ছবি সংগৃহীত

লেখার মান ভালো হলে প্রচ্ছদও ভালো হয়: সব্যসাচী হাজরা

শিবলী আহমেদ
সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ১৬ মার্চ ২০১৭, ০৮:১৯
আপডেট: ১৬ মার্চ ২০১৭, ০৮:১৯

সব্যসাচী হাজরা। ছবি সংগৃহীত। 

(প্রিয়.কম) সব্যসাচী হাজরা। একাধারে চিত্র ও প্রচ্ছদশিল্পী। রঙের আঁচড়ে একটি বইয়ের সারসংক্ষেপ ফুটিয়ে তুলতে সিদ্ধহস্ত তিনি। সৃজনশীল এ শিল্পীর সঙ্গে কথা হলো প্রিয়.কমের। 

প্রিয়.কম: কেমন আছেন?

সব্যসাচী হাজরা: ভালো আছি। 

প্রিয়.কম: প্রথমেই শিশু-সাহিত্য বিষয়ক বইয়ের প্রচ্ছদ নিয়ে প্রশ্ন করব। বাংলাদেশে বর্তমানে শিশু-সাহিত্য বিষয়ক বইগুলোর প্রচ্ছদ বা ইলাস্ট্রেশন কেবল- ফুল, পাখি, লতা-পাতা, প্রজাপতি ইত্যাদি চিত্রের মধ্যেই বন্দীদশায় আছে। ‘আউট অব বক্স’ চিন্তা করা হচ্ছে না কেন?

সব্যসাচী হাজরা: প্রথম কথা হচ্ছে বাংলাদেশে শিশু-সাহিত্য নিয়ে ভাবনার লোক কম। কারো লেখা যদি ফুল, পাখি, লতা-পাতা নিয়েই হয়, তাহলে বইয়ের কভার তো ফুল, পাখি, লতা-পাতাই হবে। কারো লেখা যদি ‘আউট অব বক্স’ হয়, তাহলে বইয়ের কাভারও ‘আউট অব বক্স’ হবে। দ্বিতীয়ত পেইন্টার আছে অনেক কিন্তু প্রচ্ছদশিল্পী কম। পেইন্টিং এক বিষয় আর প্রচ্ছদশিল্প আরেক বিষয়। তাছাড়াও সাহিত্য বুঝে ওঠার একটা বিষয় রয়েছে। বইয়ের কাভার করা একটি চর্চার বিষয়। অবশ্য এ চর্চার জন্য এখন কিছু গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। যেমন আপনি হয়তো ফেসবুকে দেখেছেন যে ‘কার্টুন পিপল’ নামক একটি গ্রুপ আছে। তারা ব্যতিক্রমী কাজ করছে। ব্যতিক্রমী কাজ করা সম্ভব কিন্তু সমস্যা হচ্ছে অন্য জায়গায়। যেমন; আপনি ইলাস্ট্রেশনের কথা বললেন। একজন মানুষ বসে বসে ১৫-২০ টি ইলাস্ট্রেশন করবে কিন্তু সে কি সেই পরিমাণ পারিশ্রমিক পাচ্ছে? পাচ্ছে না। ফলে কম পারিশ্রমিকের কাজে ফাঁকিবাজি থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। যা হোক, একজন শিশু-সাহিত্যিক যেমন লিখবে, বইয়ের প্রচ্ছদ সে রকমই হবে। কনটেন্ট ডেভেলপ হলে প্রচ্ছদও ডেভেলপ হবে। 

প্রিয়.কম: এবার একটি কমন প্রশ্ন। একটি ভালো বইয়ের জন্য একটি ভালো প্রচ্ছদের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?

সব্যসাচী হাজরা: এক কথায় খুবই জরুরি। একজন পাঠক বই পছন্দ করার সময় প্রথমেই তার নজর যায় প্রচ্ছদের দিকে। মানে শুরুতেই কাভার ডিজাইন লক্ষ্য করে। ভালো বইয়ের জন্য ভালো প্রচ্ছদ খুবই জরুরি। বইয়ের লেখা ভালো কিন্তু প্রচ্ছদ খারাপ এমন নজির কিন্তু কম। মোট কথা, একটি ভালো বইয়ের জন্য একটি ভালো প্রচ্ছদ অত্যন্ত জরুরি। 

প্রিয়.কম: প্রচ্ছদ করা এখন একটি শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ শিল্পে ভর করে ক্যারিয়ার গড়া কী সম্ভব?

সব্যসাচী হাজরা: আরও ১০০ বছর আগেই প্রচ্ছদ করা শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। আমাদের দেশে একে পেশাগতভাবে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা রয়েছে। বাধা হচ্ছে সমন্বয়ে, সম্মানীতে। আমাদের দেশে বইমেলা কেন্দ্রিক বই প্রকাশ করার প্রবণতা বেশি। ফলে একজন প্রচ্ছদশিল্পীর জন্য সারাবছর কাজ পাওয়া দুরূহ। একে পেশাগতভাবে নেওয়ার সুযোগ এখনও তৈরি হয়নি। অন্যান্য দেশের বই প্রকাশকদের দিকে তাকালে দেখতে পাবেন, তারা তাদের বইয়ের গুণগত মান রক্ষা করার জন্য একজন আর্ট ডিরেক্টর রাখেন। কেননা, একটি বই কেবল লেখা নিয়েই তৈরি নয়, এর সঙ্গে প্রচ্ছদ, মলাট বাঁধাই, সুতা-কাগজ ইত্যাদি বিষয়গুলো জড়িত। তাই তারা একজন আর্ট ডিরেক্টর রাখেন। আমাদের দেশে সেটা কই! আমি বলছি না যে একেবারেই নেই, আমাদের দেশেও কিছু প্রকাশক আর্ট ডিরেক্টর রাখেন। 

প্রিয়.কম: প্রচ্ছদশিল্পকে একটি পেশা হিসেবে তৈরি করতে কি কি উদ্যোগ নিতে হবে?

সব্যসাচী হাজরা: এক্ষেত্রে প্রকাশকদের উদ্যোগী হতে হবে। সত্যি কথা বলতে একটি বইয়ের প্রচ্ছদ করে একজন শিল্পী মোটে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা পান (আমি আবশ্য আরও বেশি নিই)। একটি বই বিক্রি হলে সেখান থেকে বইয়ের লেখকেরা বারবার রয়েলটি পেতে থাকেন, কিন্তু একজন প্রচ্ছদশিল্পী বারবার সেটা পান না। তাছাড়াও একটু আগে যেটা বললাম- আমাদের দেশে বইমেলাকেন্দ্রিক বই বের হয়, এর বাইরেও যদি বের হতো, তাহলে এ শিল্পে হয়তো ক্যারিয়ার গড়ার সম্ভাবনা তৈরি হতো। 

প্রিয়.কম: কোন ঘরানার বইয়ের প্রচ্ছদ করে আপনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?

সব্যসাচী হাজরা: অনেক ধরনের বইই আসে আমার কাছে প্রচ্ছদ করার জন্য। যদিও সব বিষয়ের জন্য আমি সুবিধাজনক প্রচ্ছদ শিল্পী নই। যেমন আমি উপন্যাসের জন্য পারফেক্ট না। তবে সায়েন্স ফিকশন, কবিতা, প্রবন্ধ ও গবেষণা- এ ধরনের বইয়ের প্রচ্ছদ করে আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। 

প্রিয়.কম: একসময় স্টিল ছবি দ্বারা প্রচ্ছদ করা হতো। তারপর রং-তুলি, এরপর কম্পিউটার। তো আমরা আমাদের প্রচ্ছদশিল্পকে কতটা ডিজিটালাইজ করতে পেরেছি?

সব্যসাচী হাজরা: আমরা ডিজিটালের ছোঁয়া লাগাতে পেরেছি এবং লাগিয়ে প্রচ্ছদশিল্প ধ্বংস হয়েছে। হাতে করা প্রচ্ছদে যে ফিলটা থাকে, প্রযুক্তি ব্যবহারে সেই ফিলটা পাওয়া যায় না। এর প্রধান কারণ হচ্ছে- হাতের কাজের সঙ্গে প্রযুক্তি ব্যবহার করা কাজের সমন্বয় ঘটাতে না পারা। হ্যাঁ, প্রযুক্তি তথা কম্পিউটার ব্যবহার করে কাজ দ্রুত হচ্ছে কিন্তু স্থায়ী হচ্ছে না, টেকসই হচ্ছে না। কারণ- হাতে করা প্রচ্ছদ থেকে আমরা দূরে সরে এসেছি। 

প্রিয়.কম: কনটেন্ট যেমন কপি হতে পারে, প্রচ্ছদও কী সেরকম কপি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে?

সব্যসাচী হাজরা: হ্যাঁ। সম্ভাবনা রয়েছে এবং কপি হচ্ছে। একজন আরেকজনের প্রচ্ছদ থেকে অনেক কিছু কপি করে নিচ্ছে। কিন্তু মূল শিল্পীর নাম মেনশন করছে না কিংবা ক্রেডিট দিচ্ছে না।

প্রিয়.কম: প্রচ্ছদ কপিরাইট বিষয়ে কী আইন-কানুন নেই?

সব্যসাচী হাজরা: আছে। কিন্তু কার্যকারিতা নেই। 

প্রিয়.কম: আচ্ছা। এ যাবৎ আপনার কোনো এক্সিবিশন হয়েছে কী?

সব্যসাচী হাজরা: একক কোনো এক্সিবিশন হয়নি। তবে দলীয়ভাবে হয়েছে। 

প্রিয়.কম: ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

সব্যসাচী হাজরা: নেই। ওভাবে কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করে রাখিনি। 

প্রিয়.কম: ধন্যবাদ আপনাকে। 

সব্যসাচী হাজরা: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সম্পাদনা: ফারজানা রিংকী/গোরা