সাহিত্যের গোয়েন্দা চরিত্রে নারী এবং মিতিন মাসি
.tdi_2_4c4.td-a-rec-img{text-align:left}.tdi_2_4c4.td-a-rec-img img{margin:0 auto 0 0} (adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});ইংরেজি সাহিত্যে গোয়েন্দা কাহিনি শুধুমাত্র লেখকের কল্পনার হাত ধরে এগোয়নি। ১৮২৯ সালে লন্ডনে মেট্রোপলিটান পুলিশ বাহিনী প্রতিষ্ঠার সঙ্গে গোয়েন্দা গল্পের উত্থানের ঘনিষ্ট সংযোগ রয়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে লন্ডন সুরক্ষার ভার ছিল প্রায় ২,০০০ আনাড়ি রক্ষকের হাতে। এরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিভিন্ন এলাকায়, বিভিন্ন আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষের অধীনে কাজ করত। ১৭৯৯ সালে ফরাসি বিপ্লব শেষ হবার পর বহু বেকার সৈনিক এসে ইংল্যান্ডে আস্তানা গাড়ল। বেহিসাবি হৈ-হুল্লোড় করা ছাড়া তাদের আর কোন কাজকর্ম নেই। এছাড়া খাদ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাওয়ায় চুরি ডাকাতি হয়ে দাঁড়াল নিত্তনৈমিত্তিক ঘটনা। এই দুর্দশাগ্রস্ত সমাজের পটভূমিকায়, এক সুসংহত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আওতায়, ৩,২০০ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শান্তিরক্ষক নিয়ে গড়ে উঠল মেট্রোপলিটান পুলিশ ফোর্স। ফোর্সের প্রধান কার্যালয়ের ঠিকানা হোয়াইটহল অঞ্চলের একটি রাস্তার মোড় – স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড। ১৮৪২ সালে এই দপ্তরেই গড়ে উঠল একটি আলাদা ‘গোয়েন্দা’ বিভাগ, ১৮৭৮ সালে যার নামকরণ হল ‘সেন্ট্রাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট’ (সি.আই.ডি.)। সেই সি.আই.ডি. বিভাগের কর্মীদের অভিনব তদন্তের পদ্ধতি বহু লেখককে অনুপ্রেরণা জোগাল এক নতুন ধরনের কাল্পনিক চরিত্র গঠনে। এই নতুন নায়কের নাম হল ডিটেকটিভ বা গোয়েন্দা। ‘গোয়েন্দা’ এ শব্দটা ভাবলেই নামগুলি ততক্ষণাৎ আমাদের মানসপটে ভেসে উঠে সেগুলি হ’ল শার্লক হোমস, জেমস বন্ড কিংবা বাংলার ফেলুদা বা ব্যোমকেশ বঙী। যদিও এটি একটি ছোট ভগ্নাংশ, সেখানে কিছু আইকনিক মহিলা গোয়েন্দা জন্ম নিয়েছে দুর্দান্ত কিছু লেখকের কলম থেকে। ইংরেজি সাহিত্য যেসব বিখ্যাত নারী গোয়েন্দাদের উপহার দিয়েছে, তাদের মধ্যে অন্যতম হল ন্যান্সী ড্রিউ, মিস জেন মার্পল, বার্থা কুল, মিসেস ব্র্যাডলি। সময়ের চাকা ঘুরছিল। বিশ শতকের মাঝামাঝি নারীশিক্ষা আন্দোলন পৌঁছে গেল তার গন্তব্যে। আধুনিক শিক্ষিতা মেয়েদের পছন্দসই বইয়ের জোগান কোথায়? এমন চরিত্রও তো অপ্রতুল, যার মধ্যে নিজেদের খুঁজে নিতে পারেন তাঁরা। এ পর্যন্ত গোয়েন্দার ভূমিকা ছিল পুরুষের একচেটিয়া অধিকারে, এমনকী মেয়েদের কলমেও। কিন্তু মেয়েরাই বা কেন পিছিয়ে থাকবে গোয়েন্দাগিরিতে? দেখা গেল, কাঁথা সেলাই করে আর রাজ্যের খবর শুনে জীবন কাটিয়ে ফেলা অবিবাহিতা এক গ্রাম্য মহিলা ঘরে বসেই ছাড়িয়ে ফেলতে পারছেন অতীতের হত্যারহস্যের জট। ‘বিন্দিপিসির গোয়েন্দাগিরি’-তে এমনই এক গল্প শুনিয়েছিলেন সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়। প্রতুলচন্দ্র গুপ্তের ‘ঠাকুমার গোয়েন্দাগিরি’ গল্পে আবার সদ্যবিধবা ঠাকুমা তীক্ষ্ণ বুদ্ধিবলে ধরে ফেলেন ঠাকুরদার খুনিকে। তবে এ-সবই ছিল বিচ্ছিন্ন কাহিনি। তাছাড়া কলেজ পড়ুয়া মেয়েদের নতুন ‘টার্গেট গ্রুপ’-কে তৃপ্ত করার মতো উপাদানও ছিল না তাতে। বৈশাখ, ১৩৫৯। মাসিক ‘শুকতারা’র পাঠকদের নজর কেড়ে নিল পাতাজোড়া একটি বিজ্ঞাপন। প্রকাশিত হতে চলেছে “এদেশে মেয়েদের ‘আডভেঞ্চার’-বইয়ের প্রথম পথপ্রদর্শিকা” প্রভাবতী দেবী সরস্বতীর ‘কৃষ্ণা’ সিরিজ। ততদিনে ‘প্রহেলিকা’ আর ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ সিরিজের চারটি কাহিনিতে কৃষ্ণার সঙ্গে পরিচিত হয়েছে বাঙালি পাঠিকারা। তাঁদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে এমন একটি মেয়ে, পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে যে ভয়ঙ্কর দস্যু ইউ-উইনের মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। কৃষ্ণাকে অবলম্বন করেই বাংলা সাহিত্য পেল প্রথম মেয়ে গোয়েন্দা সিরিজ। ক্রমশই বাড়ছিল এর জনপ্রিয়তা। ফলে কৃষ্ণার পরে মেয়ে গোয়েন্দা শিখাকে কেন্দ্র করে আরও একটি পৃথক সিরিজ ‘কুমারিকা’-র প্রবর্তন করল দেব সাহিত্য কুটীর। কিন্তু শিখা জনপ্রিয়তায় কোনও দিন কৃষ্ণার ধারেকাছে পৌঁছতে পারেনি। গোয়েন্দা সাহিত্যে বারবারই ফিরে ফিরে এসেছে পতিতাপল্লি, শুঁড়িখানা, মাদক, চোরাচালান, আর সর্বোপরি নরনারীর অবৈধ সম্পর্ক ও নিষিদ্ধ যৌনতা। এমনটা হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়, কারণ মানুষের মনের অন্ধকার দিকগুলোই তো অপরাধ-মনস্তত্ত্বের আঁতুড়ঘর। কিন্তু বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যের প্রাথমিক যুগে নারী, অপরাধ এবং নিষিদ্ধ যৌনতাকে মিলিয়ে দেওয়া হচ্ছিল একই সমীকরণে। আশির দশকে এই ভাবনাকে চ্যালেঞ্জ জানাল অদ্রীশ বর্ধনের গোয়েন্দা নারায়ণী। নারীর সঙ্গে উদগ্র যৌনতার পূর্ব সমীকরণ এখানেও বজায় রইল, তবে এবার তাকে দেখা গেল অপরাধের অন্য প্রান্তে। দ্রুত বদলাতে লাগল এত দিনের ট্র্যাডিশন। দারোগা প্রিয়নাথ থেকে ব্যোমকেশ পর্যন্ত পৌঁছনোর পথে পুরুষ গোয়েন্দারা অ্যাকশন-নির্ভরতা থেকে ঢুকে পড়ছিলেন বৌদ্ধিক চর্চার দুনিয়ায়। একই পথ ধরে এগিয়ে গেলেন মেয়ে গোয়েন্দারাও। অজিতকৃষ্ণ বসু হাজির করেছিলেন সায়েন্স কলেজ থেকে এঙপেরিমেন্টাল সাইকোলজিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম নন্দিনী সোমকে। নারায়ণীর সমকালেই মাসিক রোমাঞ্চ পত্রিকার পাতায় দেখা দিলেন আর্মচেয়ার ডিটেকটিভ দময়ন্তী। মনোজ সেনের সৃষ্ট এই গোয়েন্দা বিবাহিতা, ইতিহাসের অধ্যাপিকা। দময়ন্তীর উত্তরসূরি রূপে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি উপস্থিত হল তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোয়েন্দা গার্গী। অঙ্কের মেধাবী ছাত্রী গার্গী প্রথমে থাকত দাদা- বৌদির পরিবারে, পরে ‘ঈর্ষার সবুজ চোখ’ উপন্যাসে ভগ্নীপতি সায়ন চৌধুরীকে বধূহত্যার অভিযোগ থেকে মুক্ত করে সে এবং ঘটনাচক্রে বিবাহ করে তাকে। শিল্পপতি সায়নের কোম্পানির ডিরেক্টর গার্গীর রহস্য উন্মোচনের কাহিনির ফাঁকে ফাঁকে লেখক বুনে দেন ননদ ও সহকারী সোনালিচাঁপা এবং ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে গার্গীর সংসারের ছবিও। সংসার আর পেশাকে চমৎকার সামলাতে পেরেছে সুচিত্রা ভট্টাচার্যের পেশাদার গোয়েন্দা, ‘থার্ড আই’-এর কর্ণধার প্রজ্ঞাপারমিতা মুখার্জি ওরফে মিতিনমাসিও। পারমিতা ঘোষ মজুমদারের গোয়েন্দা চরিত্র, অর্থনীতির ছাত্রী ও প্রাক্তন সাংবাদিক রঞ্জাবতী মজুমদার অবিবাহিত, কিন্তু বন্ধু ও সহকারী লাজবন্তীর পরিবারকেই সে আপন করে নিয়েছে। এমন বেঁধে বেঁধে থাকার ছবিই দেখা গিয়েছিল ষাটের দশকে চার মেয়ে গোয়েন্দাকে নিয়ে নলিনী দাশ-এর কিশোরপাঠ্য গোয়েন্দা গণ্ডালু সিরিজে চারটি মেয়ের বন্ধুত্ব হয়ে উঠেছিল এই সিরিজের মূল সুর। মেয়ে গোয়েন্দাদের এই পরম্পরায় বুদ্ধির পাশাপাশি উপস্থিত মানবিকতার স্পর্শ, বিশেষত মেয়েদের প্রতি সহমর্মিতা। কৃষ্ণা বলে, ‘মেয়েদের বিপদে মেয়েরা না দেখলে কে দেখবে বলো?’ ‘প্রেম’ গল্পে যে পদ্মিনী খুন হয়ে যাওয়ার পর ব্যভিচারিণীর তকমা পেয়েছিল, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তার মনোবিশ্লেষণই হয়ে ওঠে দময়ন্তীর রহস্যভেদের চাবিকাঠি। খুব মনে দাগ কাটার মতন কোন থ্রিলার সিনেমার নাম দুম করে বলে ফেলতে হলে খুব সহজেই ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘শুভ মহরৎ’ এর নাম মুখে চলে আসে। শর্মিলা ঠাকুর, রাখি, নন্দিতা দাস। শুধু এই তিনজনের জন্য সিনেমাটা বারবার দেখা যায়। গল্পের বাঁক, রহস্য গল্প বলে যাওয়া… সব কিছুর উপরে। ঋতুপর্ণের ছবিতে মেয়েদের গভীরতা, তাদের মনোবিশ্লেষণ যেভাবে দেখা যায় সেটা আলাদা করে উল্লেখের দাবী রাখে। আগাথা ক্রিস্টির “দ্য মিরর ক্রাকড ফ্রম সাইড টু সাইড” গল্পকে তাঁর নিজের মত করে বলেছেন। গল্পের সাথে যুক্ত হয়েছে মল্লিকা সেনের (নন্দিতা দাস) নারী মন,পদ্মিনী চৌধুরী শর্মিলার রহস্যে ঘেরা উপস্থিতি আর সারাদিন উল বুনে যাওয়া মিস মারপল নীরব কিন্তু বাঙময় রাখি। সমপ্রতি পরিচালক ওপার বাঙলার পরিচালক অরিন্দম শীল বাংলা ছবিতে এক নতুন গোয়েন্দার আবির্ভাব ঘটিয়েছেন, ভাবা হচ্ছে যা অচিরেই একটি ফ্র্যাঞ্চাইজির আকার নেবে । প্রতি বছর নয়তো দুবছরে একবার, পুজো-দীপাবলি অথবা যে কোনও উৎসবে বাঙালির পাতে পড়বে মিতিনমাসির নিত্যনতুন অ্যাডভেঞ্চারের গল্প। তাতে খারাপ খুব একটা কিছু হবে না। গুপ্তধন সিরিজের থেকে মিতিন সিরিজটি সবদিক থেকেই উপাদেয় হবে বেশি। কিন্তু অরিন্দম শীলের মিতিনমাসি আর সুচিত্রা ভট্টাচার্যের প্রজ্ঞাপারমিতা দুটি ভিন্ন প্যারাডাইম। কোনও সাহিত্য থেকে যখন সিনেমা তৈরি হয় তখন যদি ওই লেখাটিই দর্শক পর্দায় পরীক্ষার পড়া মুখস্থের মতো পড়তে থাকেন, তাহলে অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে সিনেমা বানানোর কোনও মানে হয় না। সিনেমায় মূল টেঙটের উপর ভিত্তি করে একটি নতুন টেঙট তৈরি হবে, সেটাই কাম্য। তাই পরিচালক অরিন্দম শীল ও তাঁর সহ-চিত্রনাট্যকার পদ্মনাভ দাশগুপ্ত, সুচিত্রা ভট্টাচার্য-র ‘হাতে মাত্র তিনটে দিন’ গল্পটিকে সিনেমার প্রয়োজনে কিঞ্চিৎ বদলেছেন। তার থেকেও বড় কথা, মিতিন চরিত্রটিকেও নতুন করে গড়েছেন। এই ছবিতে মিতিন যা হয়ে উঠেছে তা যুগোপযোগী হয়তো কিন্তু সাহিত্যিকের চরিত্রের এসেন্স কিছুটা হারিয়েছে। সুচিত্রা ভট্টাচার্যের মিতিন একজন মা, একটি স্বাভাবিক চঞ্চল বাচ্চার মা, যাকে নিয়মিত পড়তে বসাতে হয়, মাঝেমধ্যে কঠিন অঙ্ক দিয়ে নাজেহাল করতে হয়। বুমবুমের স্কুল, হোমওয়ার্ক, বাড়ির খুঁটিনাটি সামলানো, স্বামী পার্থর প্রতি তার প্রেম এবং শাসন, বোনঝি টুপুরকেও কড়া নজরে রাখা এই সবকিছুর সঙ্গেই মিলেমিশে যায় মিতিনের গোয়েন্দাগিরি। এই অভিনবত্বের জন্যেই মিতিন এতটা জনপ্রিয় বাঙালি পাঠকের কাছে।.tdi_3_1cf.td-a-rec-img{text-align:left}.tdi_3_1cf.td-a-rec-img img{margin:0 auto 0 0} (adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
- ট্যাগ:
- অন্যান্য সংবাদ