ছবি সংগৃহীত
ইসলামের পারিবারিক ও সামাজিক বিধান : প্রবন্ধ নং-১২ : আত্মীয় স্বজনের অধিকার : কোরান মাজিদের নির্দেশনা
আপডেট: ২৭ মার্চ ২০১৪, ১২:১১
আত্মীয় স্বজনের অধিকার ইসলামে পরিবার কেবল তাৎক্ষণিক পরিবারের সদস্যদেরকেই অন্তর্ভুক্ত করে না; বরং তা পিতা মাতা, স্বামী স্ত্রী, ছেলে মেয়ে ও অন্যান্য নিকট আত্মীয়দেরকেও অন্তর্ভুক্ত করে। ইসলাম পরিবারের একটি বৃহৎ ধারণার মাধ্যমে রক্ত ও বিবাহ সম্পর্কিত সকল আত্মীয় স্বজনকে একটি সুদৃঢ় বন্ধনে পরিবেষ্টিত করে এবং তাদের স্ব স্ব অধিকার ও কর্তব্যের বর্ণনা দেয়। আল্লাহ তাআলা ও তার রাসূলের আদেশ অনুসারে একজন মুসলিমকে এসব অধিকার ও কর্তব্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। যদি কেউ তা না করে, তবে সে এমন অপরাধে অপরাধী হবে, কিয়ামতের দিন যা তাকে ক্ষমা করা হবে না; যদি না সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তাকে ক্ষমা করে। কোরান মাজিদ পারিবারিক অধিকার ও কর্তব্যের গুরুত্ব সম্পর্কে বারংবার বর্ণনা দিয়েছে। নিচে কিছু মৌলিক নির্দেশনা তুলে ধরা হল: কোরান মাজিদের নির্দেশনা জ্ঞাতি সম্পর্ক রক্ষার গুরুত্ব নিশ্চয় আল্লাহ মাছি কিবা তার চেয়েও ছোট কিছুর উপমা দিতে লজ্জা করেন না। সুতরাং যারা ঈমান এনেছে তারা জানে, নিশ্চয় তা তাদের রবের পক্ষ থেকে সত্য। আর যারা কুফরি করেছে তারা বলে, আল্লাহ এর মাধ্যমে উপমা দিয়ে কী চেয়েছেন? তিনি এ দিয়ে অনেককে পথভ্রষ্ট করেন এবং এ দিয়ে অনেককে হেদায়েত দেন। আর এর মাধ্যমে কেবল ফাসিকদেরকেই পথভ্রষ্ট করেন। যারা আল্লহর দৃঢ়কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করে এবং আল্লাহ যা জোড়া লাগানোর নির্দেশ দিয়েছেন তা ছিন্ন করে এবং জমীনে ফাসাদ করে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত। (বাকারা, ২:২৬-২৭) জীবনের সঠিক নির্দেশনা ও হেদায়েত কেবল আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে। অধিকন্তু, আল্লাহ তাআলা এই হেদায়েত তাদেরকেই প্রদান করে থাকেন যারা আন্তরিকভাবে তা কামনা করে। আর তাদেরকে দেন না, যারা তার দেওয়া সীমাকে লঙ্ঘন করে। আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা আল্লাহ তাআলার নির্দেশ। কোরান মাজিদ বলে, যারা এই বন্ধনকে ছিন্ন করে তারা আল্লাহ প্রদত্ত সীমাকে লঙ্ঘন করে এবং ফলে আল্লাহ তাআলার হেদায়েত লাভ থেকে বঞ্চিত হয়। অতএব, জ্ঞাতি সম্পর্ক রক্ষা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হেদায়েত লাভের একটি অন্যতম পূর্বশর্ত। যারা পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন করার মত অপরাধ করে, তারা নিজেদেরকে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হেদায়েত লাভ করা থেকে বঞ্চিত রাখে। এজন্যেই কোরান মাজিদ বলে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।’ আত্মীয় স্বজনের অধিকার নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফ, সদাচার ও নিকট আত্মীয়দের দান করার আদেশ দেন। তিনি অশ্লীলতা, মন্দকাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। (আন-নাহল, ১৬:৯০) ইসলামে ন্যায় ও ইহসান’ এর আমল নামাজ আদায় ও রোজা পালনের মতই সমান গুরুত্বপূর্ণ। তা এই কারণে যে, ইসলাম একটি পরিপূর্ণ দীন ও জীবন ব্যবস্থা। তা একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবনের মত সামাজিক জীবনেরও পূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করে। উপর্যুক্ত আয়াত থেকে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, ন্যায় ও ইহসানের আমল নিকট আত্মীয়দের থেকেই শুরু করতে হবে। এই আদেশের গুরুত্ব এথেকে সহজেই প্রতীয়মান হয় যে, আয়াতটি জুমার খুতবার দ্বিতীয় অংশে সংযুক্ত করে দেয়া হয়েছে এবং মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি মসজিদে তার তেলাওয়াত হয়ে থাকে। এভাবে প্রত্যেক মুসলমানকে তার আত্মীয় স্বজনের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে প্রত্যেক জুমার দিন স্মরণ করিয়ে দেয়া হয় এবং তাদেরকে আত্মীয় স্বজনের সাথে দয়া ও ইহসানের সাথে আচরণ করতে বলা হয়। তোমরা ইবাদত কর আল্লাহর, তার সাথে কোন কিছুকে শরিক কর না। আর সদ্ব্যবহার কর মাতাপিতার সাথে, নিকটাত্মীয়দের সাথে, ইয়াতিম, মিসকিন, নিকটাত্মীয়-প্রতিবেশী, অনাত্মীয় প্রতিবেশী, পার্শ্ববর্তী সাথী, মুসাফির এবং তোমাদের মালিকানাভুক্ত দাস দাসীদের সাথে। নিশ্চয় আল্লাহ পছন্দ করেন না তাদেরকে যারা দাম্ভিক, অহংকারী। (আন-নিসা, ৪:৩৬) ইসলামের মূল কথা হল- প্রথমত, আল্লাহর ইবাদত কর এবং দ্বিতীয়ত, মানব সমাজের সেবা কর। তা আমাদেরকে ইহসানের স্তর তথা আমল ও মনোভাবে মহানুভবতা অর্জন করতে বলে। এটি পশ্চিমা ধারণা `Love god and love your neighbour’ (প্রভুকে ভালবাস এবং প্রতিবেশিকে ভালবাস) এই ধারণা থেকেও আরও বেশি সুপরিসর ও অধিক সার্বজনীন। উপর্যুক্ত আয়াতটি আমাদেরকে কেবল পিতামাতার সাথেই ইহসানের আচরণ করতে বলে না। বরং সকল মানুষের সাথেই, যাদের সাথে জীবনে চলার পথে আমাদের সাক্ষাৎ ঘটে। অধিকন্তু, এই আয়াত আমাদেরকে আরও বলে, আত্মীয় স্বজনের সাথে ইহসান করা পিতামাতার সাথে ইহসান করার পরবর্তী দায়িত্ব এবং তা অন্যান্য সামাজিক দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। আর আত্মীয়কে হক দিয়ে দাও এবং মিসকিন ও মুসাফিরকেও। আর কোনভাবেই অপব্যয় কর না। (বনি ইসরাইল, ১৭:২৬) উক্ত আয়াত পরিষ্কারভাবে বলে যে, একজন আত্মীয় অভাবী লোক কিংবা মুসাফিরকে সাহায্য করা কেবল একটি সদকা-ই নয়, বরং আল্লাহ তাআলার একটি আদেশ। আমাদের উপর মুসলিম সমাজের প্রতিটি সদস্যেরই বিশেষ কিছু অধিকার রয়েছে এবং আমাদের উচিৎ সেসব অধিকারের প্রতি শদ্ধাশীল হওয়া। উল্লেখ্য যে, এই আদেশের সূচনা হয় আত্মীয় স্বজনের অধিকারের মাধ্যমে। অতএব, আত্মীয় স্বজনকে তাদের হক দিয়ে দাও এবং মিসকিন ও মুসাফিরকেও। এটি উত্তম তাদের জন্য, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি চায়। আর তারাই সফলকাম। (আর-রূম, ৩০:৩৮) এই আয়াত পরিষ্কারভাবে বলে যে, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে তাদের উচিৎ তাদের সামাজিক দায়িত্বসমূহ পালন করা। বিশেষত, তাদের নিকট আত্মীয়দের সাথে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বসমূহ। এই আয়াত আরও বলে যে, কেবল যারা এই দায়িত্বসমূহ পালন করে তারাই জীবনে উন্নতি লাভ করতে পারবে। এ থেকে বুঝা যায় যে, একজন লোক তার ব্যক্তিগত জীবনে যতই ধার্মিক হোক না কেন, তাকে পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্বসমূহও পালন করতে হবে, নতুবা সে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে পারবে না। আত্মীয় স্বজনের জন্য ব্যয় তারা তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, তারা কী ব্যয় করবে? বল, তোমরা যে সম্পদ ব্যয় করবে, তা পিতামাতা, আত্মীয়, ইয়াতিম, মিসকিন ও মুসাফিরদের জন্য। (বাকারা, ২:২১৫) ইসলাম স্বভাবের ধর্ম। ইহা মানুষের অধিকারসমূহ তাদের স্ব স্ব প্রয়োজন ও মর্যাদা অনুসারে স্থাপন করেছে। অধিকারের এই মর্যাদাক্রমে পিতামাতা প্রথম স্তর অধিকার করেছে। পূর্ববর্তী অবস্থান হল নিকট আত্মীয় স্বজনের। অতঃপর সমাজের অন্যান্য সামাজিক দায়িত্বসমূহ পড়ে। সমাজের ধনিকশ্রেণীর প্রতি সতর্কবার্তা আর তোমাদের মধ্যে যারা মর্যাদা ও প্রাচুর্যের অধিকারী, তারা যেন এমন কসম না করে যে, তারা নিকট আত্মীয়দের, মিসকিনদের ও আল্লাহর পথে হিজরতকারীদের কিছুই দেবে না। আর তারা যেন তাদের ক্ষমা করে এবং তাদের দোষ ত্রুটি উপেক্ষা করে। (আন-নূর, ২৪:২২) পরিবারে এমন কিছু সদস্যের উপস্থিতি স্বাভাবিক, যাদের ব্যাপারে অন্যদের অপছন্দ কিংবা আপত্তি থাকতে পারে। কোরান মাজিদ বলে, এই দুরত্বের কারণে তাদের পারিবারিক চাহিদাসমূহ পূরণে বিরত থাকা কিংবা গরীব আত্মীয় স্বজনের সহায়তা থেকে বিরত থাকা ধনীদের জন্যে সমীচিন নয়। এরপরে, কোরান মাজিদ আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমাদের প্রত্যেকের উচিৎ আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা করা। এজন্যে আমাদের পারস্পরিক আচরণের ক্ষেত্রেও বিশেষত, পরিবারের সদস্যদের সাথে ক্ষমার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। আত্মীয় স্বজনের প্রতি দয়া প্রদর্শন আর যদি তুমি তাদের থেকে বিমুখ থাকতেই চাও তোমার রবের পক্ষ থেকে রহমতের প্রত্যাশায় যা তুমি চাচ্ছ, তাহলে তাদের সাথে নম্র কথা বলবে। (বনি ইসরাইল, ১৭:২৮) কোন ব্যক্তি তার গরীব আত্মীয়কে দুই কারণে উপেক্ষা করতে পারে। প্রথমত, তার চাহিদা পূরণের মত সামর্থ ঐ ব্যক্তির না থাকলে। দ্বিতীয়ত, কোন গরীব আত্মীয় যদি তার সামর্থের বাইরে কোন কিছু দাবি করে। উভয় অবস্থাতেই কোরান মাজিদ আমাদেরকে বলে, আমাদের আত্মীয়দের প্রতি বিবেচক হতে এবং তাদের সাথে দয়ার্দ্র ভাষায় কথা বলতে। পারিবারিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে মৌলিক নীতিমালা উত্তম কথা ও ক্ষমা প্রদর্শন শ্রেয়, যে দানের পর কষ্ট দেয়া হয় তার চেয়ে। (বাকারা, ২:২৬৩) যদি কোন ব্যক্তি অন্য কাউকে দানের মাধ্যমে সহযোগিতা করে এবং পরবর্তীতে তার সহায়তার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাকে আঘাত দেয়, তবে তা ইসলামের মৌলিক উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। কোরান মাজিদ খুব সুস্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা দেয় যে, দয়াপূর্ণ কথা, অন্যদের দোষ ত্রুটি গোপন করা ও ক্ষমা করে দেওয়া, কাউকে এমন দানের চেয়ে উত্তম, যার পরে তার অনভূতিতে আঘাত দেওয়া হয়। ধর্মানুরাগের একটি মানদন্ড ভাল কাজ এটা নয় যে, তোমরা তোমাদের চেহারা পূর্ব ও পশ্চিম দিকে ফিরাবে; বরং ভাল কাজ হল যে ঈমান আনে আল্লাহ, শেষ দিবস, ফেরেস্তাগণ, কিতাব ও নবিগণের প্রতি এবং যে সম্পদ প্রদান করে তার প্রতি আসক্তি সত্ত্বেও নিকটাত্মীয়গণকে, ইয়াতিম, অসহায়, মুসাফির ও প্রার্থনাকারীকে এবং বন্দী মুক্তিতে। (আল বাকারা, ২:১৭৭) এই আয়াত ইসলামে ধর্মানুরাগ ও খোদাভীরুতার সর্বাধিক সার্বজনীন মানদন্ডের বর্ণনা দেয় এবং তাদের গুরুত্ব সম্পর্কিত মানদন্ডের বর্ণনাও প্রদান করে। উল্লেখ্য যে, যথাযথ ঈমান আনার পরে ধর্মভীরু হওয়ার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল পরিবারের সদস্য ও সমাজের অন্যান্য দরিদ্র ব্যক্তিদের জন্য ব্যয় করা। নামাজ আদায় ও অন্যান্য সৎকাজ সম্পাদন করার মানদন্ড পরিবারের সদস্যদের উপর ব্যয় করার পরে আসে। উত্তরাধিকার সংক্রান্ত উইল তোমাদের উপর ফরজ করা হয়েছে যে, যখন তোমাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হবে, যদি সে কোন সম্পদ রেখে যায়, তবে পিতামাতা ও নিকটাত্মীয়দের জন্য ন্যায়ত্তিক অসিয়ত করবে। এটি মুত্তাকীদের দায়িত্ব।(আল বাকারা, ২:১৮০) কোন ব্যক্তির সম্পদে পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের উত্তরাধিকারের অংশ সম্পর্কে কোরান মাজিদ সুস্পষ্ট বর্ণনা প্রদান করে। এই আয়াত আমাদেরকে আল্লাহর দেওয়া সীমারেখা অনুসরণের এবং আমাদের পরিবারের সদস্যদের উত্তরাধিকারের ন্যায্য অংশ প্রদান করার আদেশ প্রদান করে। যারা উত্তরাধিকারের অংশ পায় না সেসব আত্মীয় সম্পর্কে আর যদি বন্টনে নিকটাত্মীয় এবং ইয়াতিম ও মিসকিনরা উপস্থিত হয়, তাহলে তোমরা তাদেরকে তা থেকে আহার দেবে এবং তাদের সাথে তোমরা উত্তম কথা বলবে। (আন নিসা,৪:৮) যদি সম্পদের বন্টন হয় এবং কিছু ব্যক্তি তা থেকে অংশ না পায়, তবে তারা বঞ্চিত কিংবা শোক অনুভব করতে পারে। এই আয়াত আমাদেরকে বলে, তাদের আহার করাতে কিংবা তাদের সাথে সদয় ও ন্যায্য কথা বলার মাধ্যমে তাদেরকে খুশি করতে। মূল : ড. মাজহার ইউ কাজি বাংলা অনুবাদ : মাওলানা ফয়জুল্লাহ মুজহিরি সম্পাদনা : ড. মাওলানা শামসুল হক সিদ্দিক