ছাত্রলীগ বশীকরণ ফর্মুলা : সংস্কার করে ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার সম্ভব

যুগান্তর মাহবুব কামাল প্রকাশিত: ০৪ আগস্ট ২০২৪, ০৯:৪৯

ঘটিতব্য কোনোকিছু সম্পর্কে আগাম বুঝতে না পারলে তাকে ‘অবুঝ’ বলে রেহাই দেওয়া যায়। কিন্তু ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর যদি তিনি আগে কী বলেছেন, তা অস্বীকার করেন বা তর্ক জুড়ে দেন, সেক্ষেত্রে তিনি স্পষ্টতই শঠ। হ্যাঁ, কোটা সংস্কার আন্দোলন এতটা তীব্র আকার ধারণ করবে, আমি বুঝতে পারিনি। আন্দোলন শুরু হওয়ার দুদিন পর বন্ধু শাহ কামালকে বলেছিলাম, দেখবেন শিগ্গির ছাত্রলীগ মাঠে নামবে এবং এরপর আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যাবে।


দুদিন পর ছাত্রলীগ নেমেওছিল; কিন্তু আন্দোলন নিস্তেজ হয়নি, বরং আরও গতি পেয়েছে। আসলে দুটো মিসিং লিংক ছিল। প্রথমত, মাথায় আসেনি যে আন্দোলনটা শিক্ষার্থীদের চাকরি অর্থাৎ রুটি-রুজির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। কোনো ক্ষেত্রে রুটি-রুজির ব্যাপার থাকলে মানুষ বাধা পেলে জীবনটাও দিতে প্রস্তুত থাকে; কারণ রুটি নেই, তো জীবনও নেই। দ্বিতীয়ত, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে লোকসংখ্যার একটি অছাত্র বিধ্বংসী অংশ যে যুক্ত হয়ে পড়বে, সেটাও আগে থেকে বোঝা যায়নি। এ দুই মিসিং লিংকের কারণেই উপরের মন্তব্যটি করেছিলাম। আমাকে বন্ধুরা বুদ্ধিমান মনে করে। ছাই! শিক্ষার্থীদের আন্দোলনটাকে স্কয়ারলি দেখতে পারলাম না, অথচ আমি নাকি বুদ্ধিমান!


আমরা সাংবাদিকরা যেসব শব্দ বেশি লিখে থাকি, সেগুলোর একটি জানমাল। হ্যাঁ, জানমালের ক্ষতির যে বিশাল ক্যানভাস, তাকাতে গেলে চোখ বিদ্রোহ করে বলে, ওদিকে তাকিয়ো না। মালের কথা ওঠাব না, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীই বলে দিয়েছেন, স্থাপনার ক্ষতিগুলো মেরামত করা যাবে; কিন্তু মৃত্যুর যে ক্ষত, তা সারানো যাবে না। অতঃপর জানের কথাই বলি। এই বেদনার বিউগল কে বাজাতে পারে? একটা জীবনের পেছনে থাকে কত রহস্য, কত খেসারত; অথচ কত সহজেই না সেই রহস্যের যবনিকাপাত হলো, খেসারতের কোনো মূল্য পাওয়ার আগেই নিহতরা বিদায় জানাল জীবিতদের। ইউরোপের অনেক দেশে একটা বিড়ালও গাড়িচাপা পড়লে ড্রাইভারকে কঠিন জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়। বাঙালি মানবসন্তানরা কি বিড়ালেরও অধম? এ পর্যায়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করব, তিনি যেন সেই বিখ্যাত গান ‘কোনো কারণেই ফেরানো গেল না তারে’র মতো কোনো কারণেই তার কথা থেকে ফিরে না আসেন। অন্তত যেসব মৃত্যু সহজেই এড়ানো যেত, সেসব মৃত্যুর পেছনে দায়ীদের চেহারা দেখতে চায় জাতি।


শিরোনাম বলছে, আমাদের আজকের প্রসঙ্গ ছাত্রলীগ। কত সহজেই বলে দেই দেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও সর্বাপেক্ষা বড় ছাত্র সংগঠন! অথচ এই সংগঠনেরই নেতাকর্মীদের তাড়িয়ে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোয় তাদের কক্ষে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ঢাললো ক্রোধের আগুন! নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এই মুহূর্তে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে কোটা সংস্কার আন্দোলনের যে কোনো একজন হবেন ভিপি, আরেকজন জিএস। নুরুও একই প্রক্রিয়ায় হয়েছিলেন ভিপি। ছাত্রলীগের জামানত বলে কিছু থাকবে না। তোফায়েল, আসম রব, মাখনের উত্তরসূরিদের এই হাল? সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো, দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর রক্তচক্ষুর যে অভিভাবকত্ব করেছে তারা, তারই অনিবার্য ফল এটা। আমার এক বন্ধুর বাবা একটা মজার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন। তার বাসার কাজের ছেলেটি ছিল স্বভাবে খুবই নিরীহ প্রকৃতির। গালাগাল, এমনকি চড়-থাপ্পড়ও হজম করত। তো তিনি মানবচরিত্র বোঝার জন্য ঠিক করলেন, কাজের ছেলেটিকে বিদ্রোহী করে তোলা যায় কিনা, সেই চেষ্টা করবেন। এরপর কারণে-অকারণে প্রতিদিনই তিনি তাকে গালাগাল-মারপিট করতে লাগলেন। ঠিকই এক পর্যায়ে সেই কাজের ছেলে মাথা ঝাঁকিয়ে বলে উঠল, আপনি পাইছেন কী? যান, আর আপনার কাম করুম না। আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে কতবার যে লিখে, টেলিভিশনে কথা বলে অনুরোধ করেছি-ছাত্রলীগকে সামলান। তিনি যে একেবারেই চেষ্টা করেননি, তা বলা যাবে না। কিন্তু যত ডিগ্রি তাপ দিলে পানি বাষ্প হয়, তত ডিগ্রিতে ওঠেননি তিনি। কারণটা সম্ভবত এমন যে, তিনি হয়তো ভেবেছেন, ছাত্রলীগের প্রতি কঠোর হওয়া মানে সংগঠনটির শক্তি ক্ষয় হওয়া; সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ, প্রকারান্তরে সরকারও দুর্বল হয়ে পড়া। এই চিন্তা বা যুক্তির ফ্যালাসিটা হলো, নিজের লোক যদি অন্যায় করে, তাকে শাস্তি দিলে বরং সরকার শক্তিশালীই হয় আর তাকে প্রশ্রয় দিলে হয় দুর্বল। একটা উদাহরণ দিই। ধরা যাক, কোনো এক জেলায় সরকারি কিছু পদে লোক নেওয়া হবে। দলীয়করণের ভিত্তিতে সব পদেই নিয়োগ দেওয়া হলো এই ভেবে যে, তাতে দলের সমর্থন ও শক্তি বাড়বে। ফ্যালাসিটা হলো, এ প্রক্রিয়ায় যত লোক সন্তুষ্ট হয়েছে, অসন্তুষ্ট হয়েছে তার কয়েকগুণ বেশি অর্থাৎ যারা বঞ্চিত হয়েছে। আলটিমেটলি সরকারের সমর্থন বাড়ল, না কমল? ছাত্রলীগের এক সন্ত্রাসীকে শাস্তি দিলে যদি ১০০ ভুক্তভোগী খুশি হয়, সেটা না করার কোনো যুক্তি শত হাতড়ালেও পাওয়া যাবে না। প্রসঙ্গটি একটু বাড়াই। এটা না বোঝার কোনোই কারণ নেই যে, অপশক্তিকে দমন করলে গণতন্ত্রের কোনো ক্ষতি হয় না। গণতন্ত্রের ক্ষতি হয় ভিন্নমত দমন করা হলে। অপশক্তিকে দমন করা গেলে গণতন্ত্র আরও মজবুত হয়। হেনরি মেইনের কথাটা ঊদ্ধৃত করা যায়-‘গণতন্ত্র আদর্শগতভাবে সর্বোত্তম শাসনব্যবস্থা সত্যি, তবে সন্দেহাতীতভাবে এটাই সবচেয়ে জটিল সরকার পদ্ধতি।’ সন্দেহ কী, গণতন্ত্র চর্চার সঙ্গে আইনের শাসনের সমন্বয় ঘটাতে না পারলে গণতন্ত্র দুরূহই থেকে যায়। এ কি কম কঠিন কথা-মানুষের স্বাধীনতা থাকবে, মতপ্রকাশের অধিকার থাকবে, আবার এই স্বাধীনতার সুযোগে যাতে অপশক্তি মাথা তুলতে না পারে, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। এই কঠিন প্রশ্নের সুরাহা করতে না পারলে বোকারাই শুধু সরকারের ধরন (form of government) নিয়ে তর্ক করবে আর বুদ্ধিমানরা বলতে বাধ্য হবে-যে সরকার সবচেয়ে ভালো শাসন করে, সেই সরকারই উত্তম সরকার। পাশ্চাত্যে অবশ্য বলা হয়-যে সরকার কম শাসন করে, সেই সরকারই উৎকৃষ্ট সরকার। আমরা তো আর পাশ্চাত্যবাসীর মতো সুসভ্য নই।


