ছবি সংগৃহীত

প্রিয় সম্পর্ক-১৫১: "আমার আপু আজ বিয়ের ৬ বছর পর এক ভয়ানক সত্য বললো... "

রুমানা বৈশাখী
বিভাগীয় প্রধান (প্রিয় লাইফ)
প্রকাশিত: ২৪ ডিসেম্বর ২০১৫, ১৬:৪৯
আপডেট: ২৪ ডিসেম্বর ২০১৫, ১৬:৪৯

ছবিটি রূপক, ফটো সোর্স- indianweddingphotography14.blogspot.com

(প্রিয়.কম) জীবন থাকলে সম্পর্ক থাকবেই। আর সম্পর্ক থাকলে থাকবে সমস্যা। প্রতিদিন ফেসবুকের ইনবক্সে ও ই-মেইলে আমরা অসংখ্য সম্পর্ক ভিত্তিক প্রশ্ন পাই, যেগুলোর কথা হয়তো কাউকেই বলা যায় না। পাঠকদের করা সেইসব গোপন প্রশ্নের উত্তর দিতেই আমাদের নিয়মিত আয়োজন "প্রিয় সম্পর্ক"। আর সম্পর্ক ভিত্তিক সেই প্রশ্নগুলোর উত্তরে পরামর্শ দিচ্ছেন গল্পকার রুমানা বৈশাখী, এডিটর ইন চার্জ (লাইফ ও সায়েন্স), প্রিয়.কম। 

আপনি চাইলে নিজের এমনই কোন একান্ত ব্যক্তিগত সমস্যার কথা লিখে জানাতে পারেন আমাদের। আমরা প্রতিদিন চেষ্টা করবো বাছাইকৃত কিছু সমস্যার সমাধানে কাঙ্ক্ষিত পরামর্শটি দেবার। সমস্যার কথা লিখে জানান আমাদের ফেসবুক পেজের ইনবক্সে। নাম গোপন রাখতে চাইলে লিখে দেবেন "নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক"। আমাদের পেজ লিঙ্ক- https://www.facebook.com/priyo.answers

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানিয়েছেন নিজের সমস্যার কথা। 

"নাম গোপন রাখবেন আপু প্লিজ।  সমস্যাটা আমার বোনের। বিয়ের পর আর দশটা মেয়ের মত ঘরের বৌ-এর মত না হয়ে মেয়েই রয়ে গিয়েছিল। ফলাফল স্বরুপ সকাল ১০ টায় ঘুম থেকে ওঠা, রান্নাবান্না না করা। এতে শাশুড়ি অসন্তুষ্ট  হন আর আকার ইংগিতে কথা শোনান। পরে সে বুঝতে পেরে কিচেনে যাওয়া শুরু করে। কিন্তু এবারও সমস্যা।শাশুড়ি ওর রান্না পছন্দ করে না। কেউ ওর প্রশংসা করলে উনি নাক সিটকান। ও কিছু রান্না করলে একই আইটেম তিনি দিগুণ পরিমাণে রাঁধেন। কাজের মেয়েদের দিয়ে পর্যন্ত বলান যে আমার আপু নোংরা, রুম ক্লিন রাখে না।

উল্লেখ্য আমার বাসা থেকে অনেকবার মানা করার পরও আব্বু, চাচা সবসময় অনেক উপঢৌকন পাঠান সেখানে। মেয়ের সুখ আগে টাইপ মেন্টালিটি। এর মধ্যে আপুর মেয়ে হল আর বিয়ের ৬ বছর কেটে গেল। আপুর স্বামী মায়ের এসব ব্যাপারে উদাসীন। এক তো মাকে অনেক ভালবাসেন, তার উপর উনার ইনকাম ভাল না, তাই মা বাবার টাকার উপর নির্ভরশীল। বিয়ের আগে উনার ইনকাম সোর্স নিয়ে অনেক শুনেছিলাম যা বিয়ের পর দেখি ৭০% মিথ্যা। ঘটকের মিথ্যার জন্য এরকম হয়।

আমার আপু বেশ স্টাইলিশ। তাও ওরা আপুকে গেঁয়ো বলত। তাই আপু যখন স্টাইল এর মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিল, এবার শুরু হল সন্দেহ। কী দরকার এত কিছুর! আপু আর ওর স্বামীর মধ্যে এই টাকা নিয়ে মনমালিন্য চলেই আসছে। উনি আমার চাচা থেকে ধার নিয়ে ব্যাবসা করছেন যেটার উন্নতি বা লস কিছুই আপুকে জানান না। আর টাকা ফেরত দেওয়ার কথা তো দুরের ব্যাপার।এ ত কিছুর মধ্যে মেয়ে নিয়েও সমস্যা। মেয়ের নানাবাড়ি আসা ওদের পছন্দ না। আপু আমাদের বাসায় ১ সপ্তাহের বেশি থাকলেই ওরা প্রব্লেম ক্রিয়েট করে।

