‘পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ?’
‘পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ?’-বাক্যটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘কপালকুণ্ডলা’র, যা এ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র কপালকুণ্ডলা নবকুমারকে বলেছিল। এটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত ও প্রভাবশালী উক্তি। নবকুমার যখন গভীর অরণ্যে পথ হারিয়ে ফেলেছিল, তখন কপালকুণ্ডলা তাকে পথ দেখানোর সময় এ বাক্যটি বলেছিল। এটি কেবল একটি আক্ষরিক উক্তিই নয়, বরং প্রতীকী অর্থেও ব্যবহৃত হয়, যা মানুষের জীবনের পথ হারানো বা সঠিক দিকনির্দেশনা খুঁজে না পাওয়ার প্রতীক। এ উক্তি পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যে ও সংস্কৃতিতে একটি সর্বজনীন প্রতীকে পরিণত হয়ে প্রায়ই জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে পথ হারানো বা ভুল পথে চালিত হওয়ার অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বাংলাদেশের নির্বাচন-পূর্ব রাজনৈতিক বাস্তবতায় উক্তিটি স্মরণ করা যেতে পারে এজন্য যে, অনেকের মধ্যেই এখন ভুল পথে পরিচালিত হওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষত, রাজনৈতিক দলগুলো ও অধিকাংশ নেতা জানেন না, তারা যাচ্ছেন কোথায়? জুলাই-পরবর্তী ফ্যাসিবাদবিরোধী আদর্শের রাজনীতির পথ ক্রমশ অমসৃণ হচ্ছে। ত্যাগের স্থান দখল করছে ভোগ, দখলদারি ও দ্রুত ক্ষমতায় অধিষ্ঠানের ক্রমবর্ধমান লড়াই। শেকড় পর্যায়ে, গ্রাম-গঞ্জে রক্ত ঝরছে। শুরু হয়ে গেছে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও শক্তি প্রদর্শন। সুযোগ-সুবিধা পেয়ে অনেকেই দাপট ও দখলের খেলায় মেতেছে। এমনকি, ‘ফ্যাসিবাদ নিজের ঘাড়ে চাপিয়ে না নেওয়ার’ অনুরোধ করেছেন একজন উপদেষ্টা। বলেছেন, ‘মজলুম থেকে জালিম হইয়েন না।’
এসব বিষয় আলোচনার দরকার আছে। কারণ, সামনের নির্বাচন শুধুই একটি ভোটের আয়োজন নয়। বহু বছরের অগণতান্ত্রিকতার পর হাজার তরুণের রক্তে ভেজা গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মহাযজ্ঞ। ফলে দলগুলো কেবল ভোট বা ক্ষমতার দখল নেওয়ার চক্রে আবদ্ধ হয়ে মূল লক্ষ্য বা পথ হারালে তা সহজে মেনে নেওয়া যায় না। বর্তমানে এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, পরিস্থিতি ততই জটিল, অগ্নিগর্ভ ও সংকটময় হচ্ছে এবং আলোচিত কাব্যিক উক্তিটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাপ্রবাহে রাজনৈতিক দল ও নেতাদের আচরণে এমন এক প্রবণতা স্পষ্ট, যা ভুল পথে পরিচালিত হওয়ার আশঙ্কা বহুগুণ বাড়িয়ে তুলছে। মনে হচ্ছে, বহু শক্তিই জানে না, তাদের যাত্রার চূড়ান্ত গন্তব্য শুধু নির্বাচন নয়, দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অর্থবহ, আদর্শিক ও লাগসই সংস্কার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা। আর তা করা সম্ভব দলগুলোর ঐকমত্য ও সম্প্রীতির মাধ্যমে। হতাশার বিষয় হলো, নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে, ঐকমত্য ও সম্প্রীতি ততই ম্লান হচ্ছে এবং রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, বিভেদ ও দূরত্ব বাড়ছে।
তাছাড়া, জুলাই-পরবর্তী পটভূমিতে যে ফ্যাসিবাদবিরোধী ও স্বৈরাচারবিরোধী গণ-আন্দোলন তরুণ প্রজন্মের আত্মত্যাগ, নিষ্ঠা ও প্রাণপ্রদীপে পথ নির্মাণ করেছিল, সেই পথ দিন দিন হয়ে উঠছে অমসৃণ, অস্পষ্ট, সংঘাতময় এবং বিভেদ-আকীর্ণ। আদর্শবাদী-গণতান্ত্রিক-জনমুখী রাজনীতির উচ্চাশা ও রোমান্টিক স্বপ্নের জায়গা দখল করছে ব্যক্তিস্বার্থ, ভোগবাদ, ক্ষমতার প্রতিযোগিতা, দখলদারি ও দ্রুত ক্ষমতায় আরোহণের আকাঙ্ক্ষা। অথচ আদর্শ ব্যতিরেকে ক্ষমতায় আরোহণ যে কত মারাত্মক ফ্যাসিবাদ তৈরি করে, তা অতীতে স্পষ্ট দেখা গেছে। মুখে ও কাগজে-কলমে আদর্শের সাইনবোর্ড দিয়ে সর্বাত্মক লুটপাট ও অনিয়মের যে মহড়া চলেছিল, তাতে রাজনীতি, প্রশাসন, অর্থনীতি, আইনের শাসন, মানবাধিকার ও বাক-ব্যক্তি-সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত হয়েছিল।
পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নজিরবিহীন ব্যাংক লুটপাটের ক্ষত ক্রমেই প্রকট আকার ধারণ করছে। বেশির ভাগ ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় খেলাপি ঋণ দ্রুত বাড়ছে। ফলে প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কমে যাচ্ছে আয়যোগ্য সম্পদের পরিমাণ। সার্বিকভাবে ব্যাংকগুলোর আয়ের প্রবণতাও নিম্নমুখী। বিশেষত খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি ব্যাংক খাতের সব সূচকে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফলে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে এ খাত। বিগত সরকারের সময়ে ব্যাংক খাতে যে অনিয়ম ও লুটপাট হয়েছে, তার নেতিবাচক প্রভাব এখন স্পষ্ট। এ পরিস্থিতির দায় অন্তর্বর্তী সরকারকে বহন করতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর নতুন সরকারকে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। বর্তমান সংকটাপন্ন বাস্তবতা ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য এক ধরনের অশনিসংকেতও বটে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের পক্ষে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে। আর এসব সূচকে অগ্রগতি না হলে কোনো খাতেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না। তাছাড়া ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট তৈরি হলে ঋণ বিতরণ ক্ষমতা কমে আরও গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে।
প্রশ্ন হলো, যারা শুধু ক্ষমতা দখলের স্বপ্নে বিভোর হয়ে কোনোরূপ আদর্শবাদী-ঐক্যবদ্ধ মনোভাব লালন করে না, তাদের পক্ষে অদূরভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া সীমাহীন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা আদৌ কি সম্ভব? ব্যাংক বা আর্থিক খাতের মতো ফ্যাসিবাদের দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত অন্যান্য সেক্টর বা খাতের সীমাহীন সমস্যা মতাদর্শিক ও নীতিগত দৃঢ়তা ছাড়া শুধু ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে সম্পন্ন করা মোটেও সম্ভব হবে না।
মতাদর্শিক ও নীতিগত দৃঢ়তা ছাড়া ঐক্য ও অর্জন যে সম্ভব নয়, তার জ্বলন্ত উদাহরণ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে চারদিকে। ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী উজ্জীবন ও নবগঠনের বদলে নির্বাচনের আগেই শেকড়-স্তরে, গ্রাম-গঞ্জে, ইউনিয়ন-মহল্লায় ত্যাগের জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে আত্মতুষ্টি, লুটপাট, রক্তপাত ও পারস্পরিক বিদ্বেষ। রাজনৈতিক দলে দলে শুরু হয়েছে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, এলাকায় এলাকায় দেখা যাচ্ছে শক্তি প্রদর্শনের রক্তাক্ত প্রতিযোগিতা। যেন কেউই বুঝতে চাইছে না, এ দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পথ কাকে কোথায় নিয়ে যাবে। ফলে এসব বিষয় নিয়ে গভীর আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ সামনের নির্বাচন নিছক একটি ভোটদানের আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি অগণতান্ত্রিকতার বহু বছরের অন্ধকার কাটিয়ে একটি নতুন গণতান্ত্রিক রূপান্তর নির্মাণের ঐতিহাসিক মুহূর্ত। হাজারো তরুণের আত্মদান, সামাজিক প্রতিবাদ, নৈতিক জাগরণ ও গণসচেতনতার শক্তি এ রূপান্তরের ভিত। ভবিষ্যতের ক্ষমতাসীন ও বিরোধী শক্তিগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রয়োজন, যারা রক্তস্নাত স্বপ্নকে বাস্তবের পাটাতনে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম। প্রয়োজন এমন শক্তির, যারা বিভ্রান্তি ও বিভেদের চোরাগলি ছেড়ে মুক্তি ও ঐক্যের মহাসড়ক ধরে সম্মিলিত অভিযাত্রার প্রয়াসী।
এমনই একটি ঐতিহাসিক যুগসন্ধিক্ষণে যদি রাজনৈতিক দলগুলো কেবল ক্ষমতা অর্জন বা দখল নেওয়ার প্রতিযোগিতায় নিমগ্ন হয়ে রক্তপাত ঘটায় এবং জাতীয় স্বার্থের আলোকে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পথ রচনায় ব্যর্থ হয় বা সঠিক পথ হারিয়ে ফেলে, তবে তা কেউই সহজে মেনে নিতে পারবে না। কারণ দলগুলোর ভুল পথচলা মানেই জাতির ভুল পথে যাত্রা। যদি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সেই মহাযজ্ঞে তারা নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থকে বড় করে দেখে, তাহলে এ রূপান্তরের স্বপ্নভঙ্গ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এ ঝুঁকি কাটাতে শীর্ষ নেতৃত্বকে দূরদৃষ্টি ও উদারতার পরিচয় দিতে হবে।
এটাই প্রমাণিত সত্য, রাজনৈতিক সংকট, বিভেদ ও ঝুঁকি নিরসনের দায়িত্ব ও ক্ষমতা রাজনৈতিক নেতৃত্বেরই হাতে। তারাই রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করেন। রাজনীতির দিকনির্দেশনাও পাওয়া যায় তাদের কাছ থেকেই; যার মাধ্যমে মধ্য ও নিম্ন সারির নেতাকর্মীরা প্রণোদিত ও প্রভাবিত হয়। ফলে আসন্ন নির্বাচনের পূর্ববর্তী ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথও একমাত্র রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতেই রয়েছে। শীর্ষ নেতৃত্বকে এখনই প্রমাণ করতে হবে, তারা জাতির দিকনির্দেশক। দলের বাইরেও জাতির স্বার্থের দিকে নজর দেওয়ার মতো দূরদৃষ্টি ও উচ্চ নৈতিকতা তাদের রয়েছে। প্রমাণ করতে হবে, তাদের আছে এমন উদার মনোভাব, যা অহমিকা অতিক্রম করে এবং সম্প্রীতির রাজনৈতিক সংস্কৃতি গঠনে সক্ষম।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বাংলাদেশের নির্বাচন