
ব্যাংক লুটের রাজনীতি
বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা পর্যালোচনার জন্য শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি কর্তৃক স্বৈরশাসক হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরে ২৮ উপায়ে দুর্নীতি ও লুটপাটতন্ত্রের মাধ্যমে প্রতিবছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার হিসাবে আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে পাচার হওয়ার তথ্য প্রকাশের বিষয়টি সবার জানা। এটিও জানা, সবচেয়ে বেশি লুণ্ঠনের শিকার হয় ব্যাংকিং ও ফিন্যান্সিয়াল খাত, তারপর জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত, তারপর ভৌত অবকাঠামো ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং, ভারত ও কয়েকটি ‘ট্যাক্স হেভেন’ দেশ সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচারের সুবিধাভোগী হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। তবে বিদেশে পাচার হওয়া ২৩৪ বিলিয়ন ডলার আদৌ দেশে ফেরত আনা যাবে কিনা, সে বিষয়ে রয়েছে দোলাচল।
ব্যাংক লুটের রাজনীতি কতটুকু সর্বগ্রাসী হয়েছিল, তার একটি প্রমাণ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম। তার মতে, পতিত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে সবচেয়ে বেশি লুণ্ঠনের শিকার হয়েছিল ব্যাংকিং খাত, যার কারণে ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ১১টি দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল। দেশে ৬১টি ব্যাংকের প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও হাসিনার খামখেয়ালি সিদ্ধান্তে তার আত্মীয়স্বজন, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও অলিগার্ক ব্যবসায়ী এবং ‘রবার ব্যারনে’ পরিণত হওয়া লুটেরাদের পুঁজি লুণ্ঠনের অবিশ্বাস্য সুযোগ করে দেওয়ার জন্য এতগুলো ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বারবার আপত্তি জানানো সত্ত্বেও এমন খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত থেকে হাসিনাকে নিবৃত্ত করা যায়নি।
ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় আওয়ামী লীগ আমলে বেক্সিমকো, এস আলম গ্রুপ ব্যাংক লুটের নেতৃত্ব দেয়। লুটপাটকবলিত ১১টি ব্যাংকের মধ্যে চট্টগ্রামের ব্যাংক লুটেরা এস আলম কর্তৃক লুণ্ঠিত সাতটি ব্যাংক হলো-ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, এসআইবিএল, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, কমার্স ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক। উল্লেখ্য, এস আলম তার নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংকগুলো থেকে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা লুটে নিয়ে বিদেশে পাচার করে দিয়েছেন। পতিত সরকারের ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী লুটে নিয়েছেন ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংককে। পতিত হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন ব্যাংকে অনাদায়ী ঋণ ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি।
বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনে ব্যাংক লুটের রাজনীতি ছিল ওপেন সিক্রেট, যে রাজনীতিতে ছিল দুর্বৃত্তায়ন ও শক্তি প্রয়োগ। সরকারি প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক চাপ ও ক্ষমতার শক্তিতে বশীভূত করে দিনদুপুরে লুট করা হয়েছে মানুষের আমানত ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের রীতিমতো জিম্মি করার তথ্যও পরবর্তীকালে সামনে এসেছে।
হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিক আমলে ব্যাংক লুটের রাজনীতি চরম আকার ধারণ করে সম্পদ ও অর্থ লুটের অবাধ বিস্তার ঘটালেও ব্যাংক ব্যবস্থার সঙ্গে রাজনীতি অঙ্গাঙ্গি জড়িত। শীর্ষতম লুটেরাগোষ্ঠী চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপ হাসিনার পেয়ারের লোক হয়ে ব্যাংক লুটের নেতৃত্ব দিলেও গ্রুপের উত্থানের পেছনে জামায়াতে ইসলামীর পৃষ্ঠপোষকতার তথ্য রয়েছে। জামায়াত ও ইসলামী ব্যাংকের ছত্রছায়ায় এস আলম গ্রুপ পুষ্ট হয়েছিল। আওয়ামী আমলে ইসলামী ব্যাংকের জামায়াতসংশ্লিষ্ট পরিচালকরা এস আলম গ্রুপকে সামনে রেখে নেপথ্যে থেকে কলকাঠি নাড়াতে চেয়েছিল। কিন্তু গ্রুপটি নিজেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে শুধু ইসলামী ব্যাংকই নয়, দেশের পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাকেই গিলে খেতে উদ্যত হয়েছিল। ব্যাংক লুটের রাজনীতির হাত কত লম্বা তারও প্রমাণ আছে। স্বৈরাচারের পতনের পর এস আলম গ্রুপকে রক্ষা করতে স্থানীয় বিএনপি কোনো কোনো কেন্দ্রীয় নেতার আগ্রহে মাঠে নেমেছিল। এর অর্থ হলো, বাংলাদেশের তিন রাজনৈতিক শক্তি এস আলমের পেছনে নানা সময়ে শক্তি জুগিয়েছে। রাজনৈতিক শক্তিগুলো যদি ব্যাংক লুটেরাদের পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মদদকারী হয়, তাহলে পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনার আশা সুদূরপরাহত হতে বাধ্য।
- ট্যাগ:
- মতামত
- দুর্নীতি
- লুটপাট
- ব্যাংক খাত