খালেদা জিয়া: ‘লিবার্টি লিডিং দ্য পিপল’
পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি জাতির ইতিহাস পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, জাতিগুলো ভাগ্যের চড়াই-উতরাই পার হয়ে এগিয়ে যায়। কখনো কখনো স্বদেশি রাজনৈতিক তস্কর ও তাদের বিদেশি প্রভুর চরম উৎপীড়নে কোনো কোনো দেশ দুর্ভাগ্যের নিদারুণ শিকার হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীতে ভৌগোলিক স্বাধীনতাপ্রাপ্ত অনেক দেশে মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি সর্বপ্রকারের স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। ওই সকল দেশে স্বৈরাচারের নিষ্ঠুর থাবায় বিশাল জনগোষ্ঠী দিশেহারা হয়ে কখনো কখনো বিদ্রোহ করেছে। মুক্তিকামী গণআন্দোলনের জোয়ারে স্বৈরশাসনের সাময়িক ছেদ ঘটলেও, নিষ্পেষণ আবার জেঁকে বসেছে।
স্বৈরশাহীর বিষাক্ত ছোবলে বাংলাদেশের মানুষ গত শতাব্দীর আশি দশকের শুরু থেকে হতাশায় দিশেহারা। সেই অমানিশার অন্ধকারাচ্ছন্ন দিনগুলোতে সমস্ত দেশ যখন শঙ্কা, ভীতি ও নিরাশার জর্জরিত, তখন আশার আলোকবর্তিকা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবির্ভূত হলেন বেগম খালেদা জিয়া। প্রখ্যাত ফরাসি শিল্পী ইউজিন দেলাক্রোয়ার আঁকা বিখ্যাত ছবি ‘লিবার্টি লিডিং দ্য পিপল’-এর জীবন্ত প্রকাশ দেখেছি তার অগ্নিগর্ভ ভাষণে, উদ্দীপ্ত সংগ্রামী ভূমিকায়। দেলাক্রোয়ার ওই ‘মুক্তিদেবী’র প্রতীকী অর্থ যেন আপসহীন সংগ্রামী নেত্রী খালেদা জিয়া। ইউজিন দেলাক্রোয়া, যার দেহাবশেষ প্যারিসের পেরে লাশেজ সমাধিক্ষেত্রে শায়িত, তার আঁকা ‘লিবার্টি লিডিং দ্য পিপল’, ল্যুভ মিউজিয়াম সংরক্ষিত মাস্টারপিসের নিখুঁত মানবিক প্রতিরূপ দেখতে পেয়ে নিশ্চয়ই আনন্দিত হবেন।
বাংলাদেশের মুক্তিকামী জনতার চিরায়ত বিজয় ধ্বনিত হয়েছে তার কণ্ঠে, যা প্রকাশিত হয়েছে তার রাজনৈতিক জীবনের শুরুতেই। ১৯৮১ সালের শেষার্ধে শহীদ জিয়ার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট আব্দুস সাত্তার বেগম খালেদা জিয়াকে ভাইস প্রেসিডেন্টের পদ গ্রহণের প্রস্তাব দান করেন। বেগম খালেদা জিয়া নম্রভাবে সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন; ওই পদলাভ নির্বাচনের মাধ্যমে নয় বলে তিনি এটি গ্রহণ করেননি (ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ, মার্চ ১০, ১৯৯১)।
বিচারপতি সাত্তার রাজনীতি থেকে অবসর নিলে ১৯৮৪ সালের ১২ জানুয়ারি খালেদা জিয়া হন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন। এরপর ১৯৮৪ সালের ১ মে তিনি হন দলের চেয়ারপারসন হন। এর আগের বছরই তিনি বিচক্ষণতার সঙ্গে সাত দলীয় ঐক্যমোর্চা গঠন করেন এবং এরশাদের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ভীত-সন্ত্রস্ত এরশাদ তাকে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদের প্রলোভন দিয়েছল, কিন্তু গণতন্ত্রের খালেদা জিয়া সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন (ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ, মার্চ ১০, ১৯৯১)। স্বৈরতন্ত্রের সঙ্গে তার কোনো সমঝোতা নেই, সে যত বড় পদই হোক না কেন।
ম্যাডাম খালেদা জিয়া—সেই নক্ষত্র, যিনি দৃঢ় ও স্থির নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশের ধোঁয়াশাচ্ছন্ন রাজনৈতিক অঙ্গনকে পথ দেখাতে পারতেন, তিনি ইন্তেকাল করেছেন; এই নিয়তির দিন ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫। উপনিবেশ-উত্তর দেশের উত্তাল ক্ষমতার লড়াইয়ে এক অকুতোভয় রাজনৈতিক ইউলিসিস, যিনি অনিশ্চয়তা ও বিপদের ঝড়ো সাগর পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশকে পথ দেখাতে পারতেন, তিনি এই নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ করলেন। কিন্তু তার স্মৃতি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের রাজ্যে তার জনগণকে পথ দেখাতে থাকবে।
আজ তার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মনে পড়ছে তার জীবনের খণ্ড খণ্ড কাহিনি। তিনি অন্যদের সঙ্গে নিয়ে ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত বাংলাদেশে এক নির্মম সামরিক শাসকের বিরুদ্ধে আট বছরের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। তার স্বামী জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধ করেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং ১৯৮১ সালে এক ব্যর্থ অভ্যুত্থানে নিহত হন। পরবর্তী দুই বছর (১৯৮১–১৯৮৩) অদক্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিশ্বাসঘাতকতা ও এক স্বৈরশাসনের উত্থান প্রত্যক্ষ করে। ১৯৮৩ সালে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে এবং পরবর্তীতে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে খালেদা জিয়া জনগণের স্বাধীনতার সহজাত প্রবৃত্তিকে পুনরুজ্জীবিত করেন। পরবর্তী আট বছরে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির বিস্তৃত জোট নিয়ে সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে অসহযোগ, অনশন, বয়কট ও শান্তিপূর্ণ নাগরিক অবাধ্যতার আন্দোলন পরিচালনা করেন। এই আট বছরে তাকে তিনবার গ্রেপ্তার করা হয়, তার জীবনের ওপর একবার হামলার অভিযোগ ওঠে এবং গ্রেপ্তার এড়াতে তাকে বহুবার পালাতে হয়। দেশকে গণতন্ত্রে উত্তরণে তার দৃঢ় অঙ্গীকারকে কোনো অত্যাচার থামাতে পারেনি।