
চিকিৎসা খাতে ‘ডাবল ফি’: রোগীদের ওপর বাড়তি চাপ
বাংলাদেশে চিকিৎসা খাতকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর মধ্যে একটি হলো চিকিৎসকদের ভিজিট বা পরামর্শ ফি। সম্প্রতি রাজধানীসহ সারা দেশে এই ফি ক্রমাগত বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে রিপোর্ট দেখাতে আবারও ভিজিট নেওয়া প্রসঙ্গে।
দ্বিতীয় এই ভিজিটের পক্ষে নানা যুক্তির পাশাপাশি সমালোচনা আসছে স্বয়ং চিকিৎসক সমাজ থেকেই। তারা বলছেন, সেবার ব্রত নিয়ে পেশায় আসার পর কিছু ব্যক্তি টাকার মেশিনে পরিণত হয়েছেন। তবে চিকিৎসকদের একটি বড় অংশই মনে করেন, ‘আধুনিক চিকিৎসা, সময়, শ্রম এবং পেশাগত মর্যাদার কথা বিবেচনা করলে ফি একেবারেই অযৌক্তিক নয়’।
রোগী ও চিকিৎসকদের মধ্যে এই ‘রিপোর্ট ভিজিট’ ইস্যু এক জটিল দ্বন্দ্বের জন্ম দিয়েছে। রোগীরা মনে করছেন চিকিৎসকরা সেবার নামে ব্যবসা করছেন, আর চিকিৎসকরা বলছেন তারা ন্যায্য পারিশ্রমিক নিচ্ছেন। এই দ্বন্দ্বের বোঝা গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এক রোগের জন্য চিকিৎসা নিতে গিয়ে একজন রোগীকে দুবার ভিজিট দেওয়াকে তারা ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ বলছেন।
স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘রিপোর্ট ভিজিট’ এখন চিকিৎসক সমাজের নৈতিকতা ও স্বাস্থ্য খাতের স্বচ্ছতার জন্য একটি বড় প্রশ্ন। যদি এখনই কোনো নীতিমালা প্রণয়ন না হয়, তবে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যসেবায় আস্থার এই সংকট আরও গভীর হবে।
রাজধানীর স্কয়ার, ল্যাবএইডসহ বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে দেখা গেছে, প্রথমবার ডাক্তার দেখাতে রোগীরা এক থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত ভিজিট দিচ্ছেন। কিন্তু পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে নিয়ে চিকিৎসককে দেখাতে গেলে তাদের আবারও ভিজিট দিতে হচ্ছে কখনও ৪০০–৫০০ টাকা, আবার অনেক ক্ষেত্রে একেবারে প্রথম ভিজিটের সমান টাকা। এতে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে, চিকিৎসক সমাজের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে এবং নীতিনির্ধারকদের দিকেও আঙুল উঠছে।
দ্বিতীয় ভিজিট নিয়ে ক্ষোভ: ব্যবসার পণ্য হচ্ছে রোগী
ঢাকার একটি বেসরকারি টেলিভিশনে কাজ করেন কেফায়েত শাকিল। সম্প্রতি তিনি পরিবারের সদস্যকে নিয়ে বাংলাদেশ ফার্টিলিটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ‘ডাবল ভিজিট’-এর অভিজ্ঞতা লাভ করেন। তিনি জানান, প্রথমবার তিনি এক হাজার টাকা ভিজিট দেন। কিন্তু পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে নিয়ে আবার গেলে তাকে জানানো হয়, আবারও এক হাজার টাকা দিতে হবে।
শাকিল ক্ষোভ প্রকাশ করে ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘প্রথম ভিজিটে তো পুরো চিকিৎসা হয়নি, কেবল টেস্ট করতে দিলেন। রিপোর্ট নিয়ে এলে আবার ফুল ভিজিট চাইলেন। এটি একেবারেই অমানবিক মনে হয়েছে, তাই না দেখিয়েই চলে এলাম।’
শুধু শাকিল নন, পপুলার হাসপাতালে মোহাম্মদপুর থেকে সেবা নিতে আসা মোহাম্মদ হোসেন এবং ল্যাবএইড হাসপাতালে গুলশান থেকে চিকিৎসা নিতে আসা শিক্ষক আজিজুল হকও একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। মোহাম্মদ হোসেন বলেন, ‘আমার মায়ের দীর্ঘমেয়াদি রক্তচাপের সমস্যা রয়েছে। প্রতি মাসে অন্তত দুবার তাকে ডাক্তার দেখাতে হয়। প্রথমবার ভিজিট এক হাজার টাকা, আর রিপোর্ট দেখানোর জন্য আবার ৫০০ টাকা। কখনও কখনও ডাক্তার প্রথম দিন পুরো ইতিহাস না নিয়ে দ্রুত প্রেশার (রক্তচাপ) মেপে রোগীকে ছেড়ে দেন। এরপর রিপোর্ট আসার পরই দ্বিতীয়বার ডাক্তারকে দেখাতে হয়। এটি আমাদের নিয়মিত রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবমিলিয়ে দেখছি, রোগীরা এখন ব্যবসার পণ্য হয়ে উঠেছে।’