নারীর প্রতি সহিংসতা: ছেলেমেয়ের মানুষ হওয়া ও সুস্থ সমাজমানস

প্রথম আলো আবুল মোমেন প্রকাশিত: ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ১৩:২১

মাগুরার শিশুটিকে বাঁচানো যায়নি। তবু এটুকুও তো আমরা বলতে পারছি না যে এই ঘটনার পর শিশু ও নারীর প্রতি এমন পাশবিক নির্যাতনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না।


আইন ও সালিশ কেন্দ্রের গবেষণার ভিত্তিতে গত ১০ বছরে দেশে অন্তত ৫ হাজার ৬০০ শিশু ধর্ষণের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এর বাইরে নারীর প্রতি সহিংসতা তো রয়েছেই। রয়েছে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে ‘নিষ্পত্তি’ করে কার্যত ধামাচাপা দেওয়া। মাগুরার ঘটনার প্রতিবাদে এবং ধর্ষকদের বিচার-শাস্তির দাবিতে চলমান আন্দোলনের মধ্যেই আরও অন্তত এক ডজন শিশুসহ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। সমাজে বিকৃত মানসিকতার বিস্তার এতটাই যে শুধু প্রতিবাদে, বিচারে, শাস্তিতে এই অপরাধ বন্ধ হচ্ছে না।


এ ধরনের কোনো কোনো ঘটনার পরে অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার, বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির জোরালো দাবি ওঠে। কিন্তু কেবল এটুকুতে যে নারী নিগ্রহের অবসান হবে না, তা বোঝা এখন জরুরি। সংকটের স্বরূপ বোঝার জন্য সমাজের, বিশেষভাবে সমাজমানসেরও সংকট বোঝা দরকার। বিকৃত মানসিকতার বিস্তার কেন এবং শিশুর সুস্থ মানসিকতা নিয়ে বড় হওয়ার সংকট কোথায়, তা না জানলে মনে হয় না এ রকম অপরাধের রাশ টানা যাবে।


চলমান ধর্ষণ ও নারীর প্রতি সহিংসতার পটভূমিতে এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো সমাজে শিশু থেকে তরুণ এবং প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ কোন মানসিকতায় বড় হচ্ছে, তা বোঝার চেষ্টা করা। এই সমাজমানসের ওপরই নির্ভর করে নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাব। শিশুর শরীরে যখন যৌনশক্তির বিকাশ ঘটতে থাকে, তখনকার অভিজ্ঞতা বালকদের শরীর-মনে ভয়-আশঙ্কা, শিহরণ-কৌতূহল ইত্যাদি মিলিয়ে অস্থিরতার জন্ম দেয়। কিন্তু তা আমাদের সমাজের বয়োজ্যেষ্ঠদের যথাযথ সংবেদনশীল সহযোগিতা পায় না। ভবিষ্যতের পুরুষবাদী (আদতে হালকা থেকে জোরালো নারীবিদ্বেষী), ধর্ষকামী এবং পরিণতিতে ধর্ষকের উত্থান ঠেকাতে হলে শৈশব থেকেই ছেলেমেয়েদের এমন পরিবেশে বড় হতে হবে, যাতে তারা একে অপরের গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্য জেনেই পরস্পরকে চেনে।


ফলে শিশুর মানস গঠনের শক্তিশালী ক্ষেত্র শিক্ষার প্রসঙ্গে আসতে হয়। মুখস্থবিদ্যা কিংবা অন্ধপ্রথা পালনে বয়ঃসন্ধিকালের শিশুর সংকটের সমাধান নেই। নীতিকথা বা উপদেশ এ ক্ষেত্রে তেমন সফল হবে না। শিশুরা সবচেয়ে ভালো শেখে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। একসঙ্গে দেয়ালপত্রিকা, পিকনিক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, চিত্রাঙ্কন, শ্রেণিকক্ষ ও স্কুল ভবন সাজানো, খেলাধুলা (একটা বয়সের পর ছেলেমেয়েরা আলাদা খেলবে), অভিযান, বই পড়া ইত্যাদি কাজ করতে করতে তারা সহজ সম্পর্কের মধ্যে বড় হবে। তখন একটি ছেলে কোনো মেয়েকে চিনবে ভালো গায়িকা, আঁকিয়ে, মেধাবী, গণিতে পারদর্শী ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে।



এভাবে শিক্ষার সঙ্গে জীবনকে সুন্দর, শালীন ও আনন্দময় করার পাঠ নেওয়া সম্ভব। আর তাই শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতিচর্চার সম্পর্ক থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মেয়েদেরও যেন আত্মবিশ্বাস বাড়ে, সহজভাবে কারও সঙ্গে মিশতে পারে, ছেলে সহপাঠী বা বন্ধুর স্বাভাবিকের চেয়ে বাড়তি কোনো আচরণ সামলানোর সক্ষমতা তৈরি হয়, সেটিও বড়দের দেখতে হবে। আদতে ছেলেমেয়ে উভয়েরই আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদার বোধ, রুচিবোধ, শৃঙ্খলাবোধ ও নিয়মানুবর্তিতা এবং সেই সঙ্গে মানবিক গুণাবলির যেন বিকাশ ঘটে, তা দেখা জরুরি। দুর্ভাগ্যের বিষয় যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাড়ি বা সমাজ এ ক্ষেত্রে কার্যত কোনো ভূমিকাই পালন করছে না। আর এ কারণেই কিশোর অপরাধের মাত্রা বাড়ছে। বেশির ভাগ কিশোর বিশুদ্ধ পুংগোষ্ঠী নিয়েই চলে এবং তাদের আচরণে ও অপরাধে নারীর নিস্তার মিলছে না।


সমাজমানস গঠনে ধর্মীয় নেতারা প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেন। তাঁরা সবাই একই রকম ভাবনার মানুষ নন। তাঁদের কেউ কেউ কখনো কখনো নারী-পুরুষের সম্পর্ক এবং নারীর আকর্ষণ বিষয়ে এমন সব কথা বলেন, যা কিশোর-তরুণদের যৌনচেতনাকে একতরফা উজ্জীবিত করে। ছোটবেলা থেকেই ছেলেরা এমন বক্তব্য শুনতে শুনতে নারীকে যৌন চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে ফেলে। শিশুমনে এর প্রভাব যে কত সুদূরপ্রসারী এবং সমাজের জন্য কী ভয়ানক ফলাফল বয়ে আনতে পারে, তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ভাবেন না।


৫০ বছর ধরে চলে আসা সংকীর্ণ দলীয় চিন্তার ক্ষমতাকে ঘিরেই আবর্তিত রাজনীতি সমাজকে বিভাজিত করেছে। মানুষের চিন্তার জগৎও হয়েছে সংকীর্ণ। রাজনীতিতে আপস ও সুবিধাবাদের গুরুত্ব বেড়েছে এবং নীতিনৈতিকতা বাদ পড়েছে। পরমতসহিষ্ণুতা, সব মতের অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা এবং নিজের পরাজয় ও অপরের (প্রতিপক্ষ) বিজয় মানার মনোভাব নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মাথা ঘামাননি। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘৃণা, প্রতিশোধের মতো নেতিবাচক মনোভাব বেড়েছে। এর প্রভাবে রাজনীতিতে কালোটাকা, পেশিশক্তি ও অস্ত্রের ব্যবহার অনিবার্য হয়ে উঠেছে। এ রকম বিভাজিত, উত্তেজক ও অনিশ্চয়তায় ভরা পরিবেশকে নারীবান্ধব বলা যাবে না কিছুতেই।


বিস্ময়ের সঙ্গে আমরা লক্ষ করছি যে সেই সব নারীই এই রাজনীতিতে সফল, যাঁরা দুর্নীতিগ্রস্ত এবং অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। এদিকে দেশে এমন দলও আছে, যারা নারী নেতৃত্ব মানে না। আবার সব দলেই নারীর নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ এখনো প্রত্যাশিত স্তরের অনেক নিচে রয়েছে। নবগঠিত দল এনসিপি সম্পর্কে এখনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে এটুকু বলা যায় যে আজ পর্যন্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে অনিশ্চয়তার মেঘ কাটেনি এবং ঘৃণা-প্রতিহিংসার বুলিও থামেনি, যা রাজনীতিতে নারীর স্বাভাবিক ও ব্যাপক অংশগ্রহণের অনুকূল নয়।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও