ছবি সংগৃহীত
কুদ্দুস বয়াতির ‘আক্ষেপ’ ও লোকসংগীত উৎসবের শেষ রাত
আপডেট: ১৩ নভেম্বর ২০১৬, ০৯:২৫
ফোক মঞ্চে পবন দাসের পরিবেশনা/ ছবি: সংগৃহীত
(প্রিয়.কম) গত তিনদিন ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে প্রাণের সুরের মূর্ছনায় দর্শক-শ্রোতারা মোহিত ছিলেন। আর শেষ দিনেও শৈল্পিক লোকসংগীতের শুদ্ধতায় মজেছেন সংগীতপ্রেমীরা। সন্ধ্যায় আয়োজনের শুরুটা হয় নেত্রকোনার কেন্দুয়ার অন্ধ বাউল সুনীল কর্মকারের পরিবেশনার মধ্য দিয়ে। চোখে দৃষ্টি না থাকলেও সুরের মাধুর্য দিয়ে জয় করে নিয়েছেন হাজারও শ্রোতার মন। শিল্পীর সঙ্গে পরিবেশনায় আরও অংশ নেয় ক্ষুদে বাউল শফিকুল ইসলাম। সুনীল কর্মকারের পরে মঞ্চে আসেন কিশোরগঞ্জের পালাকার ইসলাম উদ্দিন কিসসাকার। এই শিল্পী সেদিন মঞ্চে নারীর বেশে সেজে এসে প্রথমেই একটা চমক দেন।
সানাই, খোল, ঢোল, হারমোনিয়ামযোগে তিনি নেচে-গেয়ে কিসসা বলার ঢংয়ে শোনান উতলা সুন্দরীর পালা। এরপরে মঞ্চে আসেন উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ বারী সিদ্দিকী। একাধারে বাঁশুরিয়া এবং গানের এ শিল্পী তার পরিবেশনার পুরোটা সময় মাতিয়ে রাখেন সবাইকে। বিচ্ছেদী আবহে তার গাওয়া প্রতিটি গানেই শ্রোতারা কণ্ঠ মেলান। একে একে তিনি পরিবেশন করেন ‘আষাঢ় মাইসা ভাসা পানি রে’, ‘মালিক ছাড়া কোনো গতি নাই’, ‘ঘরে জ্বালা বাইরে জ্বালা রে একমাত্র তোর প্রেমের কারণে’, ‘রজনী হইসনা অবসান আজ নিশিতে আসতে পারে আমার বন্ধু কালাচাঁন’ গানগুলো। ‘শুয়াচান পাখি’ গানটি গাওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয় তার পরিবেশনা।

উৎসবের শেষদিন আরও রঙিন হয়ে উঠল ভারতের পাঞ্জাবের নুরান সিস্টার্সের অনবদ্য পরিবেশনায়। অসাধারণ বললে সেটাও কম বলা হবে তাদের জন্য। ওস্তাদ গুলশান মীরের দুই কন্যা জ্যোতি নুরান ও সুলতানা নুরান গানে গানে কাঁপিয়েছেন পুরো আর্মি স্টেডিয়াম। নুরান সিস্টার্স তাদের পরিবেশনা শুরু করেন ‘আল্লাহু আল্লাহু’ গানটি দিয়ে। এরপর গাইলেন অসম্ভব জনপ্রিয় হিন্দি গান ‘পাটাকা ঘুড্ডি’। তারপরই গাইলেন তাদের আরেক জনপ্রিয় গান ‘টুক টুক’। প্রতিটি গানে দর্শক তালে তালে নেচেছেন-গেয়েছেন। ‘পর্দে মে রেহনে দো’, ‘যো কারনা থা কারদি’ গানগুলোর পর ‘দমাদম মাস্ত কালান্দার’ গানটি পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পরিবেশনা।
এদিকে কণ্ঠশিল্পী কৌশিক হোসাইনের ‘তাপস অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ ব্যান্ড শোনান ‘বন্দে মায়া লাগাইছে’, ‘দিল্লিতে নিজামউদ্দিন আউলিয়া এলো’সহ বেশ কিছু গান। তবে শ্রোতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করার চাইতে গান পরিবেশনের সময় ভৎর্সনার শিকার হতে হয় তাদের। যদিও এরপর তারা যান্ত্রিক গোলযোগের দোহাই দিয়ে মঞ্চ ছাড়েন। তবে আক্ষেপ রয়ে যায়-কুদ্দুস বয়াতির কন্ঠে। এই দলের সঙ্গে কয়েকটি গান পরিবেশন করার কথা ছিল কুদ্দুস বয়াতির। সময়ের কারণে শুধু ‘পাগলা ঘোরা’ গানটির দুই লাইন গেয়ে গানটি শেষ করেন। এ সময় আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি লোকগানের রাজা। কিন্তু লোকগানের এ উৎসবে আমিই গাইতে পারলাম না।’

সবশেষে মঞ্চে ভারতের পবন দাশ বাউলের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সুশীলা রামান ও স্যাম মিলস সঙ্গীত পরিবেশন করেন। পবন দাশ বাউল তার স্বভাবসুলভ একহাতে একতারা ও অন্যহাতে হাতবোল বাজিয়ে গান পরিবেশন করেন। ‘তোমার দিল কি দয়া হয় না’সহ তার জনপ্রিয় বেশ কয়েকটি গান পরিবেশন করেন। এ পরিবেশনার মধ্য দিয়েই পর্দা নামে ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত উৎসবের দ্বিতীয় আসরের।
সমাপনী আনুষ্ঠানিকতায় উৎসবের আয়োজক সান ইভেন্টসের চেয়ারম্যান অঞ্জন চৌধুরী বলেন, এ উৎসবের উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের লোকশিল্পীদের আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়া।’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘এখানে গ্রামের বাউল গান যেমন হচ্ছে, গানের ফিউশনও হচ্ছে। তাতে অসুবিধা নেই। বড় কথা হলো, এখানে আমি তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, যৌবনের উদ্দীপনা দেখতে পেয়েছি। সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে লড়তে তারুণ্যের এই শক্তি আমাদের বড় হাতিয়ার।’
বাংলাদেশকে এবং বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার এই অসাধারণ উৎসবে অংশ নিয়েছে দেশের সর্বস্তরের মানুষ। লোক সংগীতের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করে সুরের মায়াজালে হারাতে সব বয়সের সংগীতানুরাগীদের ভিড় ছিল এই সংগীত আসরে। তবে দ্বিতীয়বারের মতো আয়োজিত ঢাকা ফোক ফেস্টের সমাপনী দিনটি সঙ্গীত পিপাসু ভক্তদের মনে ক্ষত হয়েই রইলো।
সম্পাদনা: গোরা