এ পর্যায়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে একটি ভ্যালিড প্রশ্ন করে আমরা শিরোনামে চলে যাব। প্রশ্নটা হচ্ছে, দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ডের বাইরের কোনো এলাকা? যদি না হয়, তাহলে সেখানে অপরাধ, বিশেষত ছাত্রলীগের দৌরাত্ম্য দমন করতে প্রচলিত আইন প্রবেশ করতে পারে না কেন? ক্যাম্পাসে পুলিশ ঢুকলে ছাত্রছাত্রীরা সরব হয়ে ওঠে-বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্রতা নষ্ট হচ্ছে! ছাত্রলীগকে আইনের বাইরে রাখার এটাই কি কারণ? আমাদের চারদিকে শুধু পবিত্র আর পবিত্র, মহান আর মহান। একটু কিছুতেই নষ্ট হয় মহানত্ব ও পবিত্রতা। আবার দেখুন, মুসলমানদেরই শুধু ধর্মীয় অনুভূতি থাকে এবং সেই অনুভূতিতে আঘাত করা যায় না। সংখ্যালঘুদের কোনো ধর্মীয় অনুভূতি থাকতে নেই!


ধুর, মূল কথায় যেতেই পারছি না। রাজীব গান্ধীর দুটি কথা মনে পড়ছে খুব। সাম্প্রদায়িক বিভেদের প্রশ্নে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, Mosques can be rebuilt; broken temples, broken churches, broken pagodas can be rebuilt but broken hearts can not be rebuilt. আজ অনেকেরই হৃদয় ভেঙে গেছে, এটা কীভাবে মেরামত করা যাবে জানি না। হিন্দি ও উর্দু ভাষার মধ্যে যে কোনো বিরোধ নেই, বরং একটি আরেকটির সম্পূরক, তা বোঝাতে গিয়ে উর্দুভাষীদের এক সভায় তিনি বলেছিলেন, When two flames are put together, they do not quarrel each other, rather they both make a bigger flame. ছাত্রলীগ ও অছাত্রলীগের মধ্যে কেন এই বৈরী সম্পর্ক? বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী হওয়ায় তো দু’পক্ষই আলোকিত। দুই আলোকশিখা মিলিত হয়ে একটি বড় আলোকশিখার জন্ম হতে পারত। তা হচ্ছে না। তবে কি পক্ষ দুটির কোনোটাই আলোকশিখা নয়? তারা বহ্নিশিখা?

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও