বাংলাদেশের কৃষিখাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হলো হর্টিকালচার (Horticulture), যা ফল, সবজি, ফুল, মসলা ও ওষধি গাছের চাষ অন্তর্ভুক্ত করে। উর্বর মাটি, অনুকূল জলবায়ু এবং ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তিগত উন্নতির কারণে বাংলাদেশে হর্টিকালচার ফসলের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
হর্টিকালচার ক্রপ (Horticulture Crop) বলতে সেইসব ফসলকে বোঝায়, যা উদ্যানবিদ্যা (Horticulture) বা উদ্যানচাষের (Garden Cultivation) আওতাভুক্ত। এসব ফসল সাধারণত ফলফলাদি, সবজি (খাদ্য) সৌন্দর্যবর্ধন, মসলা ও ঔষধি গুণের ফসল চাষ করা বোঝায়। সাধারণ ভাষায় একে হাইভ্যালু ক্রপও বলা হয়।
হর্টিকালচার ফসল কেবল কৃষি ক্ষেত্রেই নয়, খাদ্য, স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এর চাষ বৃদ্ধি পেলে কৃষকদের আয় বাড়বে, পুষ্টির ঘাটতি কমবে এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকবে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ফলের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় রপ্তানির সম্ভাবনাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি মেট্রিক টনের বেশি ফল উৎপাদিত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১০০-১৫০ কোটি টাকার ফল ও সবজি রপ্তানি করা হয়। আম, কাঁঠাল, লিচু, মাল্টা, পেঁপে, আনারস, ড্রাগন, স্ট্রবেরিসহ অসংখ্য ফল, সবজি, ফুল এবং মসলা যা দেশে উৎপাদিত হচ্ছে এবং বিদেশি রপ্তানি হচ্ছে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের যেসব ফল, সবজি রপ্তানি হয় তার পরিমাণ এবং পরিসর আরও বাড়ানো সম্ভব। বাংলাদেশে প্রচুর হর্টিকালচার ফসল উৎপাদিত হয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আম।
কথাসাহিত্যে অসংখ্যবার আম-কাঁঠালের কথা উল্লেখ রয়েছে। এর কারণ হলো আম বা কাঁঠালের ফলন বেশি দেখে তা সাহিত্যেও স্থান পেয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, সাতক্ষীরা, মেহেরপুর, সাপাহার এবং দিনাজপুরে ব্যাপকভাবে আম উৎপাদিত হয়। বছরে প্রায় ২৫-৩০ লাখ মেট্রিক টন আমের ফলন হয়। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে আম রপ্তানি হয়।
কাঁঠাল জাতীয় ফল হিসেবে পরিচিত এবং প্রায় সব জেলাতেই পাওয়া যায়। নরসিংদী, টাঙ্গাইল, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রামে কাঁঠালের ফলন ভালো। বছরে ১৫-১৮ লাখ মেট্রিক টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়। স্থানীয়ভাবে খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি, প্যাকেটজাত কাঁঠালের চাহিদা বাড়ছে।
আম-কাঁঠালের পরেই অবস্থান কলার। নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ, বগুড়া, ময়মনসিংহ, যশোর ও কুমিল্লায় ব্যাপকভাবে কলার চাষ হয়। বছরে ১২-১৫ লাখ মেট্রিক টন কলা উৎপাদিত হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কলা রপ্তানি হয়।
গ্রীষ্মের মধু ফলের মধ্যে অন্যতম হলো লিচু। লিচু দিনাজপুর, রাজশাহী, পাবনা, মেহেরপুর ও কুষ্টিয়াতে প্রধানত চাষ হয়। বছরে ১.৫-২ লাখ মেট্রিক টন লিচু উৎপাদিত হয়। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি লিচুর চাহিদা বেশি।
আরেক রসালো ফল হলো কমলা ও মাল্টা। পার্বত্য চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার, সিলেটে ও চুয়াডাঙ্গা তা বেশি উৎপাদিত হয়। বছরে ১.৫-২ লাখ মেট্রিক টন কমলা ও মাল্টা উৎপাদিত হয়। কমলা ও মাল্টার রপ্তানি ফল হলেও ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি ফলের চাহিদা রয়েছে। এছাড়া পেঁপে, আনারস, তরমুজ, বরইসহ অসংখ্য ফলের চাহিদা দেশে এবং বিদেশে প্রচুর রয়েছে।