(প্রিয়.কম) মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান সেনা নির্যাতনে যখন গোটা বিশ্ব অগাধ বিশ্বাস ও আশা নিয়ে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী দেশটির স্টেট কাউন্সিলর অং সান সুচির দিকে তাকিয়ে, ঠিক তখনই সেনা অভিযান শুরুর ২৬তম দিনে প্রথমবারের মতো জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সবাইকে হতাশ করেছেন তিনি। ভাষণে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো নির্যাতনের ঘটনাকে শুধু অস্বীকারই নয়, বরং রোহিঙ্গা শব্দটিই উচ্চারণ করেননি তিনি। এ ছাড়া রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অব্যাহত সমালোচনাকে ও আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করে অনেকটা হুমকি দিয়ে বলেন, রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পর্যবেক্ষণে ভীত নন তারা। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠেছে, শান্তির দূত যখন অনেকটা অশান্তিকে জিইয়ে রাখার পক্ষেই কথা বলছেন, তখন এই ভয়াবহ রোহিঙ্গা সংকটের শেষ কোথায়?        

বিশ্লেষকেরা মনে করেছেন, ভাষণে ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পর্যবেক্ষণে ভীত নয় মিয়ানমার’ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস অভিহিত শান্তির ‘শেষ সুযোগ’কে হাতছাড়া করলেন সুচি। 

তাদের মতে, রোহিঙ্গারা এখন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়টি অস্বীকার করার মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব ও তাদের ওপর নির্যাতনের সব অভিযোগ অস্বীকার করলেন। এখনই আন্তর্জাতিকভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে, নতুবা রোহিঙ্গা বিষয়ে কোনো শান্তি প্রতিষ্ঠা আর সম্ভব হবে না বলেও মনে করছেন তারা।

২৫ সেপ্টেম্বর থেকে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নতুন করে রোহিঙ্গা নিধন অভিযান ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ শুরুর পর গণহত্যা-ধর্ষণ-অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি নানাবিধ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। পৃথিবীর শান্তিকামী মানুষদের হতাশ করে কৌশলে এত দিন একপ্রকার নিশ্চুপ (বিবৃতি দিয়েই দায়িত্ব সেরেছেন) ছিলেন সুচি। তবে বিশ্বব্যাপী সমালোচনার ঝড় উঠলে অবশেষে ১৯ সেপ্টেম্বর জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই ভাষণকে কেন্দ্র করে বলেছিলেন, রোহিঙ্গাদের অবশ্যই তাদের মিয়ানমারের বাড়িতে ফেরত নেওয়া উচিত। আর সুচি যদি পরিস্থিতি না পাল্টান তাহলে ভবিষ্যতে এই সমস্যার সমাধানও দেখা যাচ্ছে না। এখনই এর সমাধান করতে হবে এবং মঙ্গলবারের ভাষণই ‘শেষ সুযোগ’

মিয়ানমারে স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৪ মিনিটে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে অং সান সুচি বলেন, ৫ সেপ্টেম্বরের পর থেকে রাখাইনে কোনো ধরনের সহিংসতা বা অভিযান চালানো হয়নি। অধিকাংশ রাখাইন গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে যেসব খবর অন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এসেছে, সেটিও অস্বীকার করে তিনি বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পর্যবেক্ষণে ভীত নয় মিয়ানমার।’

তিনি বলেন, ‘বেশ কিছু মুসলিম বাংলাদেশে পালিয়ে গেছে, এ ধরনের খবর শুনে আমরা উদ্বিগ্ন। রাখাইন থেকে মুসলিমরা কেন পালিয়ে বাংলাদেশে যাচ্ছে, তা খুঁজে বের করতে চাই। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ আছে। তাদের সব কথাই শুনতে হবে। কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার আগে অভিযোগগুলো যে তথ্য-প্রমাণনির্ভর, তা নিশ্চিত করতে হবে।’

গণহত্যায় অভিযোগের তীর উঠেছে সুচি ও সেনা প্রধানের দিকে। ছবি: সংগৃহীত

গণহত্যায় অভিযোগের তীর উঠেছে সুচি ও সেনা প্রধানের দিকে। ছবি: সংগৃহীত 

ভাষণে সুচি আরও বলেন, ‘আমরা শান্তি চাই। ঐক্য চাই। যুদ্ধ চাই না। আমরা রাখাইনে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠায় প্রতিষ্ঠায় অঙ্গিকারাবদ্ধ। আমরা সব মানুষের দুর্ভোগ গভীরভাবে অনুভব করি’। তবে রাখাইনে ব্যাপক দমন পীড়ন, হত্যা, ধর্ষণের মূল অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে, সেই সেনাবাহিনীর সমালোচনা থেকে বিরত ছিলেন সুচি।

