
কথিত ৭৩০ কোটি টাকা রেমিট্যান্সে কী কী ‘অনিয়ম’ থাকতে পারে
অর্থনীতির বিষয়গুলো আমি খুব ভালো বুঝি না। বুঝতে চাইলেও অনেক সময় ঠিকমতো বোঝা হয়ে ওঠে না। তাই বলে আমি যে অর্থনীতি বুঝতে চেষ্টা করি না তা নয়। এইতো ১৬ মার্চ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান আগারগাঁওয়ে রাজস্ব ভবনে এক মতবিনিময় সভায় জানালেন, রেমিট্যান্সের নামে এক ব্যক্তি ৭৩০ কোটি দেশে এনেছেন। শিরোনামটা পড়ে আমার খুব ভালো লাগল, আমি বুঝতে চেষ্টা করলাম।
আমাদের দেশ এখন দারুণ অর্থনৈতিক দুর্দশায়। বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে ব্যাংকগুলোকে সচল রাখছে। প্রবাসীদের রেমিট্যান্স ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে বিদেশি মুদ্রার আয় দিন দিন কমছে। বিদেশিরা ডলার নিয়ে আসছে না আমাদের দেশে লগ্নি করতে। এইসময় বিদেশ থেকে ৭৩০ কোটি সমান বৈদেশিক মুদ্রা আসা দেশের জন্য দারুণ সুখবর, যেন হঠাৎ লটারি পাওয়ার মতো।
খবরটা পুরা পড়লাম। মনে হলো এনবিআর চেয়ারম্যান টাকাটা পেয়ে খুশি নন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা আইন করলাম যে, আমাদের প্রবাসী ভাইয়েরা যারা কঠোর পরিশ্রম করে বিদেশ থেকে টাকা উপার্জন করে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বাংলাদেশে নিয়ে আসে, তাদের ক্ষেত্রে আমরা বললাম, তাদের এই আয়টা ট্যাক্স ফ্রি হবে বাংলাদেশে।...কিন্তু আইনকানুনের ব্যত্যয় করে কর ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে।’
রেমিট্যান্সের নামে এক ব্যক্তির এত বিপুল অর্থ আনার ক্ষেত্রে নিয়মের ব্যত্যয় হয়েছে বলে মনে করছেন এনবিআর চেয়ারম্যান। কিন্তু কোথায় নিয়মের ব্যত্যয় হয়েছে, তা তিনি খুলে বলেননি। এখানে উল্লেখ্য যে রেমিট্যান্স হিসেবে এই পরিমান অর্থ এসেছে গত ৯/১০ বছরে।
আমার থেকে পুরো ব্যাপারটা খুব ঘোলাটে মনে হলো। আর এনবিআর চেয়ারম্যান এই ঘটনাটা এত ঘটা করে বলার প্রয়োজনই বা কী ছিল? তিনি কি প্রবাসীদের সাবধান করে দিচ্ছেন-খবরদার, এত টাকা পাঠাবেন না। নিশ্চয় ঘাপলা আছে। আপনি বাঙালি মানুষ, বিদেশে এত টাকা পেলেন কোথায়?
জানি না এটাতে কী ঘাপলা আছে? চেয়ারম্যান সাহেবও খোলাসা করে বলেননি কিছু। কিন্তু যাদের কোনো ঘাপলা নেই, চেয়ারম্যানের কথা শুনে তারা কি গুটিয়ে যাবেন না? কী দরকার নিজের টাকা নিয়ে এত কথা শোনার বা এত ঝামেলা সাইবার। এখন অনেক বাংলাদেশি বিদেশে অনেক বড় বড় ব্যবসা করেন। যেদিন এনবিআর চেয়ারম্যান এই সব নিয়ে কথা বলছিলেন, তার দুই দিন আগেই প্রথম আলোর একটা শিরোনাম ছিল, ‘বাংলাদেশের রবিন যেভাবে অস্ট্রেলিয়ার ধনকুবের’। জনাব রবিন যদি বাংলাদেশে বড় অঙ্কের একটা টাকা পাঠাতে চান, এই খবর পড়ার পর তার কী প্রতিক্রিয়া হবে?
পশ্চিমা দেশগুলোতে যারা ব্যাংকিং করেন তারা জানেন, সেখানে ব্যাংকিং খাতে লেনদেনে বড় ছোট অনেক জোচ্চুরি হয়। হারিয়ে যাওয়া ক্রেডিট কার্ডের অপব্যবহার, অবৈধভাবে অন্যের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তোলা, অবৈধ ওয়্যার ট্রান্সফার এই সব লেগেই আছে।
সারা বিশ্বে ২০২৪ সালে ব্যাংকিং জালিয়াতিতে ৪৫ বিলিয়ন ডলার ব্যাংকগুলোকে গচ্চা দিতে হয়েছে। বিদেশে ব্যাংকগুলো গচ্চা যাওয়া টাকাকড়ি নিয়ে খুব উচ্চবাচ্য করে না কখনো, যাতে করে ব্যাংকিংয়ের ওপর গ্রাহকদের বিশ্বাস উঠে যেতে পারে। এই সব নিয়ম অনিয়ম নিয়ে সরকার বা ব্যাংকগুলি চুপি চুপি সামাল দেয়, মুখে রা শব্দও বের করে না। গ্রাহকেরা নিশ্চিন্তে ব্যাংকগুলোতে টাকা পয়সা জমা রাখেন। গ্রাহকেরা বিশ্বাস রাখে ব্যাংকগুলোতে টাকা রাখতে বা লেনদেন করতে তাদেরকে সমস্যা বা ক্ষতি পোহাতে হবে না। এই বিশ্বাসটা জরুরি যে নিজের টাকা নিয়ে কোনো অর্থনৈতিক সংস্থা তাদেরকে হেনস্তা করবে না। অবৈধ যেকোনো ব্যাপার হলে, তা আইন শৃঙ্খলা বাহিনী দেখবে।