ছবি সংগৃহীত
রাসুলের [সা.] উদ্যোগে বিনিয়োগ করেছিলেন খাদিজা [রা.] : অধ্যক্ষ কামালুদ্দীন জাফরী
আপডেট: ১৮ জানুয়ারি ২০১৭, ০৭:১০
অধ্যক্ষ সাইয়্যেদ কামালুদ্দীন আবদুল্লাহ জাফরী। ছবি : শামসুল হক রিপন, প্রিয়.কম
(প্রিয়.কম) অধ্যক্ষ সাইয়্যেদ কামালুদ্দীন আবদুল্লাহ জাফরী- ১৯৪৫ সালের ৫ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মাওলানা সাইয়্যেদ আবু জাফর আব্দুল্লাহ। শিক্ষাজীবনে তিনি হাদীস শাস্ত্রে প্রথম শ্রেণীতে কামিল ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং মক্কাস্থ উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ভাষা ইনস্টিটিউট থেকে আরবি ভাষায় ডিস্টিংশনসহ উচ্চতর ডিপ্লোমা ডিগ্রি লাভ করেন।
কর্মজীবনে তিনি ২৬ বছর ধরে নরসিংদিতে অবস্থিত জামেয়া কাসেমিয়া কামিল মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একাধারে তিনি বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান, সেন্ট্রাল শরীয়াহ বোর্ড ফর ইসলামিক ব্যাংক অব বাংলাদেশ এবং সেন্ট্রাল শরীয়াহ কাউন্সিল ফর ইসলামিক ইনস্যুরেন্স অব বাংলাদেশ-এর নির্বাচিত চেয়ারম্যান, বিশ্ব ইসলামি স্কলারদের সংগঠন রাবেতা আলম আল ইসলামী (ইন্টারন্যাশনাল অরগানাইজেশন ফর মুসলিম স্কলারস)-এর সর্বোচ্চ কমিটির সদস্য, যুক্তরাজ্যস্থ ইসলামিক ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানির শরীয়াহ বোর্ড-এর চেয়ারম্যান, ফোরাম ফর সোস্যাল রিফরমেশন বাংলাদেশ (এফআরএস এনজিও)-এর চেয়ারম্যান, এটিএন বাংলা টেলিভিশনের ইসলামিক অনুষ্ঠানের উপদেষ্টা ও বিভাগীয় প্রধান এবং উত্তরা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন বীমা, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন।
লেখালেখি ও গবেষণা ক্ষেত্রেও বেশ সফল বিচরণ রয়েছে জনাব জাফরীর। তাঁর গ্রন্থনা ও সম্পাদনায় বেশ কিছু সাড়া জাগানো গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। কিতাবু হুকমির রিদ্দাহ ফিল ইসলাম, মাবাদিউস সিয়াসাহ ফিল ইসলাম প্রভৃতি গ্রন্থের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ইসলামী অর্থনীতি, ব্যাংকিং এবং ইনস্যুরেন্সবিষয়ক নানাবিধ কার্যক্রমে ব্যস্ত থাকার পরও শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখে চলেছেন বিশ্ববিখ্যাত এই শিক্ষাবিদ ব্যক্তিত্ব। কিন্ডার গার্টেন, ক্যাডেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, ইউনিভার্সিটিসহ ডজনখানেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সফল প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক তিনি। ইসলামী অর্থনীতি, ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স ব্যবস্থাপনা, ইসলামী অর্থনীতিসহ নানা বিষয়ে প্রিয়.কমকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তিনি।

শরীআহ সুপারভাইজরি কমিটির ফকীহদের সাথে মতবিনিময় সভায় অতিথিদের সাথে অধ্যক্ষ কামালুদ্দীন জাফরী। ছবি : সংগৃহীত
প্রিয়.কম : ইসলামী ব্যাংকিং বা ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বলতে কী বোঝায়? এই দুইটি বিষয়েরই আদর্শগত মূলভিত্তি কী?
অধ্যক্ষ কামালুদ্দীন জাফরী : ইসলামী ব্যাংক বলতে বুঝায়, এমন এক অর্থিক প্রতিষ্ঠান- যার সকল কর্যক্রমে ও লেনদেনে এবং ব্যবসায় সুদকে পরিহার করা হয়। এটা হচ্ছে নেতিবাচক অর্থে। আর ইতিবাচক অর্থ হলো, যার সকল কার্যক্রমে ও লেনদেনে এবং ব্যবসায় ইসলামী শরীয়াহ বাস্তবায়ন করা হয়। এরই সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- এই সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠান নজরদারি করা ও নির্দেশনা দেয়ার জন্যে একটি শরীয়াহ সুপারভাইজারি বোর্ড থাকা বাধ্যতামূলক। ইসলামী ব্যাংকিং কিংবা ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের ক্ষেত্রে ১০০ ভাগ পারফর্ম করার জন্য এই তিনটি বিষয়ই থাকতে হবে। আর ইসলামী ব্যাংকিং এবং ইসলামী ইন্স্যুরেন্স-এর মূলভিত্তি হলো কোরআন ও সুন্নাহ।
প্রিয়.কম : ইসলামী ব্যাংকিং বোঝানোর জন্য বিভিন্ন ব্যাংকগুলোতে আরবি পরিভাষা ব্যবহার লক্ষ করা যায়। এই পরিভাষাগুলো কী সহজ করার জন্য বাংলায় রূপান্তর করা যায় না?
অধ্যক্ষ কামালুদ্দীন জাফরী : পরিভাষা আসলে নিজ ভাষাতেই থাকতে হয়। ব্যাংকিং বোঝানোর জন্য যে সব পরিভাষাগুলো ব্যবহার করা হয়, তা শুধু আরবি পরিভাষা নয়, ইসলামী পরিভাষা। এগুলোর ব্যবহার হুবহু থাকাটাই ভালো। তবে এটার তরজমাও থাকা উচিত। এছাড়া ইসলামী শব্দ ও পরিভাষার উচ্চারণ ও ব্যবহারের সাথে সাওয়াবের একটি বিষয় জড়িত রয়েছে, সুতরাং এসব শব্দ ও পরিভাষাগুলো মৌলিকভাবে ব্যবহার করাই উত্তম।

সম্মাননা গ্রহণ করছেন অধ্যক্ষ কামালুদ্দীন জাফরী। ছবি : সংগৃহীত
প্রিয়.কম : কনভেনশনাল ব্যাংকে কেউ যখন টাকা রাখে তখন তাকে বলে দেয়া হয় আপনি বছর শেষে এতো টাকা নির্দিষ্টভাবে পাবেন আর ইসলামী ব্যাংকে কিন্তু নির্দিষ্টভাবে বলে দেয়া হচ্ছে না। এই জন্যও তো অনেকে অস্পষ্ট বলতে পারে?
অধ্যক্ষ কামালুদ্দীন জাফরী : না, এখানে বিষয়টা এমন নয়। ইসলামী ব্যাংকে একজন গ্রাহক নির্দিষ্ট লাভের পরিমাণ না জেনে টাকা দিচ্ছেন মানেই হলো তিনি লাভ-লস উভয়ের অংশ নিচ্ছেন। কনভেনশনাল ব্যাংক যখন বলে, এতো টাকা দেবো- তখন তাদের লাভ হোক বা লস হোক, সে-টাকা গ্রাহককে তার দিতে বাধ্য। এটা কোনো স্বচ্ছতার মানদ- হতে পারে না। এটা তো হারাম। হ্যাঁ, এখন প্রশ্ন হতে পারে, ইসলামী ব্যাংকে তো কখনো গ্রাহককে লসের অংশ নিতে শুনি না। এর কারণ হলো, ইসলামী ব্যাংক দশ জায়গায় বিনিয়োগ করে দুই জায়গায় লস খায়। সেই দুই জায়গার লস পূর্বের লাভ থেকে পুষিয়ে নেয়া হয়। যদি লস না হতো, তাহলে লাভের পরিমাণ আরও বেশি হতো।
প্রিয়.কম : ইসলামী ব্যংকের কোনো একজন সাবেক কর্মকর্তা আমাদের বলেছেন, ইসলামী ব্যাংক থিওরিটিক্যালি যতটা ইসলামের কথা বলে, প্রাক্টিক্যালি তারা ততটা ইসলামী রীতিনীতি মানে না। বরং তারা অনেকটাই কনভেনশনাল ব্যাংকের মতোই চলে। এই বিষয়ে আপনার মতামত কী?
অধ্যক্ষ কামালুদ্দীন জাফরী : কথাটা কোনো কোনো ব্যাংকের ক্ষেত্রে হয়তো কিছুটা সত্য হবে, তবে তা ঢালাওভাবে সত্য নয়। তিনি যে ব্যাংকে কাজ করেছেন সেখানে হয়তো কোনো সমস্যা তিনি দেখেন, সেজন্য সব ব্যাংকগুলোকে দোষি বলা ঠিক হবে না। কোনো ইসলামী ব্যাংকে সংশ্লিষ্ট শরীয়াহ বোর্ডের ইফেক্টিভ ক্ষমতা না থাকার কারণে এমনটা হতে পারে, যা তার স্বীকৃতি থেকেই বোঝা যায়। এক্ষেত্রে আশার কথা হলো শুধু শরীয়াহ বোর্ডের পক্ষ থেকে নয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এবং সেন্ট্রাল শরীয়াহ বোর্ডের পক্ষ থেকে যখন অডিট করা হবে, তখন ইসলামি বিধান অনুযায়ীই অডিট করা হবে। তখন এমন ব্যাংকগুলোর আর ফাঁকি দেয়ার সুযোগ থাকবে না।

সিএসবিআইবি আয়োজিত অধিবেশনের সভাপতিত্ব করছেন অধ্যক্ষ কামালুদ্দীন জাফরী। ছবি : সংগৃহীত
প্রিয়.কম : বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সেক্টরকে ইসলামীকরণের একটা প্রবণতা চালু হয়েছে। এই প্রবণতাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
অধ্যক্ষ কামালুদ্দীন জাফরী : ইসলাম নিয়ে অনেক বিতর্ক হচ্ছে পক্ষে বিপক্ষে। এর ফলে মানুষের মাঝে ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ বাড়ছে। ইসলাম কয়েকটি জিনিসের নাম নয়, ইসলাম একমাত্র পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। আর এই পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থার একটা বড় দিক হলো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। যার সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে ‘অর্থ তোমাদের জন্যে মেরুদ- স্বরূপ।’ ইবাদত করার জন্যে জীবিত থাকতে হবে এবং জীবিত থাকার জন্যে জীবিকার ব্যবস্থা করতে হবে অর্থাৎ অর্থ দরকার হবে। সুতরাং যে-ই ইসলাম সম্পর্কে জানতে চায় সে-ই দেখে যে অর্থনৈতিক বিষয়ে ইসলাম কী বলে। যার ফলে ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিস্তার ঘটছে। আমার মনে হয় এটা ভালো লক্ষণ।
প্রিয়.কম : একটি ব্যবসাতে মৌলিকভাবে কী কী কারণ যুক্ত হলে সেটা হারাম হবে এবং কোন কোন বিষয়গুলো মুক্ত থাকলে সেটা হালাল হবে?
অধ্যক্ষ কামালুদ্দীন জাফরী : প্রথমত আপনি যে-কোনো কাজ করবেন, সেটা দুই ভাগে বিভক্ত। এক হচ্ছে ইবাদাত আর একটা হচ্ছে মুয়ামালাত। ইবাদাতের অর্থ হলো আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক, আর মুয়ামালাতের অর্থ হলো বান্দার সাথে বান্দার সম্পর্ক। ইবাদতের ক্ষেত্রে করণীয় কী- সেটা সবার আগে দেখতে হবে, আর বর্জনীয় বিষয় দেখতে হবে পরে। কিন্তু মুয়ামালাতের ক্ষেত্রে বর্জনীয় দিকটা আগে দেখতে হবে আর করণীয় দিকটা পরে দেখতে হবে। মাত্র কয়েকটা জিনিস আছে হারাম এছাড়া বাকি সবই হালাল। এই কারণে কোরআনে হারামের তালিকা পাওয়া যায় কিন্তু হালালের কোনো তালিকা নেই। সুতরাং ব্যবসা বা জীবন চর্চার ক্ষেত্রে কুরআনে বর্ণিত হারাম বিষয়গুলোকে বাদ দিলেই বাকি সব হালাল হবে।
সম্পাদনা : ফারজানা রিংকী