বক্তৃতায় সুচি মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং আইন বহির্ভূত কাজের নিন্দা জানালেও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পর্কে তিনি কিছু বলেননি।

অব্যাহত নির্যাতনের মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা যখন বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে সে সময় সুচি বলেছেন, অধিকাংশ মুসলিম রাখাইন অঞ্চলে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং এতে বোঝা যায় সেখানে পরিস্থিতি খুব মারাত্মক নয়।

শুধু তাই নয় মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যখন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছে ঠিক তার পরের দিন রাখা বক্তব্যে সুচি দাবি করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাখাইনে বসবাসরত মুসলিমদের জীবন মান উন্নয়নের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

সুচির এসব বক্তব্যে হতবাক হওয়ার পাশাপাশি চরম হতাশা প্রকাশ পেয়েছে বিশ্ব গণমাধ্যমে। বিবিসি'র মিয়ানমার সংবাদদাতা জোনা ফিশার বলেন, ‘অং সান সু চি'র হয়তো বাস্তবতার সাথে সম্পর্ক নেই, নতুবা তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে বাস্তবতা থেকে চোখ ফিরিয়ে রেখেছেন।’

এদিকে সুচির ভাষণকে মিথ্যাচার বলে বর্ণনা করে ইউরোপিয়ান রোহিঙ্গা কাউন্সিলের (ইআরসি) প্রতিষ্ঠাতা ইব্রাহিম মোহাম্মদ বলেছেন, রাখাইনে সেনাবাহিনী যে ‘গণহত্যা’ চালাচ্ছে, তা আড়াল করার চেষ্টা করেছেন সুচি, দিয়েছেন নানা ‘মিথ্যা তথ্য’।

ইব্রাহিম মোহাম্মদ বলেন, ‘আমরা যা ধারণা করেছিলাম, তাই হয়েছে। অং সান সুচি মিথ্যা তথ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করার প্রয়াস চালিয়েছেন। প্রথমেই তিনি ছায়া দিয়েছেন সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীকে, যারা গণহত্যা ঘটাচ্ছে। তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকার কোনো নিন্দা জানাননি; উপরন্তু দায়ী করেছেন রোহিঙ্গাদের।’

রোহিঙ্গা নেতা ইব্রাহিম মোহাম্মদ। ছবি: সংগৃহীত

রোহিঙ্গা নেতা ইব্রাহিম মোহাম্মদ। ছবি: সংগৃহীত

তবে সুচির ভাষণে নতুন কিছু নেই, তার ভাষণ নির্যাতিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য নয় এবং তা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বলে মনে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। 

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার প্রিয়.কম-কে বলেন, দৃশ্যত মানবাধিকারের নেত্রী আর শাসক সুচির মধ্যে বিস্তর তফাৎ রয়েছে। আজকের ভাষণে রোহিঙ্গা বা শান্তিকামীদের আশার আলো দেখার সুযোগ নেই। তিনি জান্তার সুরেই কথা বলেছেন। এরপরও যদি অতি দ্রুত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শক্ত পদক্ষেপ না নেয় তবে রোহিঙ্গা বিষয়ক শান্তি প্রতিষ্ঠার কোনো সুখবর নেই। 

তিনি আরও বলেন, এ ভাষণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যাতীত রাখাইনে শান্তির আর কোনো পথই খোলা রইল না।

সুচির ভাষণ সহিংসতাকে বৈধতা দিয়েছে মন্তব্য করে জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল আলম বলেন, সুচির ভাষণের সাথে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নেই। মুসলিমরা কেন পালিয়ে গেছে তা তিনি জানবেন, এটা লোক দেখানো। হয়তো তিনি ইচ্ছা করেই সহিংসতার বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন নয়তো তাকে বাধ্য করা হয়েছে। তবে ঘটনা যাই ঘটুক রোহিঙ্গা ইস্যুতে তারা (মিয়ানমার সেনাবাহিনী) যে থামছে না তা খুব স্পষ্ট। এমনকি তাদের এই মনোভাব শান্তি প্রক্রিয়া থেকে অনেক দূরে।

