এখন দরকার বিভিন্ন স্তরে সংস্কার
১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনটিকে আজ অবধি সেরা নির্বাচন বলে মান্যতা দেওয়া হয়-আওয়ামী লীগ সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ তুললেও সেই সূক্ষ্ম কারচুপির পূর্ণ চিত্র কখনোই জনসম্মুখে নিয়ে আসেনি।
এরপর ১৯৯৬, ২০০১-পরপর দুটি নির্বাচনের ব্যাপারে হেরে যাওয়া পক্ষের কিছু ওজর-আপত্তি থাকলেও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। ২০০৯ সালের নির্বাচন নিয়ে ওজর-আপত্তি একটু বেশি উত্থাপিত হলেও বিরোধী শিবির মেনে নিয়েছিল। এই চারটি নির্বাচনই ছিল নির্দলীয় কেয়ারটেকারের অধীনে। অর্থাৎ একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসীন থেকে নির্বাচন করতে পারেনি।
এ নির্বাচনের চারটিতেই নিকটতম অতীতের সরকার জয়লাভ করেনি। অর্থাৎ ক্ষমতায় অবস্থান করে নির্বাচনের সুযোগ পায়নি এবং চারবারই সম্প্রতি-গত ক্ষমতাসীনদের হারতে হয়েছে। ফলে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের স্বৈরাচার হওয়ার সুযোগ ছিল না। কেয়ারটেকার বাতিলের পরবর্তী তিনটি নির্বাচনের দিকে এবার একটু তাকান।

আওয়ামী লীগ যেভাবেই ব্যাখ্যা করুক না কেন, দলহীন লোকদের চোখে কী দেখা গেছে? ২০১৩-তে একটি মহা-প্রহসন, ২০১৮-তে লাইলাতুল ইলেকশন এবং ২০২৪-এ এক মহাকাব্যিক (!) নির্বাচন-ডামি প্রার্থীর নির্বাচন। কেন এমন হলো? সরকারকে ক্ষমতার চেয়ার ছেড়ে নির্বাচন করতে হয়নি এবং সরকারে আসীন থাকার কারণে রাষ্ট্র ও সরকারের সব হাতকে ব্যবহার করে ভোটে যাবতীয় ইঞ্জিনিয়ারিং করতে বিন্দুমাত্র বেগ পেতে হয়নি। এতে কার্যত জনভোটের দরকারই পড়েনি।
যে দেশের রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসীন হলে সেটাকে আঁকড়ে থাকার জন্য জীবন বিসর্জন দিতে কার্পণ্য করে না, সেদেশে একটি রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় বসিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন আহাম্মকের কল্পনা বৈ কিছু নয়। ১৯৯১ সালে জিতে বিএনপি ভেবে বসেছিল, ক্ষমতায় বসেই নির্বাচনি বৈতরণী পার হবে, সেটা বুঝতে পেরেই শুরু হয় কেয়ারটেকারের আন্দোলন।
সেই আন্দোলন নিয়ে বিস্তারে যাওয়ার দরকার নেই। কিন্তু এতকিছু করে কেয়ারটেকার পাওয়ার পর সেটাকে আবার কবরে পাঠাল সেই আওয়ামী লীগই। আদালতের ঘাড়ে দোষও দেওয়া হলো, তবে সেই যুক্তি বাচ্চাসুলভ। আবার সেই সময়ের প্রধান বিচারপতিরও দায় আছে। মূলত দেশের সরকার সেই থেকেই স্বৈরাচার হয়ে উঠতে শুরু করল। কেয়ারটেকার ব্যবস্থা চালু থাকলে পাঁচ বছর পরপর ক্ষমতায় যেতে জনভোটের দিকেই ফিরতেই হতো-আর যাইই হোক, জনভোটের কথা মাথায় রেখে পাঁচ বছরে স্বৈরাচার হওয়ার সুযোগ ঘটত না।
কোটা আন্দোলনই শেখ হাসিনা সরকারের পতনের একমাত্র কারণ নয়। কোটার সঙ্গে আরও যারা মাঠে নেমেছে তাদের নানা ক্ষোভ ছিল। রাস্তায় নেমে এসেছে শিক্ষক-অভিভাবক-জনসাধারণ। যুক্ত হয়েছে জামায়াত-বিএনপির ছাত্র সংগঠনও; তাদেরও চাকরি চাই, ফলে কোটার আন্দোলনে তাদের অংশগ্রহণে দোষের কিছু ছিল না। দোষের হচ্ছে যদি তারা ভাঙচুর-ধ্বংসযজ্ঞের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়। এরপর যুক্ত হয়েছে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি। কার্যত, কোটার দাবি পূরণ হওয়ার পরও কেন সরকার পতনের আন্দোলন শুরু হলো? সরকার কেন এ আন্দোলন গোড়াতেই সামলাতে পারেনি, এ নিয়ে আলোচনা চলতে থাকবে আরও অনেকদিন।
মোদ্দা কথা, ছাত্র ও সাধারণ মানুষের নাড়ি বোঝার চেষ্টা করেনি সরকার। বুঝতে পারেনি এ প্রজন্মকে। একটি প্রজন্মকে অনুধাবন করতে না পারায় নানা সমস্যা হতেই পারে। তাচ্ছিল্য, নয়তো হালকা করে দেখা হয়েছে এ আন্দোলনকে, ছিল শক্তির দম্ভ এবং ক্ষমতার অহং। সরকার অনুমান করতে পারেনি আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি, বোঝার চেষ্টা করেনি মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ।