ছবি সংগৃহীত

প্রিয় গন্তব্য: ভালোবাসা দিবসে প্রিয়জন সাথে ঢাকার মাঝেই কোথাও

খন্দকার ইশতিয়াক মাহমুদ
লেখক
প্রকাশিত: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১১:৫৫
আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১১:৫৫

দুজনে কিছুক্ষণ, টি এস সি, ঢাবি। ছবি: ইশতিয়াক মাহমুদ।

বাংলাদেশে ভ্যালেন্টাইন দিবসের শুরুটা অনেকখানি বিতর্কিত হলেও এখনকার তরুণদের মাঝে এর প্রভাব নিয়ে কোন বিতর্ক করার সুযোগ নেই। স্কুল কলেজ এর কিশোর কিশোরী থেকে শুরু করে বয়স্ক দম্পতি, সবাই আজকাল এই দিবসটা একটু ভিন্ন ভাবে পালন করার সুযোগ পেলে ছাড়েন না। কিন্তু ঢাকা শহরে কোথাও যাবার, কাউকে নিয়ে এক দণ্ড চুপটি করে বসার জায়গার বড্ড অভাব। তাই কিছু জায়গার কথা আজ আমরা বলব যেখানে আপনি আপনার প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে যেতে পারেন।

চারুকলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ উপলক্ষে অনেক মানুষের প্রিয় গন্তব্য। ছবি: প্রিয়.কম।

চারুকলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর চারুকলা ইন্সটিটিউট এর প্রাঙ্গণটি অনেকেরই পছন্দের জায়গা। ঢাকার মাঝে এটা এমন একটা জায়গা যেখানে প্রাকৃতিক পরিবেশের বিষয়টা হারিয়ে যায়নি।

টি এস সি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: টি এস সি এলাকাটি সবসময়ই তরুণদের কোলাহলে মুখরিত হয়ে থাকে। এরই মাঝে নিজেদের আলাদা করে নেন কেউ কেউ। টি এস সির ভেতরে বারান্দায় বা মাঠে বসে অনেকেই সময় কাটাতে পছন্দ করেন। তারুণ্য মুখরিত এলাকাটিতে এসে বয়স্ক মানুষও যেন বয়স হারিয়ে তরুণ হয়ে যেতে চান।

পাবলিক লাইব্রেরী: শাহবাগে অবস্থিত এই গ্রন্থাগারটি শুধু যে বই পড়ুয়াদের জায়গা তাই নয়, তরুণদের আড্ডা-স্থলও বটে। গ্রন্থাগারের সিঁড়ি রীতিমত বিখ্যাত জায়গা আর সেখানে যদি জায়গা না হয়, তাহলে একটু সামনে এগুলে গাছপালা ছায়াঘেরা বেশ একটি জায়গা আছে বসার মত। পাশে গ্রন্থাগার কর্মী ও অন্যান্যদের জন্য একটা ক্যান্টিনও আছে, যেখান থেকে হালকা কিছু নিয়েও নিতে পারেন।

কবি নজরুল এর সমাধি: জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম অনুরোধ জানিয়েছিলেন তাকে যেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দাফন করা হয় মসজিদের পাশে, ঠিক সেখানেই তাকে রাখা হয়েছে। চারুকলার পাশেই বেশ সাজানো গোছানো একটি জায়গা এটি, সকাল থেকে বিকালে পর্যন্ত সহজেই বসা যায়।

জাতীয় শহীদ মিনার: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসেই আছে আমাদের জাতীয় শহীদ মিনার। বিশাল একটি এলাকা নিয়ে এই জায়গাটি বিকেলে বসার জন্য তরুণদের প্রিয় স্থান।

দোয়েল চত্বর ও কার্জন হল: কার্জন হল জায়গাটির একটি বিশেষ আকর্ষণ আছে। পুরো এলাকাটি পুরনো স্থাপত্যের যে ছাপটি আছে, তা একটি প্রাচীন ভাব এনে দেয়। এখানকার বিভিন্ন ভবনের পুরনো কাঠের সিঁড়িতে বসে খানিকটা সময় কাটিয়েই দেয়া যায় নির্জনে। কার্জন হল থেকে বেরিয়েই আছে দোয়েল চত্বর। সেখানে আপনি বিভিন্ন হস্তশিল্প কেনাকাটা করতে পারবেন। আরও আছে বেশ কিছু ছোট নার্সারি, যেখান থেকে আপনি বিভিন্ন ধরনের ছোট বড় গাছ কিনতে পারবেন, উপহারও দিতে পারবেন।

বই মেলা: বই মেলা জায়গাটা ঠিক ঘোরার জায়গা নয়, সেখানে মানুষ বই দেখতে বা কিনতেই যায়। আপনার ভাললাগার মানুষটিকে সাথে নিয়ে তাকে কিনে দিতে পারেন একটা কবিতার বই। নিশ্চয়ই খুশি হবেন তিনি।

চন্দ্রিমা উদ্যান: সংসদ ভবনের পাশেই প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এর সমাধি আর তাকে ঘিরেই এই উদ্যানটি করা হয়েছে। কৃত্রিম লেক আর গাছ গাছালির ছায়াঘেরা জায়গাটি হতে পারে প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে বসার একটি ভাল জায়গা।

মিরপুর বোটানিক্যাল গার্ডেন: মিরপুরে অবস্থিত এই বোটানিক্যাল গার্ডেনটি বিশাল। সেখানে রয়েছে দেশি বিদেশি অনেক গাছ আর জায়গা যেখানে আপনি একটু খানি বসে সময় কাটাতে পারেন। তবে একটু খেয়াল রাখবেন যেন মূল এলাকা ছেড়ে ভেতরে কোথাও চলে না যান।

মিরপুর চিড়িয়াখানা: মিরপুর চিড়িয়াখানা জায়গাটি হয়ত রোমান্টিক মনে নাও হতে পারে, কিন্তু এই ইট কাঠ পাথরের শহরে একটা প্রাকৃতিক পরিবেশই বা কোথায় পায় মানুষ! চিড়িয়াখানা জায়গাটি অনেক খানি বড়, বিভিন্ন রকম গাছ পালা, লেক ইত্যাদি সহ বেশ চমৎকার একটি পরিবেশ রয়েছে। আর বিভিন্ন জন্তু জানোয়ার দেখার মজা তো আছেই।

মিরপুর বেড়িবাঁধ: মিরপুর বেড়িবাঁধে এলে হারিয়ে যেতে পারেন ট্রাফিক জ্যাম মুক্ত হাইওয়েতে। দেখতে পাবেন দু’পাশে গাছের সারি, দিগন্ত বিস্তৃত খোলা প্রান্তর, দূরে সবুজ গ্রাম আর রুপালি পানির নদী। এখানে রয়েছে বিভিন্ন ভাসমান রেস্তোরা এবং বিনোদন পার্ক। সেখানেও সময় কাটাতে পারেন। রয়েছে অনেক পুরনো কিছু বটগাছ। অনেক নাটকেরও শুটিং হয় এখানে। আলো থাকতে থাকতে এখান থেকে চলে যাওয়াটা ভাল হবে। 

সোনার গাঁ: বাংলার এক প্রাচীন রাজধানী সোনার গাঁ, যেখানে আপনি এক দিনে গিয়ে ঘুরে আসতে পারেন।উপভোগ করার মত আছে অনেক কিছুই। জাদুঘরের ভেতরে রয়েছে প্রধান ফটকে দুজন অশ্বারোহী, গরুর গাড়ির ভাস্কর্য, লাইব্রেরি ও ডকুমেন্টেশন সেন্টার, সদ্য নির্মিত জয়নুলের আবক্ষ ভাস্কর্য, ক্যান্টিন, লোকজ রেস্তোরা, সেমিনার হল, ডাকবাংলো, কারুশিল্প গ্রাম, কারুপল্লি, জামদানি ঘর, কারু-মঞ্চ, কারু-ব্রিজ, মৃৎশিল্পের বিক্রয়কেন্দ্র। এছাড়াও গ্রামীণ উদ্যান, আঁকাবাঁকা দৃষ্টিনন্দন লেক, বড়শিতে মাছ শিকার. নৌকায় ভ্রমণ ও বনজ, ফলদ, ঔষধিসহ শোভাবর্ধন প্রজাতির বাহারি বৃক্ষরাজি ইত্যাদিও আপনাকে দিতে পারে অসাধারণ একটি সময়। এছাড়াও আছে পানাম নগরী, ভগ্নপ্রায় এই জায়গাটিতে পুরনো সব বাড়ি আর বিভিন্ন স্থাপনার মাঝ দিয়ে হেঁটে যেতে আপনার অনুভূতিটাই অন্যরকম হয়ে যাবে।

সবুজে মোড়া জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি: কামরুজ্জামান লিংকন।

জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়: এই বিশ্ববিদ্যালয়টি বহু ভ্রমণকারীদের প্রিয় স্থান। দিনে গিয়ে দিনে ঘুরে আসা খুবই সহজ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার এই বিশ্ববিদ্যালয়টি হতে পারে প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে এক দিনের একটি গন্তব্য।

ভাবছেন এটা আফ্রিকা? একদম না! গাজীপুরে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক। ছবি: মিনহাজ মিশু।

বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক: এশিয়ার বৃহত্তম সাফারি পার্কটি যে গাজীপুরে, সেটা হয়ত আমরা জানিই না। ঐতিহ্যবাহী ভাওয়াল গড়ে ৩৬৯০ একর জায়গা নিয়ে গড়ে তোলা হয়ে এই আধুনিক জীবজন্তুদের অভয়ারণ্য। বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে ১২২৫ একর জায়গা নিয়ে কোর সাফারি, ৫৬৬ একর জায়গা নিয়ে সাফারি কিংডম, ৮২০ একর জায়গা নিয়ে বায়ো-ডাইভার্সিটি, ৭৬৯ একর এলাকা নিয়ে এক্সটেনসিভ এশিয়ান সাফারি এবং ৩৮ একর এলাকা নিয়ে স্থাপন করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু স্কয়ার। পার্কে বন ও অবমুক্ত প্রাণীর নিরাপত্তার জন্য ২৬ কিলোমিটার সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে দেশি-বিদেশি পর্যটকগণ বাস বা জীপে বসে ঘুরে বেড়ানো অবস্থায় বন্যপ্রাণী দেখতে পারেন। পার্কে বাঘ, সিংহ, ভালুক চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণ, জেব্রা, জিরাফ, ওয়াইল্ডবিষ্ট, ব্লেসবক, উটপাখি, ইমু প্রভৃতি রয়েছে যারা স্বাধীনভাবে পার্কে ঘুরে বেড়াতে পারে।

দিয়া-বাড়ি: সাম্প্রতিককালে ঢাকাবাসীর একটি পছন্দের বেড়ানোর জায়গায় পরিণত হয়েছে উত্তরার দিয়া বাড়ি। শহরের কোলাহল থেকে দূরে নৈসর্গিক সৌন্দর্যমন্ডিত একটি স্থান দিয়া বাড়ি। উত্তরার সেক্টর ১৫ তে অবস্থিত এই স্থানটি পরিবার ও বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে বেড়াবার জন্য চমৎকার জায়গা। বিশেষ করে শরৎকালের কাশফুল দিয়া বাড়ির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। যদিও বছরের এই সময়টাতে আপনি কাশফুলের সৌন্দর্য দেখা থেকে বঞ্চিত হবেন। দিয়া বাড়িতে খাবার ব্যবস্থা খুব ভালো। অনেকগুলো দোকান আছে। আপনার প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে কিছু মুহূর্ত কাটিয়ে আসতে পারেন সেখান থেকে।

দিনে তো বটেই, রাতেও আকর্ষণীয় হাতিরঝিল। ছবি: প্রিয়.কম।

হাতির-ঝিল: ইট-কাঠ আর জ্যামের নগরী ঢাকার এক ব্যতিক্রমী সুন্দর জায়গা হাতির ঝিল। সন্ধ্যা নামলেই ভ্রমণকেন্দ্রে পরিণত হয় হাতির ঝিল। শান্তি ও স্বস্তির খোঁজে নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা এখানে আসেন। সন্ধ্যায় বাহারি আলোয় সেজে ওঠে হাতির ঝিল। এর পাশাপাশি হাতির-ঝিলের ওয়াটার ট্যাক্সি রাইড হতে পারে আর একটা চমৎকার বিনোদন।

শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস: ঢাকার ঠিক ভেতরেই একটা নিরিবিলি সময় কাটাবার জন্য চমৎকার জায়গা হতে পারে শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হবার কারণে এই জায়গাটা তার প্রাকৃতিক ছোঁয়া হারিয়ে ফেলেনি।

ধানমন্ডি লেক ও রবীন্দ্র সরোবর: যে জায়গাটির কথা না বললে লেখাই সম্পূর্ণ হয় না, তা হল ধানমন্ডি লেক। এই লেক আর লেকের পার্শ্ববর্তী জায়গা গুলো সবসময়ই বিভিন্ন মানুষ দ্বারা পরিপূর্ণ থাকে, এর পাশাপাশি বিশেষ দিনগুলোতে তরুণদের ভিড় দেখা যায় রবীন্দ্র সরোবর এর মুক্ত মঞ্চ এলাকায়।

এসবের পাশাপাশি বিভিন্ন রেস্তোরা ভালবাসা দিবস উপলক্ষে বিশেষ প্যাকেজ অফার করছে। কোন স্কাই ভিউ রুফটপ রেস্তোরায় আপনি আপনার ভালবাসার মানুষটিকে পাশে নিয়ে এক কাপ কফি খেতেই পারেন। খিলগাঁও তালতলা এলাকায় আপনি পাবেন বিভিন্ন ধরনের রেস্তোরার এক বিশাল সমারোহ। বেইলি রোড, ধানমন্ডির সাত মসজিদ রোড, গুলশান এবং বনানী এলাকা এবং সম্প্রতি ৩০০ ফুট রাস্তার ধারে আপনি বিভিন্ন ধরনের এবং বিভিন্ন মূল্যমানের রেস্তোরা পাবেন। 

কাছের মানুষের সঙ্গ উপভোগ করার জন্য আসলে বেশি কিছু লাগে না, একটি নিরাপদ কোলাহল-মুক্ত পরিবেশ আর প্রিয় মানুষ হলেই সময়টি চমৎকার কেটে যায়। এভাবে চিন্তা করলে খুব বেশি দূরে কোথাও যাবার প্রয়োজন হয় না, আশে পাশেই খুঁজে নেয়া যায় নিজেদের জন্য একটি বিশেষ স্থান। একটা বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখবেন, আপনার ও আপনার প্রিয় মানুষটির নিরাপত্তা সবার আগে। বিশেষ স্থানে গিয়ে নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পরার চেয়ে সাধারণ একটি নিরাপদ জায়গা অনেক বেশি কাম্য হতে পারে। কোন নিরিবিলি এলাকায় গেলে চেষ্টা করুন সন্ধ্যা হয়ে যাবার আগেই চলে আসতে। আবার খুব ভিড় হবে এরকম কোন এলাকা থেকেও দূরে থাকার চেষ্টা করুন।

 
 প্রিয় ট্রাভেল/ সম্পাদনা: ড. জিনিয়া রহমান।
 
আপনাদের মতামত জানাতে ই মেইল করতে পারেন [email protected] এই ঠিকানায়।