ছবি সংগৃহীত

লম্বা চুলের মজার কথা

sabrina aman reevy
লেখক
প্রকাশিত: ১৫ এপ্রিল ২০১৩, ১৬:৩৯
আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০১৩, ১৬:৩৯

"চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা।" জীবনানন্দ দাসের সেই বনলতা সেন আজও গেঁথে আছে বাঙালির হৃদয়ে। চুল কে কখনো বলা হয় আধার তো কখনো উপমা দেয়া হই রাতের সাথে। বাঙালি নারীর চিরায়ত রুপ তুলে ধরতেও চুলকেই ব্যাবহার করা হয়। আর চুল যদি হয় লম্বা তাহলে তার কদর বেড়ে যায় আরও অনেক বেশি। লম্বা চুল কি তাহলে শুধু বাঙালি নারীর নিজস্ব সম্পদ? তা কেন হবে, রাপুঞ্জেলেরও তো লম্বা চুল ছিল। যে বন্দি ছিল উচু এক দুর্গে কিন্তু তার লম্বা চুলের কারনেই তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যেতে সক্ষম হয় তার প্রেমিক রাজকুমার। এত গেল রুপকথার গল্পের কথা, কিন্তু যুগ যুগ ধরে নারী পুরুষভেদে সব সময় লম্বা চুলের আলাদা কদর পৃথিবী জুড়েই ছিল। পৃথিবীতে লম্বা চুলের ইতিহাস অনেকদিনের। লম্বা চুল রাখা শুধু ফ্যাশন নয় অনেক সময় এটা ঐতিহ্য সংস্কৃতির অংশ হয়েও দাড়ায়। প্রাচীন গ্রীসে লম্বা চুল রাখা সম্পদ ও ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে প্রচলিত ছিল। মনে করা হত প্রাচীন গ্রীসের দেবতারাও যেমন জিউস, একিলিস, এপোলো, পোসাইডেনরা লম্বা চুলের অধিকারী ছিলেন। গ্রীক সেনারাও লম্বা চুল রাখতেন, তবে যুদ্ধে সুবিধার জন্য সামনের চুল ছোট করে ছেঁটে রাখতেন। এসব যোদ্ধারা ছিলেন অভিজাতের প্রতীক এবং বলা হত নিজেদের চুল প্রদর্শন করার জন্য তারা সবার সামনে চুল আঁচড়াতেন। অনেক নেটিভ আমেরিকান পুরুষ তাদের সংস্কৃতির উপর পশ্চিমা প্রভাবের আগমনের আগে লম্বা চুল রাখতেন। চেরোকি কিজেন্ড অনুসারে, পুরুষদের সুদর্শন বোঝাতে তাদের প্রায় মাটি পর্যন্ত লম্বা চুলের কথা বলা হত। এই সংস্কৃতির নারী-পুরুষ এবং উভয়েরই লম্বা চুল রাখার প্রচলন ছিল। বর্তমানে নিজেদের সংস্কৃতি রক্ষার আন্দোলন হিসবেও লম্বা চুল রাখার প্রচলন আছে নেটিভ আমেরিকানদের মাঝে। পশ্চিম আফ্রিকায় সংস্কৃতির অংশ হিসেবে লম্বা চুল সঙ্গে মহিলাদের অত্যন্ত মূল্যবান বলে বিবেচনা করা হয়। লম্বা সাস্থজ্জল চুলের অধিকারী নারীরা সুন্দর স্বাস্থ্য, সম্পদ ও অনেক শিশু জন্ম দেয়ার ক্ষমতা রাখে বলে ধরা হয়। ঐতিহাসিক সুত্রে পূর্ব এশিয়াতে লম্বা চুল সৌন্দর্য ও যৌবনের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। প্রাচীন চায়নাতে লম্বা চুল ঐশ্বর্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হত। সে সময় নারী পুরুষ উভয়েই লম্বা চুল রাখতেন। তারা চুল পেঁচিয়ে বেঁধে রাখতেন। চুল পেঁচিয়ে বাধার জন্য নানা রকম পদ্ধতিও আবিষ্কার করেছিলেন তারা। যৌবন প্রাপ্তির পরে তারা তাদের চুল কাটতেন না। তবে কোন অপরাধের শাস্তি হিসেবে চুল কাটার বিধান ছিল। ষোলশ শতকের দিকে নতুন এক ধরনের চুল রাখার বিধান চালু করা হয় পুরুষদের জন্য। তাদের পেছনের চুল লম্বা করে বেণি করে রাখা হত তবে মাথার সামনের দিক কামিয়ে রাখা হত। দক্ষিণপূর্ব এশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াতে সতেরশো শতকের আগ পর্যন্ত নারী পুরুষ উভয়েই লম্বা চুল রাখতে পছন্দ করত। এর পরে ধীরে ধীরে পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুপ্রবেশের ফলে এই চল কমে আসে। তবে থাইল্যান্ডে পুরুষদের পাশাপাশি এখন নারীরাও ছোট চুল রাখতেই পছন্দ করেন। যদিও তা অন্য সংস্কৃতির অনুপ্রবেশের ফলেই হয়েছে তবে এটা নিয়ে নানান কাহিনি প্রচলিত আছে যেমন কোন এক রাজা খাবারে একবার লম্বা চুল পাওয়ার কারনে সব নারীদের ছোট চুল রাখতে নির্দেশ দিয়েছিলেন তাই তারপর থেকে সব মেয়েরা ছোট চুল রাখে। প্রাচীন জাপানে পুরুষরা বড় চুল রাখতেন। তবে নারীদের চুল হতে হত তাদের শারীরিক উচ্চতার থেকেও বেশি দীর্ঘ। প্রাচীন জাপানে নারীদের সাথে পুরুষদের মেলামেশার সেরকম সুযোগ ছিল না। তাই তারা নারীদের সৌন্দর্য বিচার করতেন তাদের চুল দিয়ে। যেই নারীর চুল যত লম্বা সে ততো সুন্দর বলে বিবেচিত হত। বিভিন্ন ধর্মেও লম্বা চুলের গুরুত্ত অনেক বেশি। ইসলামে পুরুষের যদিও এখন ছোট চুলের প্রচলন বেশি তবে লম্বা চুল রাখার বিধান আছে, তবে তা হতে হবে কাঁধ পর্যন্ত। আগে বেদুইন মুস্লিমদের মাঝে চুল লম্বা রাখার প্রচলন ছিল। তারা চুল লম্বা বেণি করে রাখত। তবে ধীরে ধীরে এই প্রথা কমে এসেছে। বিভিন্ন মুস্লিম অধ্যুষিত দেশে যেমন মিশর বা আফ্রিকার মুস্লিম দেশগুলোতে ছেলেদের বড় চুল রাখাকে ঘৃণার সাথে দেখা হয়। মিশরের পুলিশেরা ছেলেদের লম্বা চুল রাখাকে শইতানের প্ররচনা হিসেবে গণ্য করে। মিশরের মত আফগানিস্তানেও ছেলেদের লম্বা চুল রাখাকে ভাল চোখে দেখা হয়না। সেখানে ছেলেরা লম্বা চুল রেখে ধরা পরলে পুলিশ তাদের চুল কেটে দেয়। যদিও নারীদের জন্য কুরআন বা হাদিসে নির্দিষ্ট কোন নির্দেশ নেই মেয়েদের চুলের ব্যাপারে তবে মেয়েদের লম্বা চুল রাখাকেই প্রাধান্য দেয়া হয়। শিখ ধর্মের ৫টি প্রধান আচারের মধ্যে একটি লম্বা চুল রাখা নারি পুরুশ নির্বিশেষে। শিখ ধর্মের গুরু গোবিন্দ সিং ১৬৯৯ সালে শিখ জাতীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন লম্বাচুল রাখতে। লম্বা চুল শিখদের শক্তি ও জীবনীশক্তি বোঝায়। ইহুদিরা ছোট চুল রাখাকে দুঃখের প্রতীক হিসেবে ধরে। যদিয়ও বৌদ্ধ ভিক্ষুরা মাথা কামিয়ে রাখেন তবে গৌতম বুদ্ধের লম্বা চুলই ছিল।