আর আমার আপু আজ বিয়ের ৬ বছর পর এসে এক ভয়ানক সত্য বলল। তা হল সে সেক্সুয়ালি প্লিজড না কারণ ওর স্বামী ফিজিক্যালী উইক। এখন ও স্বামী কে ডাক্তার দেখাতে বললে তিনি বললেন এত বছর পর এটা বুঝলো? উনার মতে উনাদের মধ্যে মিলমিশের সমস্যা হওয়ায় এখন আপুর এমন মনে হচ্ছে। এটা নিয়ে খুব ঝগড়া হয় ওদের আর উনি খারাপ ব্যাবহার করেন।তা ও আপু জোর করে নিয়ে যান ডাক্তার এর কাছে। কিন্তু ওর স্বামী ওষুধ খান না। ইগো প্রব্লেমে সে নিজের স্ত্রী কে ডিপ্রাইভ করছে এটা সে বুঝে না। 

আপু কী করবে বুঝতে পারছে না। এভাবেই কি এক ছাদের নিচে কাটিয়ে দিবে?আপুর বয়স ২৭ বছর। ভাইয়ার ৩৫ বছর। আর আপু ব্যাক করে কী করবে? বি বি এ কমপ্লিট করে আর পড়াশুনা করে নাই। আব্বু আম্মু অনেক বলসে পড়তে কিন্তু আলসেমি করে সে আর পড়ে নি। আবার মেয়ে ফেরত আসবে এটা আব্বু-চাচা মানতে নারাজ। আর এই সমস্যার কথা তাদের কীভাবে বলবে আপু?তাও বিয়ের ৬ বছর পর। ডিভোর্স নিয়ে নতুন করে শুরু করা সংসারে স্বামী কেমন হবে সেটাও ব্যাপার। ডিভোর্স-ই কি সমাধান? সমাজ তো আপুর উপর ই আঙুল তুলবে। ডিভোর্স নেবে, নাকি এভাবেই কেটে যাবে জীবন।"

পরামর্শ:

দেখুন আপু, শুরুতেই বলে নিচ্ছি যে আমি যা বলবো সেটা আপনাদের ভালো নাও লাগতে পারে। কিন্তু তারপরও যেহেতু পরামর্শ চেয়েছেন, আমি কিছু কথা বলবোই। 

একটা মানুষ যদি জীবনে সবকিছুই একসাথে চান, তাহলে আসলে কিছুই পাবেন না। এবং আমার মনে হয় আপনার বোনের সাথে ঠিক তাই হতে চলেছে। আপনার বোন একই সাথে সবকিছুই চাইছেন, যা পাওয়া অসম্ভব। তিনি শাশুড়ি ভালো চাইছেন আবার স্বামী সুখও চাইছেন। ডিভোর্স চাইছেন, আবার এটাও চাইছেন যে দ্বিতীয় স্বামী ভালো হবে সেই গ্যারান্টি। দুই নৌকায় পা দিয়ে তো চলবে না না,আপু। ডিভোর্স নারীর হোক বা পুরুষের, কিছু ফিসফাস হবেই। আর সেটুকু মেনে নিয়েই ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। অন্যদিকে দ্বিতীয় স্বামী ভালো হবে কি হবে না, সেই গ্যারান্টি কি অগ্রিম দেয়া যায় বলুন? দ্বিতীয় বিয়ে করতে চাইলে এই ঝুঁকিটুকু তো নিতেই হবে। 

এবার আসি সমস্যার সমাধানে। আপনার আপুর কোন সমস্যাই এমন নয় যে যেটার সমাধান অসম্ভব। তিনি নিজে যদি শক্ত ভাবে চেষ্টা করেন, সমাধান সম্ভব আসলে। এইসব সমস্যা কিছুই হতো না, যদি তাঁর নিজে একটি ক্যারিয়ার থাকতো এবং তিনি নিজে উপার্জন করতেন। টাকার জন্য শ্বশুরবাড়ির প্রতি নির্ভরশীল না হলে জীবনে যন্ত্রণা কমে যেত অনেক খানি। যাই হোক, এখন যা করতে হবে সেটা বলি- 