প্রসঙ্গত, রোহিঙ্গাদের নিমূল করতে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ শুরুর পর শুধু বিবৃতি দিয়ে এসেছেন সুচি। ১৯ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার প্রথমবারের মতো জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন সুচি। সুচির ওই ভাষণ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বেশ আগ্রহ তৈরই হয়েছিল। কিন্তু বরাবরের মতো সুচি এবারও শান্তিকামী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আশাহত করেছেন। এদিকে সেনা অভিযানে ২৬ তম দিনে প্রাণ বাঁচাতে রাখাইন ছেড়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসার ধারা অব্যাহত রয়েছে।

গত ২৪ আগস্ট রাতে রাখাইনে বেশ কিছু পুলিশ পোস্টে হামলার প্রেক্ষিতে মিয়ানমারের নিরাপত্তাবাহিনী নজিরবিহীন নৃশংস অভিযান পরিচালনা করে। খুন, কুপিয়ে-পুড়িয়ে হত্যা, ধর্ষণসহ নানাভাবে রোহিঙ্গাদের নির্যাতন অব্যাহত রাখে দেশটির নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরা। এতে নিহত হয় প্রায় ৩ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা। জীবন বাজি রেখে পালিয়ে বাংলাদেশে চলে এসেছে ৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। ফলে জনশূন্য হয়ে গেছে রাখাইন রাজ্যের প্রায় ১৭৬ টি গ্রাম। 

সেনাদের আগুনে রাখাইন জ্বলছেই। ছবি: ফোকাস বাংলা

সেনাদের আগুনে রাখাইন জ্বলছেই। ছবি: ফোকাস বাংলা

এই নৃশংসতা বন্ধের দাবিতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কাছে ড. মোহাম্মদ ইউনূসসহ ১২ জন নোবেল বিজয়ী ও বিশ্বের ১৮ জন বিশিষ্ট নাগরিক একটি খোলা চিঠি লিখেছেন। এ ছাড়া যুক্তরাজ্য ও সুইডেনের অনুরোধে নিরাপত্তা পরিষদে বসেছিল জরুরি বৈঠক। এতে অংশ নিয়ে ১৫টি দেশ রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে মিয়ানমারকে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে আহ্বান জানায়। 

মিয়ানমার সরকারের নিপীড়নমূলক আচরণ বন্ধ না করলে ‘শাস্তি’র হুমকি দিয়েছে জঙ্গিগোষ্ঠি আল কায়েদা। দেশটির সরকারেরও দাবি ছিল রাখাইনে জঙ্গিগোষ্ঠির তৎপরতা বিদ্যমান। কিন্তু এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে দ্য আরাকান রোহিঙ্গা সলভেশন আর্মি’র (এআরএসএ)। তারা একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘দ্য আরাকান রোহিঙ্গা সলভেশন আর্মি (আরসা) আল-কায়েদা, ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক অ্যান্ড লেভান্তে (আইসআইএস), লস্কর-ই-তায়েবা অথবা বৈশ্বিক কোনো জঙ্গিগোষ্ঠির সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নয়।’ একই সঙ্গে ‘রোহিঙ্গা মুসলিমদের নাগরিত্ব প্রদান এবং অধিকার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত লড়াই অব্যাহত থাকবে বলে’ ঘোষণা দেয় এআরএসএ।

এদিকে সারা বিশ্বে ইউএনএইচসিআর কতৃক নিবন্ধিত ১৭.২ মিলিয়ন শরণার্থীর ৩০ শতাংশ এখন বাংলাদেশে। এরই মধ্যে চলমান রোহিঙ্গা ঢল অব্যাহত থাকলে শরণার্থীর এ সংখ্যা ১০ লাখে পৌঁছাতে পারে বলেও সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। এত সংখ্যক শরণার্থীর দায়িত্ব তাদের পক্ষেও নেওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। 

উল্লেখ্য, রোহিঙ্গা একটি নৃগোষ্ঠীর নাম যাদের শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ ইসলাম (প্রায় ৮ লক্ষ) ও ১০ ভাগ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। রোহিঙ্গাদের আদি আবাসস্থল মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। শত শত বছর ধরে রাজ্যটিতে বাস করা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি না দিয়ে মিয়ানমার সরকার এ জাতিগোষ্ঠীকে নির্মূল করতে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ চালাচ্ছে।

প্রিয় সংবাদ/শান্ত