ডাইনোসরের পায়ের ছাপ শনাক্ত করবে এআইভিত্তিক ‘ডাইনোট্র্যাকার’ অ্যাপ
আপডেট: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪:৫৩
গবেষকেরা এমন একটি অ্যাপ তৈরি করেছেন, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে কোটি কোটি বছর আগে রেখে যাওয়া ডাইনোসরের পায়ের ছাপ থেকে সম্ভাব্য প্রজাতি শনাক্ত করতে সাহায্য করবে।
গবেষণার সহলেখক ও এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিভ ব্রুসাটে বলেন, “আমরা যখন একটি ডাইনোসরের পায়ের ছাপ পাই, তখন সিন্ডারেলার গল্পের মতো—কোন পা এই ‘জুতার’ সঙ্গে মেলে তা খোঁজার চেষ্টা করি। কিন্তু বিষয়টি এত সহজ নয়। কারণ পায়ের ছাপের আকৃতি শুধু ডাইনোসরের পায়ের গঠন নয়, বরং সে কোন ধরনের বালি বা কাদার ওপর দিয়ে হাঁটছিল এবং হাঁটার সময় পায়ের নড়াচড়ার ওপরও নির্ভর করে।”
প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় ব্রুসাটে ও তাঁর সহকর্মীরা জানান, পূর্ববর্তী এআই সিস্টেমগুলোকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল এমন পায়ের ছাপ দিয়ে, যেগুলো আগে থেকেই নির্দিষ্ট ধরনের ডাইনোসরের বলে চিহ্নিত ছিল। কিন্তু গবেষকদের মতে, যদি সেই সনাক্তকরণে ভুল থাকে, তাহলে এআই সিস্টেমের ফলাফলও ত্রুটিপূর্ণ হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
জার্মানির হেল্মহোল্টজ সেন্টারের গবেষক ও গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক ড. গ্রেগর হার্টমান বলেন, “আপনি কখনও কোনো পায়ের ছাপের পাশে সেই ডাইনোসরটিকে খুঁজে পাবেন না, যে ছাপটি তৈরি করেছিল। তাই প্যালিয়ন্টোলজিস্টদের প্রতি অসম্মান নয়, তবে সম্ভবত আগের কিছু লেবেলিং ভুল ছিল।”
ভিন্ন পদ্ধতি গ্রহণ করে গবেষকরা প্রায় ২,০০০টি লেবেলবিহীন পায়ের ছাপের সিলুয়েট দিয়ে নতুন এআই সিস্টেমটিকে প্রশিক্ষণ দেন। এরপর সিস্টেমটি নিজে বিভিন্ন অর্থবহ বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে নির্ধারণ করে কোন ছাপ কোনটির সঙ্গে কতটা মিল বা অমিল।
গবেষণায় দেখা গেছে, পায়ের আঙুলের বিস্তার, মাটির সংস্পর্শের পরিমাণ এবং গোড়ালির অবস্থানসহ আটটি বৈশিষ্ট্য ছাপগুলোর আকারগত পার্থক্য বোঝাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এই প্রযুক্তির ভিত্তিতে গবেষক দলটি ‘ডাইনোট্র্যাকার’ (DinoTracker) নামে একটি বিনামূল্যের অ্যাপ তৈরি করেছে। এতে ব্যবহারকারীরা কোনো পায়ের ছাপের সিলুয়েট আপলোড করতে পারবেন, সবচেয়ে মিল আছে এমন আরও সাতটি ছাপ দেখতে পারবেন এবং বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করলে মিলের ফলাফল কীভাবে বদলায় তা পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।
হার্টমান বলেন, বর্তমানে বিশেষজ্ঞদের এখনো যাচাই করে দেখতে হয় ছাপগুলো কোন ধরনের মাটিতে পড়েছিল এবং সেগুলোর বয়স বৈজ্ঞানিক অনুমানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না। তবু প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে এআই সিস্টেমটি মানব বিশেষজ্ঞদের শ্রেণিবিন্যাসের সঙ্গে মিল রেখে ছাপগুলোকে একই দলে রাখতে পেরেছে।
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এআই সিস্টেমটি প্যালিয়ন্টোলজিস্টদের আগের একটি পর্যবেক্ষণকে সমর্থন করেছে। ট্রায়াসিক ও প্রারম্ভিক জুরাসিক যুগের কিছু পায়ের ছাপ দেখতে বিস্ময়করভাবে পাখির মতো, যদিও সেগুলো প্রাচীনতম পাখি আর্কিওপটেরিক্সের জীবাশ্ম কঙ্কালের চেয়ে প্রায় ৬ কোটি বছর পুরোনো।
ব্রুসাটে বলেন, “এতে বোঝা যায় এই মিল কেবল কল্পনা নয়। যদি সত্যিই এসব ছাপ পাখিদের হয়ে থাকে, তাহলে পাখিদের উৎপত্তি আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি প্রাচীন—কয়েক মিলিয়ন বছর নয়, বরং কয়েক কোটি বছর।”
তবে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত নয়। ব্রুসাটের ধারণা, এগুলো সম্ভবত এমন মাংসাশী ডাইনোসরদের তৈরি ছাপ, যাদের পা দেখতে অনেকটা পাখির মতো ছিল—হয়তো পাখিদের পূর্বপুরুষ, কিন্তু প্রকৃত পাখি নয়।