বিশ্বের প্রাচীনতম মহামারীর প্রমাণ মিলল জর্ডানের গণকবরে

এস এম রিয়াদ রহমান
প্রিয় নিউজ
প্রকাশিত: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৭:০০
আপডেট: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৭:০০

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন একটি গবেষকদল বিশ্বের প্রাচীনতম লিপিবদ্ধ মহামারীর প্রথম ভূমধ্যসাগরীয় গণকবর বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। এই আবিষ্কার ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শতাব্দীর মধ্যে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যে লাখ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া জাস্টিনিয়ানের প্লেগ সম্পর্কে নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে।

জার্নাল অব আর্কিওলজিক্যাল সায়েন্স-এর ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, এই মহামারীতে আক্রান্ত মানুষের চলাচল, নগরজীবন এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার বিষয়ে বিরল বাস্তবভিত্তিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।

আধুনিক জর্ডানের জেরাশে একটি গণসমাধিস্থল থেকে সংগ্রহ করা দেহাবশেষের ডিএনএ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এটি ছিল একটি এককালীন সমাধি-ঘটনা, যা সাধারণ কবরস্থানের মতো সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠেনি। গত বছর একই গবেষকদল নিশ্চিত করেছিল যে ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস ব্যাকটেরিয়াই এই প্লেগের জন্য দায়ী ছিল।

নতুন গবেষণাটি কেন্দ্রীভূত ছিল ভুক্তভোগীরা কীভাবে জীবনযাপন করতেন, রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কতটা ছিল এবং কেন তারা জেরাশে অবস্থান করছিলেন—এসব প্রশ্নে। খ্রিস্টাব্দ ৫৪১ থেকে ৭৫০ সাল পর্যন্ত চলা এই মহামারীর সময় জেরাশ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বাণিজ্যকেন্দ্র এবং প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রস্থল।

গবেষণার প্রধান লেখক এবং ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার গ্লোবাল, এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জেনোমিক হেলথ সায়েন্সেস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রেইস জিয়াং বলেন, “আগের গবেষণাগুলো প্লেগের জীবাণু শনাক্ত করেছিল। জেরাশের এই স্থানটি সেই জিনগত সংকেতকে মানবিক গল্পে রূপ দিয়েছে—কারা মারা গিয়েছিল এবং একটি শহর কীভাবে সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল।”

তিনি বলেন, “মহামারী কেবল জৈবিক ঘটনা নয়, এটি সামাজিক ঘটনাও। দেহাবশেষ থেকে পাওয়া জৈব প্রমাণকে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত করে আমরা দেখতে পারি রোগ কীভাবে বাস্তব মানুষকে তাদের সামাজিক ও পরিবেশগত প্রেক্ষাপটে প্রভাবিত করেছে। এতে ইতিহাসের মহামারীগুলোকে শুধু লিখিত বর্ণনা নয়, বরং মানুষের বাস্তব স্বাস্থ্য-অভিজ্ঞতা হিসেবে বোঝা যায়।”

ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডা, ফ্লোরিডা আটলান্টিক ইউনিভার্সিটি এবং ইউনিভার্সিটি অব সিডনির প্রত্নতাত্ত্বিক, ইতিহাসবিদ ও জেনেটিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বহুবিদ্যাশাখার দল এই গবেষণাপত্রটি প্রস্তুত করেছে। জিয়াং ও তাঁর সহকর্মীরা দাঁত থেকে সংগৃহীত ডিএনএ বিশ্লেষণ করেছেন।

তারা দেখতে পেয়েছেন, নিহতদের বয়স ও লিঙ্গের বৈচিত্র্য ছিল উল্লেখযোগ্য। জিয়াং বলেন, এতে বোঝা যায় একটি ভ্রাম্যমাণ জনগোষ্ঠী মহামারীর কারণে একই জায়গায় আটকে পড়েছিল—যেমন কোভিড মহামারীর সময় ভ্রমণ প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

“মানুষ চলাচল করে, তারা অস্থায়ী ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে বাস করে। সাধারণ সময়ে তারা ছড়িয়ে থাকে। কিন্তু সংকটের সময় তারা একত্রিত হয়ে যায়,” বলেন জিয়াং। তিনি যোগ করেন, প্রাচীন মহামারীগুলোও ঘনবসতিপূর্ণ শহরে বিস্তার লাভ করত, যেগুলো ভ্রমণ ও পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রভাবে গড়ে উঠেছিল।

খননকার্যে দেখা গেছে, জেরাশের হিপ্পোড্রোম এলাকায় থাকা এই গণকবরে ২০০-র বেশি মানুষকে দাফন করা হয়েছিল। সংরক্ষিত গ্রিক-রোমান ধ্বংসাবশেষের জন্য জেরাশকে মধ্যপ্রাচ্যের পম্পেইও বলা হয়। জিয়াং জানান, নিহতদের মধ্যে পুরুষ-নারী, বৃদ্ধ-তরুণ—সবাই ছিল, এমনকি কর্মক্ষম বয়সের মানুষ ও কিশোরও।

তিনি বলেন, “সেই সময়ে দাস, ভাড়াটে সৈন্যসহ নানা ধরনের মানুষ ছিল, আর আমাদের তথ্য বলছে এরা ছিল চলনশীল জনগোষ্ঠীর অংশ—এটা নতুন কিছু নয়।”

জিয়াং বলেন, এই গবেষণায় আধুনিক মহামারী—বিশেষ করে কোভিড—এর সঙ্গে কিছু মিলও পাওয়া যায়, যেটিকে শুরুর দিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘ভুয়া’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান