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি, তার স্ত্রী রামা দুওয়াজি এবং মেয়রকে শপথ পাঠ করানোর জন্য দায়িত্বশীল অধিকর্তা নিউইয়র্ক স্টেটের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস। নিউইয়র্কে ১৯০৪ সালে পাতাল রেল চালু হওয়ার সময় প্রথম যে ২৮টি স্টেশন চালু করা হয়েছিল, সিটি হল স্টেশন তার একটি। তারা ট্রেন থেকে নেমে খিলানশোভিত একটি খোলা স্থান দিয়ে শপথের নির্ধারিত স্থানে উপস্থিত হন।
রাত ১২টার পর সমবেত সবাই ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ শুভেচ্ছা উচ্চারণ করে অতি সংক্ষিপ্ত আনুষ্ঠানিক শপথ অনুষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু করেন। জোহরান মামদানির স্ত্রী রামা দুওয়াজি তার হাতে ধরে রেখেছিলেন ছোট আকৃতির দুটি কুরআন। মামদানি কুরআনগুলোর ওপর তার বাম হাত স্থাপন করে ডান হাত তোলেন বুকের সামনে এবং অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস আনুষ্ঠানিক শপথবাক্য উচ্চারণ করলে মামদানির কণ্ঠে তা প্রতিধ্বনিত হয়। আনুষ্ঠানিক শপথে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আমেরিকান সংবিধান সমুন্নত রাখা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল, স্টেট ও সিটির আইন অনুসরণ করার প্রতিশ্রুতি থাকে। রামা দুওয়াজি যে দুটি কুরআন ধরে রেখেছিলেন, তার মধ্যে একটি মামদানির দাদার এবং অপরটি নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরির ‘স্কোমবার্গ সেন্টার ফর রিসার্চ ইন ব্ল্যাক কালচার’-এ পুয়ের্টোরিকান কৃষ্ণাঙ্গ ইতিহাসবিদ ও লেখক আর্তুরো স্কোমবার্গের সংগৃহীত কুরআনের হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি। পরে ১ জানুয়ারি সিটি হলের সামনে যখন ভারমন্টের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স প্রকাশ্য সমাবেশে জোহরান মামদানিকে শপথবাক্য পাঠ করান, তখন রামা দুওয়াজির হাতে তিনটি কুরআন শরিফ ছিল এবং তৃতীয় কুরআনটি ছিল মামদানির দাদির। মেয়র মামদানির পূর্বসূরিদের মধ্যে নিউইয়র্কের মাত্র দুজন অ-খ্রিষ্টান মেয়র ছিলেন। তাদের মধ্যে ১০০তম মেয়র ফিওরেলো লাগর্ডিয়া (১৯৩৪-১৯৪৬ পর্যন্ত তিন মেয়াদ) ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন এবং ১০৯তম মেয়র মাইকেল ব্লুমবার্গ (২০০২-২০১৩ পর্যন্ত তিন মেয়াদ) ইহুদি ছিলেন।
যেহেতু নিউইয়র্কের অধিকাংশ মেয়র খ্রিষ্টান ছিলেন, অতএব তারা বাইবেল স্পর্শ করেই শপথ গ্রহণ করেছেন, যদিও শপথে আমেরিকান সংবিধান, সংশ্লিষ্ট স্টেট এবং সিটির সংবিধান সংরক্ষণ ও সমুন্নত রাখার কথা থাকে, কিন্তু শপথ উচ্চারণে ধর্মীয় গ্রন্থ ব্যবহারের কোনো আবশ্যকতা নেই। তা সত্ত্বেও অধিকাংশ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি শপথের ক্ষেত্রে যার যার ধর্মগ্রন্থকে প্রাধান্য দেন। মামদানিও তা করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি তার মুসলিম জাতিসত্তা এবং তার আফ্রিকান বংশোদ্ভূত হওয়ার ঐতিহ্য ও বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি নিউইয়র্ক সিটির জাতিধর্মের বৈচিত্র্যের প্রতি তার শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন। শপথের মধ্য দিয়ে তিনি ১১২তম মেয়র হিসাবে আগামী চার বছরের জন্য সিটিকে পরিচালনার আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। বিগত একশ বছরের মধ্যে জোহরান মামদানি নিউইয়র্ক সিটির সর্বকনিষ্ঠ মেয়র।
একটি মহল এখনো সন্দেহ পোষণ করছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম ও সবচেয়ে জনবহুল নিউইয়র্ক সিটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার করতে গিয়ে তিনি মাঝপথে মুখ থুবড়ে পড়বেন কিনা! কিন্তু তরুণ নেতৃত্বের প্রতি আশাবাদী মানুষের সংখ্যাও কম নয়, যারা মূলত তাকে নির্বাচিত করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন।
সিটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন মেয়রের পবিত্র কুরআন স্পর্শ করে শপথ গ্রহণকে পর্যবেক্ষকরা নিউইয়র্কের রাজনৈতিক আবহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন বলে মনে করছেন। কারণ, সাধারণত যাদের বক্তব্য ও সমস্যার কথা সিটি কাউন্সিলে যথাযথভাবে তুলে ধরা হয় না অথবা আলোচনার পর সাধারণ সিটিবাসীর সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় না, তাদের সমস্যা জানেন এমন একজন ব্যক্তি নিউইয়র্কের মতো সিটির সর্বোচ্চ নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসাবে অধিষ্ঠিত হয়েছেন, যিনি যুগ যুগ ধরে অবহেলিত হয়ে আসা সিটিবাসীর সমস্যাগুলো সম্পর্কে এর আগে সোচ্চার ভূমিকা রেখেছেন।
তরুণ স্টেট অ্যাসেম্বলিম্যান মামদানি গত এক বছরকাল মেয়র পদের জন্য নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়ে রীতিমতো আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন এবং এখন তিনি নিউইয়র্কবাসী এবং ব্যাপক অর্থে আমেরিকানদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে মূর্ত করে তোলার দায়িত্বে ন্যস্ত হয়েছেন। বাংলাদেশি অভিবাসীসহ সিটির সমগ্র অভিবাসী এবং বিশেষ করে এশিয়ানরা তাকে মেয়র নির্বাচিত করার জন্য একজোটে মাঠে অবতীর্ণ হয়ে বিজয়ের সাফল্য ছিনিয়ে এনেছে। এখন তার সামনে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কঠিন পরীক্ষা উপস্থিত।
অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস নতুন মেয়র জোহরান মামদানিকে শপথ পাঠ করানো শেষে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়র হিসাবে অভিনন্দিত করার পর মামদানি শপথের দলিলে স্বাক্ষর করেন, প্রচলিত প্রথার আবশ্যকীয়তা পূরণের জন্য সিটির ক্লার্ক মাইকেল ম্যাকসুইনিকে নগদ ৯ ডলার প্রদান করেন এবং চামড়ায় বাঁধানো বইতে স্বাক্ষর করেন, যাতে ক্লার্ক সিটির নথিতে তার স্বাক্ষরের বৈধতা প্রমাণ করতে পারেন। আনুষ্ঠানিকতার পর মেয়র মামদানি প্রথম দিনেই সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে দুটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন, যার একটি সিটির রেন্ট স্ট্যাবিলাইজড বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্টে যারা বসবাস করেন, সেসব ভাড়াটে কোনো শর্ত ভঙ্গ করলে তাদের উচ্ছেদ করা সংক্রান্ত সদ্য বিদায়ি মেয়র এরিক অ্যাডামস ২০২৪ সালে যে আদেশ দিয়েছিলেন, তা বাতিল করার আদেশ; যা সিটিবাসীর প্রতি তার আবাসন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ বলা যেতে পারে। আবাসন সুবিচারের অংশ হিসাবে তিনি ভাড়াটের অধিকারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। যদিও অসংখ্য ভাড়াটে দীর্ঘকাল ধরে ভাড়া পরিশোধ করছে না, তা সত্ত্বেও নতুন মেয়র তাদের ওপর শুরুতেই খড়গ্হস্ত না হয়ে ভাড়া পরিশোধ না করার কার্যকারণ অনুসন্ধানের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি তার দ্বিতীয় নির্বাহী আদেশে সিটি প্রশাসনে ডেপুটি মেয়রদের কাঠামো নির্ধারণ করেছেন, তার প্রশাসনে শুরু থেকেই গতিশীলতা আনার লক্ষ্যে।
আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণের পর বৃহস্পতিবার দুপুরে কনকনে ঠান্ডার মধ্যে সিটি হলের সামনে মামদানির সমর্থকসহ হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে তাকে শপথবাক্য পাঠ করান ভারমন্টের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স। এ অনুষ্ঠান ছিল মূলত জোহরান মামদানির রাজনৈতিক উত্থান এবং নিউইয়র্কবাসীর প্রতি তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করার জন্য। তার প্রতি উপচে পড়া সমর্থন সত্ত্বেও সমালোচক ও নিন্দুকরা মুখ বন্ধ করে বসে নেই। মামদানির কুরআন স্পর্শ করে শপথের পরিপ্রেক্ষিতে আলাবামা অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান সিনেটর টমি টিউবারভিল তার সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম ‘এক্স’-এ বলেছেন, ‘দুশমন এখন আমাদের একদম গেটে উপস্থিত হয়েছে।’ ডাচ্ বংশোদ্ভূত আমেরিকান কট্টর রাজনীতিবিদ গিরট ওয়াইল্ডার্স বলেছেন, ‘শপথ অবৈধ হয়েছে। কুরআন চলবে না। যুক্তরাষ্ট্র কোনো ইসলামি দেশ নয়। আমেরিকা জেগে ওঠো।’
- ট্যাগ:
- মতামত
- কুরআন
- শপথগ্রহণ
- জোহরান মামদানি