তাঁর শাশুড়ি ও স্বামী তাঁর সাথে খারাপ করেছেন সন্দেহ নেই। কিন্তু বিনিময়ে আপুও ঝগড়াঝাঁটি করে আসলে কিছুই পাবেন না। আপুকে বুঝতে হবে যে স্বামী টাকা উপার্জনের মেশিন নয় বা পৃথিবীতে সকলেই অঢেল টাকা উপার্জন করতে পারে না। তাই টাকা নিয়ে স্বামীর সাথে ঝগড়া করা চলবে না। এতে সম্পর্ক কেবল খারাপই হবে। আর অন্যদিকে শারীরিক দুর্বলতার ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য। স্বামীর সাথে ৬ বছর সংসার করেছেন আপু, একটি সন্তানেরও জন্ম দিয়েছেন। তাই স্বামী যে একেবারেই অক্ষম, এটা মোটেও বলা যাবে না। হ্যাঁ, সমস্যা নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু সেটার সমাধান জোর করে বা ঝগড়া করে হবে না। এটার সমাধান কেবলই পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে হতে পারে। যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজেদের প্রয়োজন বুঝে মানিয়ে নেয়া তো অবশ্যই, একই সাথে স্বামীকে চিকিৎসার জন্য উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রেও। আপনার আপু যদি স্বামীর এই দুর্বলতার কথা সবাইকে বলে বেড়ান, তাতে স্বামীর সাথে সম্পর্ক আরও খারাপ হলে, ফলাফল স্বরূপ দুজনেই অতৃপ্ত জীবন যাপন করবেন। আপুকে আগে স্বামীর সাথে সম্পর্ক ভালো করতে হবে, ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। তারপর তাঁকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে চিকিৎসার জন্য। কাজটি কঠিন অলেও অসম্ভব নয়। 

তবে হ্যাঁ, সম্পর্ক ভালো করতে গেলে শ্বশুরবাড়ির ঘেরাটোপ থেকে আপুকে বের হতে হবে। আপনার বাবা-চাচাদের মাধ্যমে আপুর বরের সাথে কথা বলান। কথা হবে আলাদা সংসারের ব্যাপারে। আপুর স্বামী আলাদা ব্যবসা করছেন, আলাদা বাড়ি নিতে অসুবিধা কোথায়? বাবা- চাচাদের বলতে বলুন যে স্ত্রী-কন্যা নিয়ে জীবন কাটাতে চাইলে আলাদা বাসা নিতেই হবে। আর যদি একান্তই আলাদা বাসা নেয়া সম্ভব না হয়, তাহলে আপুকে বলুন স্বামী ও সন্তান নিয়ে দেশের বাইরে যাবার কথা ভাবতে। দেশের বাইরে গেলে অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে যাবে। শাশুড়ি কাছে থাকবে না বিদায় সম্পর্ক উন্নত হবে, আপনার দুলা ভাইয়ের ভালো চিকিৎসা হবে, অন্যদিকে দুজনেরই কাজ করার সুযোগ থাকছে বিধায় কেউ কারো ওপরে নির্ভরশীল হবে না এবং আর্থিক কষ্টটাও থাকবে না।  

আরেকটি কথা আপু, দুলাভাইয়ের দুর্বলতা নিয়ে বলতে গেলে এখন কিন্তু আঙ্গুল আপুর দিকেই উঠবে। এখন অনেকেই বলে বসবেন যে ৬ বছর পর এখন আপুর হয়তো কারো সাথে পরকীয়া হয়েছে, শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে। তাঁর সাথে তুলনা করে তাই দুলাভাইকে দুর্বল লাগছে ইত্যাদি। তাই বেশি মানুষকে কথাটা না বলে কেবলই নিজের মাকে বলতে বলুন। কাউকে বলার দরকার হলে মা-ই নাহয় বলবেন। 

ডিভোর্স না চাইলে একটাই সমাধান, ঝগড়া বাদ দিয়ে বুদ্ধি করে কাজ করতে হবে।  

 

বিশেষ দ্রষ্টব্য 

আমি কোন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক বা আইনজীবী নই। কেবলই একজন সাধারণ লেখক আমি, যিনি বন্ধুর মত সমস্যাটি শুনতে পারেন ও তৃতীয় ব্যক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু পরামর্শ দিতে পারেন।  পরামর্শ গুলো কাউকে মানতেই হবে এমন কোন কথা নেই। কেউ যদি নতুন কোন দিক নির্দেশনা পান  বা নিজের সমস্যাটি বলতে পেরে কারো মন হালকা লাগে, সেটুকুই আমাদের সার্থকতা। কেউ ব্যক্তিগত ভাবে দেখা করে বা কাউকে না জানিয়ে গোপনে পরামর্শ চাইলে যোগাযোগ করতে পারেন এই পেজে। লিঙ্ক- https://www.facebook.com/%E0%A6%B0%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A7%E0%A6%A8-%E0%A6%87%E0%A6%B6%E0%A6%95%E0%A7%81%E0%A6%B2-rondhon-school-209354669156097/