ছবি সংগৃহীত
ওসি দারোগা পদের মান বাড়লেও থানার পরিবেশ আগের মতোই (যুগান্তর)
আপডেট: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ১০:৫১
শান-শওকত বেড়েছে ওসিদের। মানও বেড়েছে তাদের। দ্বিতীয় শ্রেণীর পদমর্যাদা থেকে ইন্সপেক্টর পদটি এখন প্রথম শ্রেণীর। একইভাবে পদমর্যাদা বেড়েছে সাব-ইন্সপেক্টরদেরও। তৃতীয় থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তা হয়েছেন তারা। তবে তাদের আচরণের মান বাড়েনি এতটুকুও। সেবার মান বাড়াতে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকে থানাকে ঢেলে সাজানো শুরু হয়। সাধারণ মানুষের হয়রানি কমাতে থানায় ডিউটি অফিসারের পাশে সার্ভিস ডেলিভারি অফিসার ও অপারেশন অফিসারকে পদায়ন করা হয়। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পাশাপাশি অতিরিক্ত একজন ইন্সপেক্টরকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়। শুরুর দিকে কিছুদিন ভালো চললেও পর্যায়ক্রমে পরিস্থিতি আরও চরম অবনতির দিকে যেতে থাকে। উন্নত সেবার পরিবর্তে থানায় সাধারণ মানুষের হয়রানি বাড়তে থাকে। বন্দুকযুদ্ধ, ক্রসফায়ার ও গুমের ভয় দেখিয়ে ব্যাপকহারে বেড়ে যায় চাঁদাবাজি। নির্যাতিত হয়ে থানা হাজতেই মৃত্যুর ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের অন্তত দশটি থানায় অনুসন্ধান চালিয়ে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশ মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, "ইন্সপেক্টর ও সাব ইন্সপেক্টরদের পদোন্নতি তাদের কর্মক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। তাদের কর্ম উৎসাহ-উদ্দীপনা বেড়েছে। কাজে বেগবান হয়েছে।" পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, থানাকে ঢেলে সাজানোর অংশ হিসেবে ২০০৭ সালের ১ মার্চ ঢাকা মহানগরের ৯টি থানায় প্রথম সার্ভিস ডেলিভারি অফিসার পদায়ন করা হয়। এরপরই পর্যায়ক্রমে দেয়া হয় সার্ভিস ডেলিভার অফিসার। ২০১০ সালের ৪ অক্টোবর রাজধানীসহ সারা দেশের থানায় ইন্সপেক্টর নিয়োগ করা হয়। ২০১২ সালের ৩০ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ শাখা-২ এক প্রজ্ঞাপনে পুলিশ পরিদর্শক পদকে প্রথম শ্রেণীর নন-ক্যাডার পদে এবং পুলিশ সার্জেন্ট ও এসআই/টিএসআইর পদকে তৃতীয় শ্রেণী থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে উন্নীত করা হয়। এর আওতায় ছিলেন তিন হাজার ২০০ পরিদর্শক এবং ১৮ হাজার এসআই/সার্জেন্ট। গত কয়েকদিন রাজধানীর খিলগাঁও, শেরে বাংলানগর, শাজাহানপুর, সবুজবাগ, যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর ও শাহবাগসহ অন্তত ১০টি থানা ঘুরে থানা পুলিশের সেই চিরচেনা চিত্রটিই চোখে পড়েছে। থানায় আসা ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, থানায় এসে হয়রানির শিকার হয়েছেন। জিডি, মামলা করতে ঘুষ দিতে হচ্ছে। পুলিশের আচরণেরও কোনো পরিবর্তন হয়নি। থানায় ডেকে নিয়ে গ্রেফতার, রিমান্ড এমনকি ক্রসফায়ারে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়েছে এমন একাধিক ঘটনাও বেরিয়ে এসেছে। যেসব পুলিশ কর্মকর্তা বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়ায় অনেক পুলিশ কর্মকর্তা আরও বেপরোয়া আচরণ করছেন। জিডি করলেন তো সম্মানী দেন : ডিউটি অফিসারের কক্ষের সামনে জিডি বা কোনো অভিযোগ করতে ‘কোনো টাকা লাগে না’ লেখা থাকলেও টাকা নেয়া বন্ধ হয়নি। বুধবার বেলা ১১টা ২০ মিনিটে আনোয়ারুল হক নামে এক ব্যক্তি খিলগাঁও থানায় জাতীয় পরিচয়পত্র ‘হারানো’ বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি করতে যান। অভিযোগটি নিয়ে অপারেটর এন্ট্রি করেন। তখন ডিউটি অফিসার তার চেয়ারে ছিলেন না। একটু পরেই ডিউটি অফিসার শেখ রাসেল চেয়ারে এসে বসেন। অভিযোগপত্রে স্বাক্ষর করেন শেখ রাসেল। জিডি নম্বর দেন-৫৪৪। এরপরই ডিউটি অফিসার চেয়ার থেকে উঠে যান। তার পাশে থাকা অপারেটর বলেন, জিডি করলেন তো সম্মানী দেন। স্যার স্বাক্ষর করলেন, তাকে কিছু দিতে হবে না। পকেট থেকে দু’শ টাকা দিয়ে বেরিয়ে আসেন আনোয়ারুল হক। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সায়েম নামে এক যুবকের সঙ্গে শাজাহানপুর থানার গেটের সামনে কথা হয়। তিনি জানান, সোমবার রাতে তার একটি ল্যাপটপ ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। ওই বিষয়ে থানায় অভিযোগ করতে গেলে তাকে নানাভাবে হয়রানি করা হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, থানায় অভিযোগ করতে গেলে বলে, ছিনতাইকারীকে যেহেতু চিনতে পারেননি, মামলা বা অভিযোগ করে লাভ কি। মামলা নেয়া যাবে না। একপর্যায়ে একটি জিডি করে যেতে বলা হয় তাকে। কিন্তু তিনি জিডি না করে ক্ষোভে বেরিয়ে আসেন থানা থেকে। বলেন, ল্যাপটপ তো গেছেই, এখন অভিযোগ করতেও হয়রানি ও অর্থ ব্যয়। শুধু শাজাহানপুর থানায় নয় ডিএমপি’র বিভিন্ন থানায় জিডি বা মামলা করতে গিয়ে হয়রানির আরও একাধিক ঘটনা জানা গেছে। গত ২৬ জানুয়ারি তুরাগের পাকুন্দিয়া এলাকার মৃত জয়নালের মেয়ে মুক্ত তুরাগ থানায় জিডি করতে গিয়ে পুলিশের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মুক্তা জানান, তার চাচাতো ভাই ফারুক তাদের বাড়িটি দখল করতে চায়। এ বিষয়ে তিনি তুরাগ থানায় জিডি করতে গেলে থানার অপারেশন অফিসার এসআই সাহাবউদ্দীন জিডি না নিয়ে উল্টো তাকে গ্রেফতারের হুমকি দেন। সাহাবউদ্দীন তাকে বলেন, ফারুক আমাকে মাস গেলেই বকশিশ দেয়। ফারুকের বিরুদ্ধে জিডি নিয়ে কি আমি বকশিশ হারাব। যা ভাগ থানা থেকে। নইলে গ্রেফতার করে জেলে পাঠাব। বাসা থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে মিথ্যা মামলা দেয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত বছরের ২৭ জুলাই রাতে যাত্রাবাড়ী থানার মিরহাজীরবাগের আবদুল্লাহ আল মামুন নামে এক ব্যক্তিকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে ডাকাতি ও অস্ত্র মামলায় জড়িয়ে দিয়েছে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ। তার বিরুদ্ধে যাত্রাবাড়ী থানার এএসআই আবদুর রহমান মামলা দুটি করেন। মামুনকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে এএসআই আবদুর রহমান মিথ্যা মামলা দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তার বড় ভাই মুক্তিযোদ্ধা শামসুজ্জামান বাবুল। কী কারণে তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছে সে ব্যাপারেও কিছু জানায়নি স্বজনদের। অথচ এএসআই আবদুর রহমান বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে ডাকাতি ও অস্ত্র মামলা দিয়েছে। কিন্তু এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত জানিয়ে মামুনের ভাই শামসুজ্জামান বাবুল বলেন, কোনো কারণ ছাড়াই আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে দুটি মিথ্যা মামলা দেয়া হয়েছে। বিনা দোষে তাকে আদালতে পাঠানো হয়। প্রায় ৬ মাস তিনি পুলিশের রোষানলে পড়ে বিনা দোষে জেল হাজতে ছিলেন। গত মাসে তিনি জামিনে বেরিয়েছেন। শামসুজ্জামান বাবুল এ ব্যাপারে পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে গত ১০ অক্টোবর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগপত্রে এলাকার দু’শ ব্যক্তি মামুন নির্দোষ বলে সাক্ষ্য দেন। অভিযোগপত্র এন্ট্রি নম্বর-৭৭৯। কিন্তু প্রায় চার মাস পেরোলেও ওই অভিযোগের কোনো তদন্তই হয়নি। গত ২৮ ডিসেম্বর রাজধানীর শ্যামপুরের ঢালকা নগর লেনের জুয়েল ও লিখন নামে দুই ব্যক্তিকে র্যাব-১০ আটক করে শ্যামপুর থানায় হস্তান্তর করে। শ্যামপুর থানার ওসি আবদুর রশিদ জুয়েল ও লিখনের কাছ থেকে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন বলে অভিযোগ ওঠে। ওই ওসির বিরুদ্ধে গত ১ ফেব্র“য়ারি বাংলাদেশ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলনও করেছেন জুয়েলের মা দুলালী বেগম। দুলালী বেগমের অভিযোগ, এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করলে ওসিকে তিনি ১০ হাজার টাকা দেন। কিন্তু তাতে খুশি হননি ওসি। একটি পেন্ডিং মামলায় তাদের গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠিয়ে দেন তিনি। তাদের আদালতে পাঠিয়েই ক্ষান্ত হননি জামিনে জুয়েল বেরোনোর পর বাসায় গিয়ে আবারও বাকি ৯০ হাজার টাকা দাবি করছেন ওসি। চাঁদার কথা অস্বীকার করে ওসি আবদুর রশিদ বলেন, টাকা চাওয়া এবং নেয়ার প্রশ্নই আসে না। র্যাবের আসামি আমি টাকা চাইতে পারি? আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে। শুধু শ্যামপুর থানার ওসি আবদুর রশিদের বিরুদ্ধেই নয়, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন থানার ওসির বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ উঠছে। পেশাগত দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগে রাজধানীর কাফরুল থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ আলীকে গত ২২ জানুয়ারি রাতে প্রত্যাহার করা হয়। এরই মধ্যে তাকে অন্য থানায় পোস্টিং দেয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে। গত মাসেই সিলেট ও লক্ষ্মীপুরেও ৫ পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়। সিলেটের সোবহানীঘাটে একটি পিকআপ ভ্যান থেকে সার্জেন্ট শফিক পাঁচশ’ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চালক দু’শ টাকা দিলে তিনি চালককে সোবহানীঘাট পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে মারধর করেন। চাঁদাবাজির অভিযোগে তাকে প্রত্যাহার করা হয়। জিডি তদন্তে এক লাখ টাকা দাবি : তুরাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) তদন্তে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তুরাগ থানাধীন চণ্ডালভোগের মৃত আইজ উদ্দিন মাতবরের ছেলে মতিউর রহমান জানান, চণ্ডালভোগ মৌজায় তার একটি প্লট আমিরুল ইসলাম খোকা নামে এক ব্যক্তি অবৈধভাবে দখলে পাঁয়তারা করছে। সম্প্রতি ওই প্লটে মতিউর রহমান নির্মাণ কাজ করতে গেলে আমিরুল বাধা দেয় এবং মালিকানা দাবি করেন। এ ব্যাপারে মতিউর গত ১১ জানুয়ারি তুরাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। থানা পুলিশের এক কর্মকর্তা তার কাছ থেকে তদন্ত যাওয়ার জন্য এক লাখ টাকা দাবি করেন। ওই কর্মকর্তা তাকে বলেন, এত টাকার জমি তদন্ত করতে, টাকা ছাড়া কি হয়? পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ : গত শনিবার গভীর রাতে রাজধানীর পল্লবীর ইরানি ক্যাম্পে বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে জনি নামে এক গাড়িচালককে পল্লবী থানা পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। পরদিন সকালে পুলিশ হেফাজতে তার মৃত্যু হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকও বলেন, মৃতের গায়ে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। নিহত জনির মামা আবদুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, বিয়ে অনুষ্ঠানে পুলিশ গিয়ে ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এরপরই জনিসহ ৭ জনকে আটক করে। থানায় জনিকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। রোববার সকালে তার অবস্থা আশংকাজনক হওয়ায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় এসআই জাহিদ হোসেনকে সোমবার প্রত্যাহার করা হয়েছে। হতাশ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও : পদমর্যাদা বাড়ার পরও পুলিশের এ রকম আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এসব ঘটনায় পুলিশের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তাও ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, পদমর্যাদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অবশ্যই ইন্সপেক্টর এবং সাব-ইন্সপেক্টরদের আচরণের পরিবর্তন জরুরি। এর জন্য রাজনৈতিক প্রভাবও অনেকাংশে দায়ী বলে পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করছেন। বেশ কয়েকজন পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অনেক ওসি ও এসআই রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশও পালন করেন না।