ছবি সংগৃহীত

সংগ্রামী নারী কণ্ঠশিল্পী অনন্যার জীবনের গল্প

স্নেহাশীষ ঘোষ
লেখক
প্রকাশিত: ০৮ মার্চ ২০১৬, ১০:২৫
আপডেট: ০৮ মার্চ ২০১৬, ১০:২৫

ছবি: লয়েড তুহিন হালদার 

(প্রিয়.কম) অনন্যা, পুরো নাম লামিয়া ইসলাম অনন্যা। গান করে যাচ্ছেন নিজের মতো করে। গানের পাশাপাশি সামলাচ্ছেন এক গুরু দায়িত্ব। একমাত্র ছেলে আরিয়ানের যে তিনি একই সঙ্গে মা ও বাবা তিনি! খটকা লাগছে? তবে পরিস্কার করেই বলা যাক। কণ্ঠশিল্পী, এই পরিচয়ের পাশাপাশি অনন্যার আরও একটি পরিচয় আছে। তিনি জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী এবং সঙ্গীতপরিচালক আরফিন রুমির সাবেক স্ত্রী। তবে এখন এই এই পরিচয়ে নিজেকে পরিচয় দিতে কড়া আপত্তি তার। এখন তিনি শুধু একটি পরিচয়েই নিজেকে পরিচিত করতে চান তা হল একজন আদর্শ মা। পাশাপাশি একজন কণ্ঠশিল্পী।

রুমির সঙ্গে অনন্যার ঘর ভেঙেছে তা কয়েক বছর হল। এরপর থেকে ছেলে আরিয়ানকে নিয়ে নিজের মায়ের সঙ্গেই থাকছেন তিনি। একজন সন্তানের বড় করতে মা-বাবা দুজনেরই সমান অবদান প্রয়োজন। কিন্তু অনন্যা একা কিভাবে সবকিছু সামলে নিচ্ছেন? জানতে চাইলে অনন্যা বিস্ময়ের সঙ্গে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, ‘একা কোথায়! আমার মা আছে, বোন আছে। সবাই মিলেই বড় করছি আরিয়ানকে। ও এখন স্কুলে ভর্তি হয়েছে। সকাল বেলা মা-ই ওকে স্কুলে দিয়ে আসে। আমি কিংবা আমার বোন গিয়ে স্কুল থেকে নিয়ে আসি। সারাদিন আমরা তিনজন মিলে ওকে আগলে রাখি। সুতরাং তেমন কোন সমস্যাই হচ্ছে না।’

অনন্যা জানালেন তিনি তার ছেলে আরিয়ানকে একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করেছেন। এখানে তো অনেক খরচ। এর যোগান আসছে কিভাবে? রুমি আরিয়ানের নামে যে ২০ লাখ টাকা দিয়েছেন ওখান থেকেই কি তবে আরিয়ানের জন্য খরচ চলছে? অনন্যা জানালেন, ‘রুমি যে টাকা দিয়েছে তা আরিয়ানের নামে ফিক্সড ডিপোজিট করে ব্যাংকে রাখা আছে। এর নমিনি হিসেবে আমাকে রাখা হয়েছে। তবে আরিয়ানের ১৮ বছর না হওয়া পর্যন্ত সেই টাকা কেউ তুলতে পারবে না। শুধুমাত্র এর থেকে যা ইন্টারেস্ট আসবে তা তোলা যাবে। এখন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের যে খরচ তা তো আর এর থেকে চালানো সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি নিজে গান করছি। স্টেজ শো করছি। এখান থেকে যা আসছে তা দিয়েই চলছে সবকিছু।’

ফেসবুকে আরিয়ানের গাওয়া গান মাঝে-মধ্যেই শেয়ার দিতে দেখা যায় অনন্যাকে। তার গলাও খুব ভালো। তো বড় হলে নিশ্চয় ছেলেকে কণ্ঠশিল্পী বানানোর স্বপ্নই বুনছেন তার মা? অনন্যার দ্বিমত, ‘না ও প্রফেশনালভাবে গান করুক এটা আমি চাই না। আমি চাই ও গান করুক তবে শখের বশে। গান করে এখন নিজেকে এবং পরিবারকে চালানো খুবই কঠিন। আমি নিজে ঠেকে তা বুঝতে পারছি। এজন্য আমার ইচ্ছে নেই ওকে প্রফেশনাল কণ্ঠশিল্পী বানানোর। তবে ও যদি চায় আমি আপত্তি করবো না।’

আরিয়ান তার বাবাকে কতটা মিস করে? সে কি তার বাবার কাছে যেতে চায়? অনন্যার উত্তর, ‘আগে করত অনেক। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতার পর ও এখন আর মিস করে না।‘ কি সেই অভিজ্ঞতা? এর উত্তরে অনন্যা সেই অভিজ্ঞতার কথা রিপোর্টে না লেখার শর্তে জানান। তিনি বলেন, ‘আমি চাই না এগুলো লেখার পর আবার নতুন করে ঝামেলা হোক। তাই না লিখতে বললাম কথাগুলো। ‘ অনন্যা জানান রুমির সঙ্গে আরিয়ানের সর্বশেষ দেখা হয়েছে ২০১৪ সালে ২৮ নভেম্বর এবং সর্বশেষ কথা হয়েছে মাস দেড়েক হল।

মা হয়ে একইসঙ্গে মা-বাবা দুজনের দায়িত্ব পালন করা কতটা কঠিন? অনন্যা জানান, ‘অনেক কঠিন। বিশেষ করে ও যখন আমাকে কিছু প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় তা সামলানো আমার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। একদিন ও আমাকে প্রশ্ন করে যে তার স্কুলে বিশেষ কোন অনুষ্ঠানে তার সব বন্ধুদের সঙ্গে তাদের মা-বাবা দুজনই আসে। কিন্তু ওর সঙ্গে কেন শুধু ওর মা যায়? বাবা কেন যায় না? এর উত্তর আমি ওকে দিতে পারিনি। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ও অনেক কিছু বুঝতে শুরু করেছে।’

বিবাহিত জীবন এবং ডিভোর্সের পর বর্তমান জীবন এই দুই সময়ের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? অনন্যার উত্তর, ‘স্বাধীনতায়। যখন আমি বিবাহিত ছিলাম নিজে স্বাধীনভাবে কোন কাজ করতে পারতাম না। প্রতিনিয়ত বাধ্যবাধকতার মধ্য দিয়ে আমার জীবন পার করতে হয়েছে। আমি চাইলেও আমাকে গান গাইতে দেওয়া হত না, বাইরে যেতে দেওয়া হত না। এছাড়া আরও অনেক বিষয় আছে। এখন সেই বাধ্যবাধকতা আর নেই। আমার চোখে মূল পার্থক্য এখানেই।’ 

জীবনের এখনও অনেক সময় পড়ে আছে। বাকি জীবন কিভাবে কাটানোর পরিকল্পনা। আরিয়ানকে নিয়ে এভাবেই? নাকি নতুন কেউ জীবনসঙ্গী হয়ে আসতে পারে? অনন্যার সোজা-সাপটা উত্তর, ‘এখনও অভাবে কিছু চিন্তা করিনি। এখন আমার সব স্বপ্ন আরিয়ানকে নিয়েই। আসলে জীবনসঙ্গী হিসেবে যে কাউকে বেছে নিতে হলে সবার আগে বিশ্বাস প্রয়োজন। এই বিশ্বাস আমার মধ্যে এখন আর নেই। যদি কেউ কখনও এই বিশ্বাস আবারও ফিরিয়ে আনতে পারে তখন দেখা যাবে।’

এভাবেই একমাত্র সন্তান আরিয়ানকে নিয়ে দিনের পর দিন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন অনন্যা। একটাই স্বপ্ন ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ করা। সেই স্বপ্ন পূরণে গানকে বেছে নিয়েছেন সঙ্গী হিসেবে। পহেলা বৈশাখে বিভিন্ন মিক্সড অ্যালবামে প্রকাশিত হচ্ছে তার চারটি গান। আসছে মিউজিক ভিডিও। সামনে আছে দুটি বিদেশ সফর। সব মিলিয়ে ছেলে এবং গানকেই এখন নিজের জীবন হিসেবে দেখেন অনন্যা।